চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) উপাচার্য পদে অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমের নিয়োগ বহাল আছে। কিন্তু তাঁর নির্দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ চলবে কীভাবে, তা অনিশ্চিত। শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের তিন সংগঠন তাঁকে সহযোগিতা না করার কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের শাটডাউনও চলছে। এই অবস্থায় ক্লাস-পরীক্ষা চালু করতে উপাচার্য কী পদক্ষেপ নেবেন, তা স্পষ্ট নয়।
প্রায় ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর গত মঙ্গলবার ক্যাম্পাস থেকে বের হয়েছেন অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। তাঁর তাৎক্ষণিক নিরাপত্তার সংকট কেটেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার সংকট কাটেনি। এখন তিনি বাইরে থেকে কাজ করুন কিংবা আবার দপ্তরে ফিরুন—দুই ক্ষেত্রেই শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহযোগিতা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদেরও ক্লাসে ফিরতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা একটি যৌথ কাজ। উপাচার্য সিদ্ধান্ত দেন। তা বাস্তবায়ন করেন বিভাগীয় প্রধান, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। পরীক্ষা নিতে হয় বিভাগ ও পরীক্ষা দপ্তরকে। ক্লাস চালাতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী দুই পক্ষের উপস্থিতি প্রয়োজন।
চুয়েটে এই কাজগুলো তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বন্ধ। ছয়টি বিভাগের পরীক্ষা স্থগিত রয়েছে। সোমবার নতুন উপাচার্য তালা ভেঙে দপ্তরে প্রবেশের পরও কোনোটি চালু হয়নি; বরং শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি ও স্টাফ অ্যাসোসিয়েশন কর্মবিরতির সঙ্গে সর্বাত্মক অসহযোগ যুক্ত করেছে।
অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম শিক্ষক সমিতিকে দাবি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। পেশাদারত্ব বজায় রেখে কাজ করতে চান বলে বলেছেন। কিন্তু সংগঠনগুলো সেই আহ্বানে সাড়া দেয়নি। বাইরে থেকে অনলাইনে কিছু প্রশাসনিক কাজ করার কথাও তিনি আগে জানিয়েছিলেন। সেটিও বন্ধ ক্লাস-পরীক্ষা ফেরানোর সমাধান হয়নি।
ছাত্রদলকে সঙ্গে নেওয়ায় দূরত্ব বেড়েছে
অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম আগে বলেছিলেন, সবাইকে আস্থায় নিয়ে ক্যাম্পাসে যাবেন। সোমবার তিনি ছাত্রদল নেতাদের সঙ্গে নিয়ে তালা ভেঙে দপ্তরে প্রবেশ করেন। সকালে তাঁর কক্ষে সংগঠনটির সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান আল সাবিত ও সাংগঠনিক সম্পাদক বিপ্লব হোসাইনকে দেখা যায়। আবু সুফিয়ান আল সাবিত একসঙ্গে প্রবেশের কথা নিশ্চিত করেন।
অথচ উপাচার্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিরোধ মিটিয়ে ক্যাম্পাসে গেলে তালা ভেঙে দপ্তরে ঢোকার প্রয়োজন হতো না; কিন্তু সেই সমঝোতা হয়নি। শিক্ষার্থীরা আবার তালা দিয়েছেন।
ফলে ক্যাম্পাসে প্রবেশের এই পদ্ধতি তাঁর দায়িত্ব পালনের বাধা কমানোর বদলে বাড়িয়েছে। আগে বিরোধ ছিল নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়ে। এখন তাঁর নিজের পদক্ষেপ নিয়েও আপত্তি তৈরি হয়েছে।
একটি রাজনৈতিক সংগঠনের সমর্থন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সহযোগিতার বিকল্প নয়; বরং বিরোধের মধ্যে সেই সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে নিয়ে প্রবেশ করায় অন্যদের কাছে নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করা আরও কঠিন হয়েছে।
চুয়েটের প্রথম উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হকও এই পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, প্রশাসনিক প্রধান একটি পক্ষ নিয়ে নিলে অন্য পক্ষ তাঁকে মানতে চায় না।
