সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনা তদারকিতে গঠিত মন্ত্রিসভা কমিটি বাতিল
কৃষিপ্রধান এ দেশে সারের নুতন ডিলার নিয়োগ নিয়ে চরম দলীয়করণ, অনিয়ম দুর্নীত ঘটনায় হতবাক মানুষ। এধরনের স্বজনপ্রীতি আর অনিয়ম আগে দেখেনি এমন অভিযোগ ভুক্তভোগীরদের। সার বিক্রির সাথে র্সংশ্লিষ্টরা এধরনের ঘটনা ক্ষুদ্ধ।
কৃষিপ্রধান এ দেশে সারের নুতন ডিলার নিয়োগ নিয়ে চরম দলীয়করণ, অনিয়ম দুর্নীত ঘটনায় হতবাক মানুষ। এধরনের স্বজনপ্রীতি আর অনিয়ম আগে দেখেনি এমন অভিযোগ ভুক্তভোগীরদের। সার বিক্রির সাথে র্সংশ্লিষ্টরা এধরনের ঘটনা ক্ষুদ্ধ। জেলায় জেলায় দেখা দিয়েছে ক্ষোভ। সারের ডিলার নিয়ে জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা তীব্র প্রতিবাদের পাশাপাশি অনিয়মের তদন্ত করার দাবী তুলেছেন। সারাদেশে সারের সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনা তদারকিতে গঠিত মন্ত্রিসভা কমিটি ইতোমধ্যে বাতিল করেছে সরকার। এছাড়া সারের ডিলার নিয়োগে কোনো অভিযোগ থাকলে তিন মাসের মধ্যে ডিলারশিপ বাতিল করা হবে জানানো হয়েছে।
সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে বাংলাদেশ রাসায়নিক শিল্প কর্পোরেশন-তালিকাভুক্ত ৫,৮০০ জন এবং বিএডিসি-তালিকাভুক্ত ৫,২০০ জন ডিলারসহ প্রায় ৪৫,০০০ সার খুচরা বিক্রেতা রয়েছেন। এছাড়া বাংলাদেশ প্রতি বছর কৃষিকাজে ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টন সার ব্যবহার করে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিয়োগ পাওয়া ডিলারদের কারো কারো সার বিক্রির দোকান বা গুদামও নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে নিয়োগ পাওয়া ও বাদ পড়া প্রার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সংসদ সদস্য ও সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের কেউ কেউ প্রকাশ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়ার অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি নিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন। কোনো কোনো জেলায় নতুন ডিলারের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগও দেয়া হয়েছে। এর মধ্যেই কয়েকটি জেলায় কৃষক পর্যায়ে সার সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। রাজবাড়ী, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটসহ কিছু এলাকায় সরবরাহ সংকটের কথা বলে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির তথ্যও মিলেছে।
কৃষি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামনে শীতকালীন ও বোরো মৌসুম—দেশের কৃষির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোর একটি। এর আগে সার ও ডিলার নিয়োগ ঘিরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত সমাধান করা জরুরি। এ পরিস্থিতিতে কৃষক পর্যায়ে সার সরবরাহ ব্যাহত হলে উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সূত্র জানায়, সারা দেশে প্রায় পাঁচ হাজার সার ডিলার নিয়োগের বিপরীতে ৪৭ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়ে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ৫৫ জেলার ডিলার নিয়োগের আংশিক তালিকায় স্থান পাওয়া ব্যক্তিদের যোগ্যতা, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালীদের আত্মীয়-স্বজনকে ডিলারশিপ দেয়া হয়েছে।
রংপুর, রাজশাহী, গাইবান্ধা, নীলফামারী, মেহেরপুর, নাটোর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন জেলায় ডিলার নিয়োগ নিয়ে বিতর্কের তথ্য পাওয়া গেছে। নাটোরের লালপুর উপজেলার কদিমচিলান ইউনিয়নে নিয়োগবঞ্চিত আবেদনকারী আব্দুল হান্নান সাংবাদিক সম্মেলন করে নিয়োগ বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। রাজশাহীর বাগমারায়ও ডিলার নিয়োগ নিয়ে আপত্তি উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় ব্যবসায়ী নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও করেছেন।
তদারকি কমিটি বাতিল :
