জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন পণ্যের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে গত সেপ্টেম্বর মাসে আমদানি পণ্যের মূল্য পূর্বাভাসের চেয়েও বেশি বেড়েছে। এর ফলে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি আরও উসকে ওঠার স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার টানাপোড়েন এই সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে।
মার্কিন শ্রম দপ্তরের পরিসংখ্যান ব্যুরো জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরে আমদানি পণ্যের মূল্য এক দশমিক এক শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে অর্থনীতিবিদরা শূন্য দশমিক আট শতাংশ বাড়ার আভাস দিয়েছিলেন। এর ফলে গত এক বছরে দেশটিতে সামগ্রিক আমদানি পণ্যের মূল্যস্ফীতি বেড়ে আট দশমিক এক শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২২ সালের জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। রয়টার্স-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি সপ্তাহে ভোক্তা ও পাইকারি পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধির তথ্যের পর এই প্রতিবেদনটি নিশ্চিত করছে যে মূল্যস্ফীতির আঁচ শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সাধারণ কেনাকাটার ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আমদানি পণ্যে শুল্ক আরোপ এবং বৈশ্বিক সংকটের কারণে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেওয়া বিভিন্ন নীতিই এই মূল্যস্ফীতির জন্য অনেকাংশে দায়ী। এমনকি রয়টার্স ও ইপসোস-এর যৌথ জনমত জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৭৮ শতাংশ আমেরিকান জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির জন্য ট্রাম্পের নীতিকে দায়ী করেছেন। এফডব্লিউডিবন্ডস-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ ক্রিস্টোফার রুপকি বলেন, “আমেরিকানরা আক্ষরিক অর্থেই প্রতিটি ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির হুমকির মুখে পড়ছে। মাত্র কয়েক মাস আগেও যেসব পণ্য সস্তা ছিল, এখন সেগুলোর জন্যই তাদের পকেট থেকে বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়নের আগে আমদানি পণ্যের মূল্যস্ফীতি ছিল না, কিন্তু চলতি বছর এটি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে।”
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, গত মাসে আমদানি করা জ্বালানির দাম চার দশমিক আট শতাংশ বেড়েছে। খাদ্য ও জ্বালানি বাদে মূল আমদানি পণ্যের দাম বেড়েছে শূন্য দশমিক সাত শতাংশ, যা বার্ষিক হিসাবে ছয় দশমিক দুই শতাংশ। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে প্রযুক্তির বিকাশ ও বিনিয়োগের কারণে কম্পিউটার ও সেমিকন্ডাক্টরের মতো মূলধনি পণ্যের দামও বেড়েছে শূন্য দশমিক নয় শতাংশ। এছাড়া চীন থেকে আমদানি করা পণ্যের দাম বেড়েছে শূন্য দশমিক সাত শতাংশ, যা ২০২১ সালের ডিসেম্বরের পর সর্বোচ্চ।
মূল্যস্ফীতির পারদ চড়লেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ চলতি মাসের বৈঠকে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখতে পারে বলে আর্থিক বাজার সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, যদিও ডিসেম্বরে তা আবার বাড়তে পারে। নেশনওয়াইড-এর অর্থনীতিবিদ ওরেন ক্লাচকিন বলেন, “আমরা নিকট ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা করছি, তবে তা হয়তো স্থায়ীভাবে উঁচু স্তরে থাকবে না। তবে ঝুঁকিটা হলো, মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার চেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চড়া থাকতে পারে এবং ফেডের পক্ষে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।”
অন্যদিকে ফেডের পৃথক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মার্কিন কারখানাগুলোর উৎপাদন সেপ্টেম্বরে শূন্য দশমিক তিন শতাংশ বাড়লেও তৃতীয় প্রান্তিকে সামগ্রিক গতি বেশ মন্থর হয়ে পড়েছে। সিটিগ্রুপের অর্থনীতিবিদ ভেরোনিকা ক্লার্ক বলেন, “এআই খাতের জোরালো চাহিদা ব্যবসায়িক বিনিয়োগ বাড়ালেও তার বড় অংশই আমদানিনির্ভর, যার অর্থ অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ততটা শক্তিশালী নয়।” জ্বালানি ও কাঁচামালের বাড়তি খরচের প্রভাব নিয়ে বিএমও ক্যাপিটাল মার্কেটসের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ সাল গুয়াতিয়েরি বলেন, “এর অর্থ হলো উৎপাদকরা হয়তো জ্বালানি ও উপকরণের বর্ধিত ব্যয়ের কিছুটা নিজেরা বহন করতে চাইবেন, তবে সবটা নয়; যা চলতি সপ্তাহের ভোক্তা ও উৎপাদক মূল্য প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।”
