আজকাল ওয়েবডেস্ক: জ্বলন্ত ব্যারিকেড, কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়া আর পুলিশের জলকামান—টানা দ্বিতীয় সপ্তাহের শেষভাগেও ব্যাপক গণবিক্ষোভ ও অশান্তিতে উত্তাল হয়ে উঠল ইউরোপের একাধিক দেশ। জীবনযাত্রার আকাশছোঁয়া ব্যয়বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক বাড়িভাড়া, স্বল্প মজুরি এবং শিক্ষা ও সরকারি নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়ে ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল, আলবেনিয়া ও বেলজিয়ামের রাজপথে নেমেছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। পরিস্থিতি সামাল দিতে একযোগে কয়েক হাজার পুলিশ ও সেনাবহর মোতায়েন করা হলেও বহু জায়গায় আইনশৃঙ্খলা কার্যত ভেঙে পড়ে। বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও সংঘর্ষের জেরে কেবল ফ্রান্সে প্রায় এক হাজার জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, অন্যদিকে নতুন করে লুঠতরাজ রুখতে মিলানের রাস্তায় সেনা নামাতে বাধ্য হয়েছে ইতালি সরকার।
শনিবারের এই বিক্ষোভের সবচেয়ে উত্তপ্ত কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ফ্রান্স। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের মতে প্রায় চার লক্ষ এবং শ্রমিক ইউনিয়নগুলির দাবি অনুযায়ী প্রায় আট লক্ষ মানুষ দেশজুড়ে মিছিলে শামিল হন। প্যারিসে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ মোতায়েন থাকা সত্ত্বেও বিকেলের দিকে পরিস্থিতি রণক্ষেত্রের রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীদের একাংশ ব্যারিকেড তৈরি করে গাড়ির শোরুমের কাচ ভেঙে দেন এবং পুলিশের দিকে ইট-পাটকেল ছোড়েন। পালটা লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান দেগে ভিড় ছত্রভঙ্গ করে পুলিশ। মার্সেই ও বোর্দোর মতো শহরেও টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে রাস্তা অবরোধ করা হয়। রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে দ্রুত বিচারের হুঁশিয়ারি দিলেও সাধারণ মানুষের ক্ষোভের আঁচ থামানো যায়নি।
এদিকে ইতালির রোম, মিলান ও তুরিন শহরে যুবসমাজ ও পড়ুয়াদের ক্ষোভ আছড়ে পড়ে। রোমে বিক্ষোভকারীরা ঐতিহাসিক কলোসিয়াম চত্বর দখল করে গাজা যুদ্ধের বিরোধিতা এবং সরকারি নীতির বিরুদ্ধে স্লোগান দেন; সেখানে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয়। মিলানে দামি ব্র্যান্ডের দোকানগুলিতে লুঠতরাজের আশঙ্কায় কাচ ঢেকে বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির নির্দেশে ৫০০ অতিরিক্ত সেনা জওয়ান শহরের রাস্তায় টহল দিতে শুরু করেন। স্পেনের বার্সেলোনায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেয়; প্লাসা দে কাতালুনিয়া চত্বরে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীরা প্রায় ১৪টি দোকানে বেপরোয়া লুঠতরাজ চালান ও ৩০টির বেশি জায়গায় আগুন লাগিয়ে দেন, যার জেরে অন্তত ১০০ জনকে আটক করে পুলিশ।
বিক্ষোভের এই দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে পর্তুগাল ও বেলজিয়ামেও। লিসবনে ভাড়া বৃদ্ধি ও আবাসন সংকটের প্রতিবাদে মানুষ রাস্তায় নেমেছেন, আর ব্রাসেলসে পড়ুয়াদের বিক্ষোভ হঠাতে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ছুড়েছে পুলিশ। আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি ও টিউশন ফি কমানোর দাবিতে প্রধানমন্ত্রী এডি রামার পদত্যাগ চেয়ে অবস্থান দেখিয়েছেন হাজার হাজার পড়ুয়া। ইউরোপের দেশভেদে বিক্ষোভের ইস্যু আলাদা হলেও একটি সাধারণ সমীকরণ স্পষ্ট—যুদ্ধপরবর্তী মুদ্রাস্ফীতি, নিত্যপণ্যের লাগামছাড়া দাম এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণ প্রজন্মের গভীর হতাশা ইউরোপের প্রশাসনিক মসনদকে প্রবল নাড়িয়ে দিয়েছে। কড়া পুলিশি নিরাপত্তা ও ধরপাকড় চালিয়ে ক্ষোভ সাময়িক দমানো গেলেও মূল সংকটের সমাধান না হলে এই গণআন্দোলন আরও বড় আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা আন্তর্জাতিক মহলের।