সারাদেশে সারের সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনা তদারকিতে গঠিত মন্ত্রিসভা কমিটি বাতিল করেছে সরকার। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে গত মঙ্গলবার এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে বলা হয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের গত ২৪ আগস্ট জারি করা ‘সার বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়কে সহায়তা করার জন্য মন্ত্রিসভা কমিটি’ গঠনের প্রজ্ঞাপনটি বাতিল করা হয়েছে।
সারাদেশে সার সংগ্রহ, বিতরণ ও ডিলার নিয়োগ কার্যক্রম তদারকি করে কৃষি মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে এই কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সার সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্ভূত উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে তখন এই পদক্ষেপ নেয় সরকার। তিন সদস্যের এই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন। কমিটির অন্য দুই সদস্য ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
অভিযোগ থাকলে তিনমাসের মধ্যে ডিলারশিপ বাতিল
সারের ডিলার নিয়োগে কোনো অভিযোগ থাকলে তিন মাসের মধ্যে ডিলারশিপ বাতিল করা হবে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। বুধবার তিনি বলেন, দেশের যেসব জেলায় সার সংকট তৈরি হয়েছে, সেসব জেলার সংসদ সদস্যরা ১১ দলীয় জোটের। সরকারকে বিভ্রান্ত করতে তাদের দলীয় লোকজন এই সংকট তৈরি করে থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সারের ডিলার নিয়োগ দিয়েছে প্রশাসন। তবে অভিযোগ প্রমাণ হলে ডিলারশিপ বাতিল করে নতুন ডিলার নিয়োগ দেওয়া হবে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, উত্তরাধিকার সূত্রে তারা যেসব সার ডিলার পেয়েছেন, তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল স্বৈরাচারী সরকারের আমলে। এসব ডিলারের অসহযোগিতার কারণে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, যেসব জেলায় সার নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে, সেসব জেলার সংসদ সদস্যরা ১১ দলীয় জোটের। তারা সরকারকে বিভ্রান্ত করতে দলীয় লোকজনের মাধ্যমে এই সংকট তৈরি করে থাকতে পারেন। অন্যদিকে, যেসব জেলায় বিএনপির সংসদ সদস্য রয়েছেন, সেসব জেলায় সার নিয়ে কোনো সমস্যা হয়নি। বর্তমান সরকারের সময়ে সার ডিলার নিয়োগে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তা খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানান তিনি।
সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা:
বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৫(৬) এর ক্ষমতাবলে প্রণীত রুলস অব বিজনেস, ১৯৯৬ এর বুল ৩ এবং তদধীন সিডিউল-১ অনুযায়ী সার আমদানি, উৎপাদন, বিতরণ, ব্যবহার, ডিলার নিয়োগ সংক্রান্ত নীতি প্রণয়ন কৃষি মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়। উক্ত বিধিবিধানের আলোকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হলো সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে নীতি প্রণয়ন, পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং তদারকি করা (বুল ৪(১ঢ)(ক) ও (খ))।
দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সময়োপযোগী, ভারসাম্যপূর্ণ ও সহজলভ্য সার সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। বিদ্যমান সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ ব্যবস্থায় সময়ের প্রেক্ষাপটে প্রয়োজনীয় সংস্কার, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং কৃষকের কাছে ন্যায্যমূল্যে যথাসময়ে সার পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে একটি হালনাগাদ নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছে।
