জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিধন্য গ্রাম দৌলতপুর। কুমিল্লা শহর থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে মুরাদনগর উপজেলার এই গ্রাম জড়িয়ে আছে কবির প্রেম, বিরহ ও সৃষ্টিশীল জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে। সবুজ-শ্যামল প্রকৃতি, গ্রামীণ পরিবেশ আর ব্যক্তিগত জীবনের নানা অনুভূতির মধ্য দিয়ে এখানে কবি রচনা করেছিলেন বহু গান ও কবিতা। গ্রামে রয়েছে তার স্মৃতিবিজড়িত নানা স্থান ও স্থাপনা। প্রতিবছর কবির জন্মবার্ষিকীতে আয়োজন করা হয় নানা অনুষ্ঠান। তবু দৌলতপুরের নতুন প্রজন্মের কাছে নজরুলের সাহিত্য, দর্শন ও সৃষ্টিকর্মকে আরও পরিচিত করে তুলতে নিয়মিত চর্চা, গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের ঘাটতি রয়ে গেছে।
কুমিল্লায় আসার পর ১৯২১ সালের ৬ এপ্রিল বন্ধু আলী আকবর খানের আমন্ত্রণে দৌলতপুরে যান নজরুল। বহুল প্রচলিত গবেষণাতথ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রায় ৭৩ দিন অবস্থানকালে তিনি রচনা করেন ১৬০টি গান ও ১২০টি কবিতা। তবে মুরাদনগর উপজেলা প্রশাসনের সরকারি ওয়েবসাইটে তার অবস্থানের সময় উল্লেখ করা হয়েছে ৭১ দিন। এ সময়ের রচনাগুলোর সুনির্দিষ্ট রচনাস্থল ও তারিখ নির্ধারণ করে পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির বিষয়টি এখনও গবেষণার দাবি রাখে। কুমিল্লায় কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আল আমিন বলেন, কুমিল্লা শহর ও দৌলতপুরে নজরুলের অবস্থান ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দৌলতপুরের প্রকৃতি ও মানুষের সান্নিধ্য তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। গবেষণা ও স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এখানে ১৬০টি গান ও ১২০টি কবিতা রচনার কথা জানা যায়।
দৌলতপুরেই আলী আকবর খানের ভাগ্নি সৈয়দা নার্গিস আরা খানমের সঙ্গে নজরুলের পরিচয় ও পরে প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কবির জীবনীসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রকাশিত তথ্যে এ সময়কে তার ব্যক্তিজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রামের
সবুজ-শ্যামল প্রকৃতি, পুকুর, গাছপালা ও গ্রামীণ পরিবেশ তরুণ কবির মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। নার্গিসের সঙ্গে সম্পর্কের আবেগ তার সৃষ্টিশীল জীবনে প্রেম, বিরহ, আকুলতা ও অভিমানের মতো অনুভূতির নতুন মাত্রা যোগ করে। বিদ্রোহী চেতনার পাশাপাশি নজরুলের কোমল, প্রেমময় ও আবেগঘন সত্তার পরিচয়ও তার সৃষ্টিকর্মে প্রতিফলিত হয়েছে।
দৌলতপুর স্থানীয়ভাবে ‘কবিতীর্থ দৌলতপুর’ নামে পরিচিত। গ্রামের প্রবেশমুখে রয়েছে নজরুল তোরণ। এ ছাড়া কবির স্মৃতিকে ঘিরে রয়েছে বিভিন্ন স্থাপনা ও স্মৃতিফলক। প্রতিবছর নজরুলের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সেখানে আয়োজন করা হয় নানা অনুষ্ঠান। তবে এসব আয়োজনের বাইরেও কবির সাহিত্য ও দর্শনকে স্থানীয় মানুষের, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের দৈনন্দিন চর্চার অংশ করে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
দৌলতপুরে নজরুলের স্মৃতি নিয়ে গর্ব থাকলেও শিক্ষার্থীদের কাছে তার জীবন ও সাহিত্য সম্পর্কে জানার সুযোগ এখনও সীমিত। পাঠ্যবইয়ের বাইরেও কবির কবিতা, গান ও জীবনদর্শন সম্পর্কে জানতে আগ্রহী তারা।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ঐতিহ্য কুমিল্লা’র সভাপতি এবং ‘দৌলতপুরে নজরুল’ গ্রন্থের লেখক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল বলেন, দৌলতপুর নজরুলের সাহিত্য ও জীবনসংগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। নতুন প্রজন্মকে তার অসাম্প্রদায়িক ও বিদ্রোহী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে হলে কবিকে শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। স্থানীয়ভাবে তার সৃষ্টি ও ইতিহাস নিয়মিত তুলে ধরার ব্যবস্থা করা জরুরি।
দৌলতপুর নার্গিস-নজরুল শিল্পকলা একাডেমির পরিচালক মো. নূরুল ইসলাম (নূরু মাস্টার) স্থানীয়ভাবে নজরুলচর্চার অগ্রগতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মের মধ্যে নজরুলচর্চা বাড়াতে যে ধরনের কার্যক্রম প্রয়োজন, বাস্তবে তার ঘাটতি রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কিংবা সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বিশেষ কার্যক্রমও পর্যাপ্ত নয়। তার মতে, পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতা, বাজেট ও স্থায়ী অবকাঠামোর অভাবে স্থানীয় নার্গিস-নজরুল শিল্পকলা একাডেমির মতো উদ্যোগগুলো সীমিত সামর্থ্য নিয়ে চলছে। বিশেষ দিবসকেন্দ্রিক দুয়েকটি আলোচনা সভা বা মেলার আয়োজনের বাইরে নতুন প্রজন্মকে নজরুলমুখী করতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, প্রতিযোগিতা ও স্থায়ী পাঠাগার প্রতিষ্ঠার মতো উদ্যোগ প্রয়োজন।
স্থানীয়দের মতে, নজরুলের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ এবং বিশেষ দিবসের আয়োজনের পাশাপাশি তার সাহিত্য ও দর্শনকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে প্রয়োজন নিয়মিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। আলী আকবর খানের বাড়ি, পুকুরঘাট, স্মৃতিবিজড়িত গাছসহ ঐতিহাসিক স্থানগুলোর তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের পাশাপাশি সেখানে গবেষণাকেন্দ্র, পাঠাগার ও তথ্যসমৃদ্ধ প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা গেলে দৌলতপুরের ঐতিহ্য আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরা সম্ভব।
মুরাদনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাকিব হাছান খাঁন গণমাধ্যমকে বলেন, দৌলতপুর শুধু একটি গ্রামের নাম নয়; এটি নজরুলের প্রেম, সৃজন, প্রকৃতি ও স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি ঐতিহাসিক জনপদ। ১৬০টি গান ও ১২০টি কবিতা রচনার বহুল উদ্ধৃত তথ্য দৌলতপুরকে নজরুলের সৃষ্টিশীল জীবনের একটি অনন্য অধ্যায় হিসেবে তুলে ধরেছে। দৌলতপুরের ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে উপজেলা প্রশাসনের অর্থায়নে ইতোমধ্যে ‘দৌলতপুরে নজরুল’ নামে একটি বই প্রকাশ করা হয়েছে। পাশাপাশি নার্গিসের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কবির স্মৃতিবিজড়িত স্থান সংরক্ষণ, তার সৃষ্টির রচনাকাল ও স্থান নিয়ে গবেষণা এবং এ বিষয়ে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার কাজ চলছে। এসব কার্যক্রমের অগ্রগতি মন্ত্রণালয়কেও অবহিত করা হচ্ছে।