অবরোধ শেষ হলেও ফেরার প্রশ্ন অমীমাংসিত
মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করে উপাচার্যকে বের করে নিয়ে যান। তাঁকে অ্যাম্বুলেন্সে ক্যাম্পাস থেকে নেওয়া হয়।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, তিনি আর ক্যাম্পাসে ফিরবেন না—এই শর্তে তাঁরা যেতে দিয়েছেন। প্রশাসন জানিয়েছে, অসুস্থ উপাচার্যের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেই তাঁকে নেওয়া হয়েছে। ক্যাম্পাসে না ফেরার শর্ত গ্রহণের কথা জেলা প্রশাসক বা পুলিশ সুপার বলেননি। পদত্যাগ বা অব্যাহতির ঘোষণাও আসেনি।
এই দুই বক্তব্যের পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীরা যদি ধরে নেন তিনি আর ফিরবেন না, অথচ সরকার তাঁকে আবার পাঠায়, তাহলে একই বিরোধ ফিরে আসতে পারে।
তাই উপাচার্যকে বের করে নেওয়া অবরোধের তাৎক্ষণিক নিষ্পত্তি হলেও তাঁর দায়িত্বের ভবিষ্যৎ এবং বিশ্ববিদ্যালয় চালুর প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত।

সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এখন কী হবে
সংকটের শুরু ২১ সেপ্টেম্বর। সেদিন অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে দায়িত্ব পালনের ৫৬ দিনের মাথায় সরিয়ে অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
ওই রাতে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরদিন থেকে চলছে সর্বাত্মক শাটডাউন। পরে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও কর্মবিরতিতে যোগ দেন।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম দীর্ঘদিন তাঁদের বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও চাকরির সুযোগ পেতে সহায়তা করেছেন। উপাচার্য হওয়ার পর তাঁদের কথা শুনেছেন এবং কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন। তাঁকে আরও সময় দেওয়া উচিত ছিল বলে মনে করেন তাঁরা।
শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মো. আবুল হাসান বলেছেন, অল্প সময় কাজের সুযোগ দিয়ে ব্যাখ্যা ছাড়া তাঁকে সরানো তাঁদের কাছে অপমানজনক মনে হয়েছে। এই ক্ষোভের উত্তর না আসার মধ্যেই নতুন উপাচার্যের যোগদান, প্রত্যাখ্যান, তালা ভেঙে প্রবেশ ও অবরোধের ঘটনা ঘটেছে।
সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একজন ব্যক্তি প্রথম আলোকে বলেছেন, উপাচার্য একটি প্রশাসনিক পদ। কাকে দায়িত্ব দিলে বিশ্ববিদ্যালয় ভালো চলবে, তা সরকার বিবেচনা করবে। নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়ে আন্দোলন করা সমীচীন নয় বলে তাঁর মত। আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার সন্দেহও করেছেন তিনি।
শিক্ষার্থীরা তা অস্বীকার করছেন। তাঁদের বক্তব্য, শিক্ষা ও নিজেদের স্বার্থেই তাঁরা আন্দোলন করছেন। অন্যদিকে কয়েকজন শিক্ষক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী নিয়োগ পরিবর্তনে স্থানীয় রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের সন্দেহ করেছেন। সেই সন্দেহের সঙ্গে সিদ্ধান্তের যোগসূত্র নিশ্চিত করা যায়নি।

সংকট সমাধানে সরকারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগই হয়নি—এ কথা ঠিক নয়। শিক্ষক সমিতি উচ্চপর্যায়ে পুনর্বহালের দাবি ও যুক্তি তুলে ধরেছে। বিভাগীয় কমিশনারের পক্ষ থেকে আলোচনার আহ্বান এসেছিল। শিক্ষকেরা সাড়া দেননি। নতুন উপাচার্যের উপস্থিতি নিয়ে আপত্তির কথা শিক্ষক সমিতির একজন নেতা জানিয়েছেন।
আরেক শিক্ষক দাবি করেছেন, আন্দোলন স্থগিতের শর্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয় আলোচনায় বসতে চেয়েছিল। এই শর্তের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমও মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের কথা বলেছেন।