এমতাবস্থায় রুলস অব বিজনেস, ১৯৯৬ এর বুল ৩ ও সিডিউল অনুযায়ী কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপর অর্পিত ক্ষমতাবলে এবং প্রচলিত আইন-বিধি ও সরকারি নীতিমালার সাথে সামঞ্জস্য রেখে, সরকার সার ডিলার নিয়োগ, নবায়ন, বরাদ্দ ও বিতরণ প্রক্রিয়া সুনির্দিষ্ট, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার লক্ষ্যে “সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা, ২০২৬” প্রণয়ন করা সমীচীন মনে করে।‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা- ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ নীতিমালার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ।
নীতিমালাটি সময়োপযোগি ও সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিতকল্পে প্রণীত, একক নীতিমালার আওতায় সার বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা, ইউনিয়ন, পৌরসভা এবং সিটি কর্পোরেশনে সার ডিলার ইউনিটের সংখ্যা সুনির্দিষ্টকরণ, সকল সার ডিলার কৃষি মন্ত্রণালয়ের ডিলার হিসেবে পরিগণিত হবে, একই পরিবারে একাধিক ডিলার নিয়োগের সুযোগ রহিতকরণ, ডিলারের কার্যক্রম আরো নিবিড়ভাবে মূল্যায়নের মাধ্যমে ডিলারশীপ বাতিল বা নবায়নের কার্যক্রম গ্রহণ, খুচরা বিক্রেতাগণকে অধিকতর জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার আওতায় আনয়ন; এবং খুচরা বিক্রেতাগণের কার্যক্রম আরো নিবিড়ভাবে মূল্যায়নের মাধ্যমে তাদের আইডি বাতিল । সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা ২০২৬’ তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে।
এদিকে ডিলার নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে সম্প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ময়মনসিংহ-৮ আসনের বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু। নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন, সারের ডিলারশিপ দেয়ার নামে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের চেষ্টা চলছে। ঈশ্বরগঞ্জের সরিষা ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি লেখেন, ‘কে কোথা থেকে কত পার্সেন্ট টাকা নেয়, তা আমি জানি।’
ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতির এমন অভিযোগ উঠেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়ও। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনের বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য এমএ হান্নানের ছেলে, ভগ্নিপতি ও ভাগনের স্ত্রী ডিলারশিপ পেয়েছেন। নাসিরনগর উপজেলার গোকর্ণ ইউনিয়নে সংসদ সদস্যের ছেলে আদনান সাদী ‘মেসার্স আলীয়াহ ট্রেডার্স’ নামে, নাসিরনগর সদর ইউনিয়নে তার ভগ্নিপতি আরক মিয়া ‘মেসার্স আয়ান ট্রেডার্স’ নামে এবং গোয়ালনগর ইউনিয়নে ভাগনের স্ত্রী নুরুন্নাহার আক্তার স্বর্ণা ‘এস এস ট্রেডার্স’ নামে সারের ডিলারশিপ পেয়েছেন। বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসন স্বীকার করলেও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, জেলায় ১০৬টি সারের ডিলারশিপের বিপরীতে ৮২৫টি আবেদন জমা পড়ে। স্থানীয়ভাবে যাচাই-বাছাই শেষে সার ডিলারসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে ২৯২ জনের নাম সুপারিশ করে পাঠানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি প্রতিটি ডিলারশিপের জন্য তিনজনের নাম সুপারিশ করেছিল। ওই তালিকায় ‘এক নম্বরে’ নাম রাখাকে কেন্দ্র করে মোটা অংকের অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে।
নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মোস্তফা এমরান বলেন, উপজেলা থেকে প্রত্যেক ইউনিয়নের জন্য যে নাম এসেছে, সেগুলোই সুপারিশ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। এর মধ্যে দুই-একটি এদিক-সেদিক হয়েছে।’ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটি আমি করিনি। অন্য কেউ করেছে—এমন অভিযোগও আমার জানা নেই। তবে তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায়ে হস্তক্ষেপ থাকতে পারে। জেলা প্রশাসকের কাছে কিছু অভিযোগ জমা পড়েছে বলেও শুনেছি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবুসাঈদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘ডিলারশিপ নিয়োগে অনিয়মের বিষয়ে এখন পর্যন্ত চারটি অভিযোগ পেয়েছি।’ সংসদ সদস্যের স্বজনদের ডিলারশিপ পাওয়ার বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘এটা আমাদের বিষয় না। উপজেলা কমিটি যাদের যোগ্য মনে করছে তাদের মনোনীত করেছে। কমিটি যদি যোগ্য মনে করে তাহলে তো আমাদের কিছু বলার নেই।’
