প্রযুক্তির আলোয় আলোকিত আজকের পৃথিবী যেমন আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, ঠিক তেমনি এর অন্ধকারের গ্রাসে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের আগামী প্রজন্ম। সম্প্রতি কুমিল্লার স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিন কিংবা ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মর্মান্তিক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড আমাদের সমাজকে কেবল নাড়া দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং অভিভাবকত্ব, পারিবারিক বন্ধন এবং আধুনিক প্যারেন্টিংয়ের কঙ্কালসার রূপটি অত্যন্ত নির্মমভাবে উন্মোচন করেছে।
শৈশব ও কৈশোরের একটা নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত শিশুদের ওপর পারিবারিক নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ থাকা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বর্তমানে দেখা যায়, অনেক অভিভাবকই ‘আধুনিকতার’ ভুল অর্থ ধরে নিয়ে সন্তানদের অতিরিক্ত বা অন্ধ স্বাধীনতা দিয়ে নিশ্চিন্তে থাকেন। সম্প্রতি তাজমিনের ঘটনাটিতে দেখা যায়, বান্ধবীকে সামান্য একটি ঘড়ি দেওয়াকে কেন্দ্র করে মায়ের সামান্য বকাঝকায় সে রেগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়, একা একা কক্সবাজার চলে যায় এবং হোটেলে মিথ্যা নাম ব্যবহার করে অবস্থান করে। সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, মেয়েটি বাসা থেকে চলে যাওয়ার পরও পরিবারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়নি কিংবা জোরালো খোঁজাখুঁজি করা হয়নি। যেখানে আমাদের নিজেদের শৈশবে একটু দেরি করে বাড়ি ফিরলে মায়ের বুক কেঁপে উঠত কিংবা বাবা-মায়ের শাস্তির ভয়ে তটস্থ থাকতে হতো, সেখানে সন্তান দিনকে দিন নিখোঁজ থাকার পরও পরিবারের মধ্যে সেই স্বাভাবিক উৎকণ্ঠা ও তৎপরতা না থাকাটা কেবল উদাসীনতা নয়, বরং এক ধরনের অপরাধমূলক দায়িত্বহীনতা।
আজকের দিনে অনেক অভিভাবকই সন্তানকে খুশি রাখতে বা নিজেদের ব্যস্ততা ঢাকতে খুব কম বয়সেই তাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন দামি স্মার্টফোন, আইফোন এবং ইন্টারনেট সংযোগ। কোনো রকম প্যারেন্টাল কন্ট্রোল বা মনিটরিং ছাড়াই এই ডিভাইসগুলো শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া মানে তাদের অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া। ইনস্টাগ্রাম কিংবা অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে নাম-পরিচয় গোপন করে গড়ে ওঠা ভুয়া সম্পর্কের জালে খুব সহজেই পা দিচ্ছে এই কিশোর-কিশোরীরা। পাঁচ মাসের ভার্চুয়াল পরিচয়কে ভরসা করে একটি ১৫ বছরের মেয়ে একা একা অপরিচিত যুবকের কাছে চলে যাওয়ার ঘটনাটি প্রমাণ করে, ডিজিটাল দুনিয়ার কৃত্রিম আকর্ষণের কাছে তারা ঘরের আসল সম্পর্ক ও নিরাপত্তা হারাচ্ছে।
পরিবার যখন কেবল আর্থিক জোগানদাতা বা ‘স্কুল-কোচিংয়ের ফি’ পরিশোধের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, তখন সন্তান ও অভিভাবকদের মধ্যে তৈরি হয় এক বিশাল মানসিক দূরত্ব। শাসন মানেই যদি হয় মারধর কিংবা অতিরিক্ত কঠোরতা, আর ভালোবাসা মানেই যদি হয় প্রশ্নহীনভাবে সব দাবি মেনে নেওয়া- তবে সন্তান কখনও ঘরের ভেতর নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পায় না। বাইরের জগতের কেউ একটু মনোযোগ দিলে বা কৃত্রিম মিষ্টি কথা বললেই তারা সেই অপরিচিত মানুষটিকে নিজেদের সবচেয়ে আপন ভেবে ভুল করে বসে। বর্তমান পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের এই মানসিক দূরত্ব ঘুচিয়ে সন্তানদের বন্ধু হয়ে ওঠা এবং তাদের সঙ্গে সময় কাটানো অত্যাবশ্যক।
তাজমিন কিংবা অপ্রতিমের মর্মান্তিক পরিণতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি আমাদের ভেঙে পড়া পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোর এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবিও বটে। সন্তানকে ভালো স্কুল-কলেজে পড়ানো, দামি আইফোন বা আইপ্যাড কিনে দেওয়া কিংবা বাইরে ঘুরতে পাঠানোই সফল অভিভাবকত্ব নয়। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কার সঙ্গে চলাচল করছে, তার মনের কোণে কী চলছে- সেসবের খোঁজ রাখা প্রতিটি মা-বাবার প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব। সন্তানকে অতিরিক্ত স্বাধীনতা দেওয়া কিংবা তাদের জীবন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকা- দুটিই সমান ক্ষতিকর। অপরিণত বয়সে হাতে তুলে দেওয়া তথাকথিত ‘স্বাধীনতা’ যেন আমাদের কোনো সন্তানের জীবন কেড়ে না নেয়, তার জন্য এখনই পরিবার ও সমাজকে সচেতন হতে হবে।
তাসনিয়া তাবাচ্ছুম : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম কলেজ, চট্টগ্রাম