কিন্তু যোগাযোগের পর কী সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। কে আলোচনা পরিচালনা করবে, কারা বসবেন, নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়ে কথা বলা যাবে কি না এবং ক্লাস-পরীক্ষা কীভাবে শুরু হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর আসেনি।
তিন সংগঠনের অসহযোগ ও শিক্ষার্থীদের শাটডাউন আলাদা কর্মসূচি। শুধু শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বললে শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি শেষ হবে না। আবার শুধু শিক্ষার্থীদের আশ্বাস দিলেও প্রশাসনিক অসহযোগ কাটবে না। সমাধানের জন্য উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদের আলোচনায় প্রয়োজন।

নতুন উপাচার্যের পদত্যাগ এবং অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমের পুনর্বহালও দুটি পৃথক সিদ্ধান্ত। প্রথমটি ঘটলেও দ্বিতীয়টি স্বয়ংক্রিয়ভাবে হবে না। তাই মূল দাবির নিষ্পত্তি উপাচার্যের একার হাতে নেই।
সরকারকে এখন একটি পথ বেছে নিতে হবে। বর্তমান নিয়োগ বহাল রাখলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে বিরোধ কাটিয়ে কাজের পরিবেশ তৈরির ব্যবস্থা প্রয়োজন। আগের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা কিংবা অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য বিকল্প নিলে সেটিও পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে। অনিশ্চয়তা রেখে শুধু যোগাযোগ চালিয়ে গেলে অচলাবস্থা দীর্ঘ হবে।
শিক্ষক সমিতি ও অন্য সংগঠনগুলোকেও বলতে হবে, কী শর্তে তারা আলোচনায় যাবে এবং শিক্ষা কার্যক্রম ফেরানো সম্ভব হবে। শিক্ষার্থীরা দাবি বহাল রেখেও বৈঠকে বসতে পারেন। আলোচনায় যাওয়াকে দাবি ছেড়ে দেওয়া হিসেবে দেখলে সমাধানের সুযোগ কমে যাবে।
এর পাশাপাশি বাসে হামলার অভিযোগ তদন্ত ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। অবরুদ্ধ ব্যক্তিদের পানি ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং খাবার ও চিকিৎসা নিয়ে সংকটের মতো পরিস্থিতিও যেন আর তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম এ যাত্রায় মুক্ত হয়েছেন। কিন্তু তাঁকে আবার দপ্তরে বসানোই সমাধান নয়। সরকার কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত কাজ ও ক্লাস-পরীক্ষা চালু করবে—এখন স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন সেই প্রশ্নের।
সমাধান কোন পথে
সংকট সমাধানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকেও শিক্ষার্থীদের কাছে স্পষ্ট বার্তা আসেনি। অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম দায়িত্বে থাকবেন কি না, থাকলে তিন সংগঠনের অসহযোগ কাটিয়ে কীভাবে কাজ করবেন এবং শিক্ষার্থীরা কবে ক্লাসে ফিরবেন—এসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
এই অনিশ্চয়তায় উপাচার্য দায়িত্ব চালিয়ে যেতে চান, আন্দোলনকারীরাও দাবি আদায়ে অনড়। তাঁদের কে আলোচনায় বসাবে, কী নিয়ে আলোচনা হবে এবং কখন সিদ্ধান্ত আসবে—তার কোনো রূপরেখা নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে তাই শুধু পরিস্থিতির খবর নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে জরুরি ভিত্তিতে সমাধানের আলোচনা শুরু করতে হবে। উপাচার্য জানিয়েছেন, সুস্থ হয়ে তিনি ক্যাম্পাসে ফিরবেন। তাঁর ফেরাকে কেন্দ্র করে আবারও একই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
উপাচার্য থাকবেন কি না—এই সিদ্ধান্তের আইনি ক্ষমতা আচার্যের। আর আলোচনার মাধ্যমে অচলাবস্থা কাটানোর উদ্যোগ নেওয়া এবং সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ভূমিকা রাখতে পারে।