ফরিদপুরের নগরকান্দায় সারের ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। নগরকান্দার বিভিন্ন ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে রোববার সাংবাদিক সম্মেলন করেন আবেদন করেও ডিলারশিপ না পাওয়া ব্যক্তিরা। এছাড়া ফরিদপুর জেলায় কৃষকরা চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। কৃষকদের দাবি, ডিলাররা সার নেই বললেও অতিরিক্ত মূল্য দিলে পাওয়া যায়। এসব বিষয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগও দায়ের করা হয়েছে।
ফরিদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শাহাদুজ্জামান জানান, জেলায় কিছু এলাকায় অগ্রিম মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ শুরু হয়েছে। তবে সেসব এলাকায় যেন সার সংকট দেখা না দেয়, সেজন্য বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে।
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে নিয়োগ বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীরা। বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা অভিযোগ করেন, অর্থের বিনিময়ে ডিলারশিপ বিক্রি করা হয়েছে। উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য এবং উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব মোখলেছুর রহমান ও উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম রসুল রাজার বিরুদ্ধে তারা এসব অভিযোগ আনেন। অভিযোগকারীদের মধ্যে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা রয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম রসুল রাজা বলেন, যারা তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন, তারা না বুঝে করেছেন। যারা যোগ্য, তারাই ডিলারশিপ পেয়েছেন।’ একই অভিযোগ গাইবান্ধা সদর উপজেলায়ও। সেখানকার কামারজানি ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগ পেয়েছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সোলায়মান ইসলামের স্ত্রী জুঁই আক্তার। আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তিনি ডিলার হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে সোলায়মান ও তার স্ত্রীর দাবি, নিয়ম মেনেই ডিলারশিপ পেয়েছেন।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম মনে করেন,আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক সরকার তার দলীয় লোককে নিয়োগ দিতেই পারে। তবে অবশ্যই যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে হবে। কিন্তু শুনছি স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন কিংবা অনভিজ্ঞরাও নিয়োগ পেয়েছে। যে ব্যক্তি ঘুষ দিয়ে ডিলারশিপ নিয়েছে সে ওই টাকাটা সার বিক্রি করেই ওঠাবে। এতে করে গ্রামাঞ্চলে কৃষকের কাছে ডিলাররা বাড়তি দামে সার বিক্রি করবে। ভুক্তভোগী হবেন কৃষকরা। গোটা সার ব্যবস্থাপনায় সংকট দেখা দিয়েছে। এটি দ্রুত সমাধান না করলে কৃষির ওপর এর প্রভাব ফেলবে।’
খোঁজ নিয়ে দেশের কয়েকটি জেলায় সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কৃষকদের অতিরিক্ত দামে সার কেনার তথ্য মিলেছে। কৃষকরা বলছেন, ডিলার পয়েন্টে গেলে সার নেই জানানো হচ্ছে। তবে বাড়তি দাম দিলে ঠিকই পাওয়া যাচ্ছে।
রাজবাড়ী সদরের কৃষক আলাউদ্দিন মন্ডল বলেন, ‘এক বস্তা টিএসপি নগদ ১ হাজার ৮০০ টাকা দিয়ে কিনেছি। ইউরিয়া সারও কিনেছি ১ হাজার ৮০০ টাকায়। দোকানেও সার পাওয়া যাচ্ছে না।
