রাতে সহজে ঘুম আসছে না। সকালে ঘুম ভাঙলে শরীর ক্লান্ত লাগছে। কখনও আবার অনেকক্ষণ ঘুমিয়েও কাটছে না অবসাদ। অনেকেই এই সমস্যাগুলিকে অনিয়মিত জীবনযাপনের ফল বলে মনে করেন। কিন্তু ঘুমের এই বদলে যাওয়া অভ্যাসের সঙ্গে কি অবসাদের যোগ থাকতে পারে? সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে অবসাদের একটি বিশেষ ধরন, যার নাম ‘সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশন’। গবেষকদের মতে, এই ধরনের অবসাদ সম্পর্কে জানা গেলে রোগীর সমস্যা বুঝে চিকিৎসা করতে সুবিধা হতে পারে।
শরীরের ঘড়ির সঙ্গে অবসাদের যোগ
আমাদের শরীরে একটি নিজস্ব জৈবিক ঘড়ি রয়েছে। এই ঘড়ি প্রায় ২৪ ঘণ্টার চক্রে ঘুম ও জেগে থাকার সময় নিয়ন্ত্রণ করে। একে বলা হয় সার্কাডিয়ান রিদম। এই স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটলে ঘুমের সময় বদলে যেতে পারে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে অবসাদেরও সম্পর্ক থাকতে পারে।
দ্য ব্রিটিশ জার্নাল অফ সাইকিয়াট্রিতে প্রকাশিত গবেষণায় ১০ হাজারেরও বেশি অবসাদগ্রস্ত মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকরা। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল, শরীরের জৈবিক ঘড়ির সঙ্গে সম্পর্কিত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে অবসাদের আলাদা কোনও ধরন চিহ্নিত করা যায় কি না। সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের প্রায় এক-চতুর্থাংশের মধ্যে সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশনের বৈশিষ্ট্য দেখা গিয়েছে।
কী কী লক্ষণ দেখা দেয়?
সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশনের ক্ষেত্রে সকালে ঘুম থেকে উঠেও খুব ক্লান্ত লাগতে পারে। অবসাদের সময় স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ঘুম, রাতে দেরি করে ঘুমোতে যাওয়া এবং সকালে দেরিতে ঘুম ভাঙার প্রবণতাও দেখা যায়। কাজ বা পড়াশোনার জন্য সকালে উঠতে হলেও রাতে দেরিতে ঘুম আসার সমস্যাকে বলা হয় সোশাল জেট ল্যাগ। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে অবসাদের উপসর্গও বাড়তে বা কমতে পারে।
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এই ধরনের অবসাদের বৈশিষ্ট্য যাঁদের মধ্যে ছিল, তাঁদের গড় বয়স প্রায় ১৮.৭ বছর। অবসাদের অন্য ধরনে আক্রান্তদের গড় বয়স ছিল ২৩.২ বছর। সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশনের গোষ্ঠীতে প্রায় ৮০ শতাংশই ছিলেন মহিলা। এই গোষ্ঠীর মধ্যে অবসাদের উপসর্গ তুলনামূলক বেশি তীব্র হওয়ার প্রবণতাও দেখা গিয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে আত্মহত্যার চিন্তা এবং বাইপোলার ডিসঅর্ডারের মতো উপসর্গও বেশি ছিল।
তবে শুধু রাতে দেরিতে ঘুমনো বা সকালে ক্লান্ত লাগলেই সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশন হয়েছে, এমনটা ভাবা ঠিক নয়। রোগ নির্ণয়ের জন্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন।

চিকিৎসায় কী পরিবর্তন আসতে পারে?
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশনের বৈশিষ্ট্যযুক্ত কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এসএসআরআই ও এসএনআরআই গোত্রের প্রচলিত অ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট ওষুধের কার্যকারিতা তুলনামূলক কম ছিল। অন্যদিকে, লাইট থেরাপি, মেলাটোনিন এবং শরীরের ঘুমের ছন্দকে লক্ষ্য করে তৈরি কিছু চিকিৎসা পদ্ধতি তাঁদের ক্ষেত্রে উপযোগী হতে পারে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণদের মধ্যে এই সমস্যার বৈশিষ্ট্যগুলি চিহ্নিত করা গেলে চিকিৎসার উপযুক্ত পথ বেছে নেওয়া সহজ হতে পারে।
গবেষকদের বক্তব্য, অবসাদ সবার ক্ষেত্রে একই রকম হয় না। তাই রোগীর উপসর্গ বুঝে চিকিৎসা করা জরুরি। তবে এই গবেষণার ফলাফল আরও যাচাই করা প্রয়োজন। দীর্ঘদিন মন খারাপ থাকা, কোনও কাজে আগ্রহ না থাকা বা ঘুমের সমস্যায় দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অবসাদের ওষুধ বন্ধ করবেন না বা মেলাটোনিন খাওয়া শুরু করবেন না।