কালুখালীর কৃষক অনিল কুমার বলেন, ‘রাজবাড়ী জেলায় এখন গুঁটি পেঁয়াজ (মুড়ি কাটা) চাষের মৌসুম। এ সময় টিএসপি ও ডিএপি সার ব্যবহার বেশি হয়। এর আগে ধান রোপণের পর থেকে ইউরিয়া সারের প্রয়োজন হয়েছিল বেশি। দোকানে গিয়ে এখন টিএসপি ও ডিএপি চাইলে ব্যবসায়ীরা বলছেন এসব সার নেই।
পাংশার কৃষক অমল মন্ডল অভিযোগ করে বলেন, ‘সরকার নির্ধারিত দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না। নগদ টাকায় ৫০ কেজির এক বস্তা টিএসপি ও ইউরিয়া কিনতে গেলে ১ হাজার ৮০০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। সরকার নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৩ ৫০ টাকা হলেও তা মিলছে না। আর পরিচিত দোকান ছাড়া টিএসপি পাওয়া যায় না।
উত্তরের জেলা লালমনিরহাটে সার সংকট নিয়ে বেশ কয়েক মাস ধরেই কৃষকরা অভিযোগ করছেন। আসন্ন ভুট্টা ও তামাক মৌসুমে এ নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন কৃষকরা। সংশ্লিষ্টদের দাবি, পর্যাপ্ত সার সরবরাহ না থাকা, ডিলারদের সিন্ডিকেট, তামাক চাষের জমির বিপরীতে সারের বরাদ্দ না থাকা এবং চরের জমির হিসাবে কৃষি বিভাগের তথ্যের গরমিলের কারণেই এসব সংকট বেড়েছে।
লালমনিরহাট কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, জেলায় মোট আবাদি জমির পরিমাণ ২ লাখ ৪৭ হাজার ৯৪৯ একর। মূল ভূখন্ডের আবাদি জমির সঙ্গে ২০২৫ সালে তিস্তা ও ধরলা নদীর ছোট-বড় ৭০টি চরের ৪ হাজার ৫৭০ একর জমি হিসাব করা হয়। তবে এ বছর চরের চাষযোগ্য জমি বেড়ে ১৩ হাজার ২১৫ একর হয়েছে। এতে মোট জমির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৬১ হাজার ১৬৪ হেক্টর। অথচ কৃষি বিভাগের হিসাবে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৯৪৯ একর।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিস্তা, ধরলা, সানিয়াজান ও স্বর্ণামতি নদীতে জেগে ওঠা ছোট-বড় ৭০টি চরের প্রায় ৩৬ হাজার একর জমিতে ভুট্টা, বোরো ধান ও শীতকালীন সবজি চাষ হয়ে থাকে। এসব জমির মধ্যে প্রায় ২২ হাজার ৭৮৫ একর জমির ফসল উৎপাদনের জন্য সরকারের কাছে হিসাব রয়েছে, ১৩ হাজার ২১৫ একর হিসাবের বাদে। এসব জমির জন্য সরকার থেকে সারের বরাদ্দ পায় না ডিলাররা। ফলে সার সংকটের সুযোগ নিয়ে ডিলাররা কৃষকের কাছ থেকে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি করছে। অভিযোগ রয়েছে, জেলাটিতে প্রায় ২ হাজার ৪০০ টাকা থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা দিয়ে টিএসপি সার সংগ্রহ করে কৃষকদের আবাদ করতে হচ্ছে।
কৃষি অর্থনীতিদিরা বলছেন, সামনের শীতকালীন সবজি, বোরো ধান ও পেঁয়াজের মৌসুম ঘিরে সার ও ডিলার নিয়ে তৈরি হওয়া অস্থিরতা দ্রুতই নিরসনে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। ডিলার নিয়োগ ঘিরে কোনো ঘুসের ঘটনা ঘটলে কিংবা সার সরবরাহ নিয়ে সংকট তৈরি হলে এর প্রভাব কৃষকের ওপরই পড়বে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক এএইচএম সাইফুল ইসলাম বলেন,সার ডিলার নিয়োগে সরকারের উদ্দেশ্য ভালো ছিল। কিন্তু শুরুতেই নিয়োগে অস্বচ্ছতা নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। ঘুষের মাধ্যমে নিয়োগ পেলে সার নিয়ে সংকট কাটবে না। কৃষককে বাড়তি দামে কিনতে হবে। এতে তাদের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হলে জাতীয় অর্থনীতিই আক্রান্ত হবে। সারের মনিটরিংটা ঠিকমতো হচ্ছে না। এটি ঠিক করতে হবে।
সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ সম্প্রতি বলেছেন, সারের ডিলার নিয়ে কিছু দিন আগে নিয়োগপ্রক্রিয়া হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, এমপির ছেলেও সারের ডিলার পেয়েছে, এমপির মেয়েও সারের ডিলার পেয়েছে, আবার এমপির শালীও কার্ড পেয়েছে। এখন যদি সরকার বিধবা কার্ড চালু করে, তাহলে দেখা যাবে এমপির বউও এই কার্ড আগে নেবে। বাংলাদেশের অবস্থাটাই হচ্ছে এমন। এমনকি বেকার কার্ডও তারা আগে পাবে। এই নিচু মন-মানসিকতা ত্যাগ করে আমরা জেন-জি জেনারেশন যারা আছি, যোগ্যতা ও মেধাকে প্রাধান্য দিয়ে বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে পারি, সেই প্রত্যাশাই করি।
