রংপুর: রংপুর জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান। এমপি হয়েও প্রশাসনের কাছে গুরুত্ব না পাওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘আমাকে বাধ্য করবেন না থানা ঘেরাও করার জন্য, আমাকে বাধ্য করবেন না ডিসি অফিস ঘেরাও করার জন্য। পরিষ্কার বললাম। আমি ভদ্র লোক, কিন্তু অভদ্র হতে বাধ্য করবেন না।’
রোববার (১১ অক্টোবর) জেলা প্রশাসনের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত এই সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন মাহবুবুর রহমান।
সভা শেষ হওয়ার পর সোমবার (১২ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ওই বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়।
ভিডিওতে দেখা যায়, চিৎকারের সুরে সংসদ সদস্য বলছেন, ‘আপনারা এমপিকে পাত্তা দিচ্ছেন না? হোয়াই? হোয়াই? কী মনে করেন, আমরা আসমান থেকে আসছি? মঙ্গল গ্রহ থেকে আসছি? উই আর দ্য সন অব দিস সয়েল, অব দিস ল্যান্ড। জনগণ আমাকে ভোট দিয়েছে। আপনারা পাত্তা দিচ্ছেন না কেন? চেয়ার দিতে চান না কেন? জনগণ নিয়ে কি ঘেরাও করব? রাস্তাঘাট চলাচল বন্ধ করে দেব?’
সভায় প্রশাসনের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ তোলেন জামায়াতের এই সংসদ সদস্য। প্রশাসন সংসদ সদস্যদের পদমর্যাদাক্রম (ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স) মানছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জেলার বিভিন্ন সরকারি কমিটিতে সংসদ সদস্যদের প্রতিনিধি না রাখার অভিযোগ তুলে মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘জেলায় অনেক কমিটি আছে, কিন্তু এমপির কতজন প্রতিনিধি সেখানে আছেন। স্পষ্ট বলা আছে, এমপির প্রতিনিধি থাকতে হবে, সেখানেও নাই। সমস্ত একটা দল তাদের কুক্ষিগত করে নিয়েছে। এটা কি গণতন্ত্র?’
সার ডিলার নিয়োগে ন্যক্কারজনক দলীয়করণ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। বিএনপিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘সব ডিলার একটা দল থেকে দেওয়া হয়েছে। যদি তা-ই হয়, তাহলে আপনারা অন্যদেরকে এখানে আবেদন করালেন কেন? প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বঞ্চিত হলো কেন?’ তিনি অভিযোগ করেন, একই পরিবারের তিনজন সারের ডিলারশিপ পেয়েছেন।
প্রশাসন একটি নির্দিষ্ট দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করছে বলেও অভিযোগ তোলেন মাহবুবুর রহমান।
প্রশাসনের লোকজনকে উদ্দেশ্য করে মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘যদি পাবলিক খেপে যায়, তাহলে কিন্তু সেই খ্যাপানো আপনারা থামাতে পারবেন না, পরিষ্কার বলে দিলাম। সেই ক্ষমতা পুলিশের নাই, কারও নাই। পাবলিক অত বোকা আর নাই। পুলিশকে, র্যাবকে আর ভয় পায় না, তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য।’
সার ডিলার নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘এ রকম ঘটনা ইতঃপূর্বে ঘটছে বলে আমি মনে করি না। এটা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ জনগণের মধ্যে আছে। এই অসন্তোষ কত দূর পর্যন্ত যাবে, আমি জানি না। আমি জনপ্রতিনিধি হিসেবে জনগণের কাছে এর জবাবদিহি দিতে পারতেছি না। জবাবটা কী হবে, মাননীয় ডিসি ঠিক করে দিলে ভালো হয়।’
ওই আইনশৃঙ্খলা সভায় মহানগর পুলিশ কমিশনার ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক উপস্থিত ছিলেন না। এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সিটি নিয়ে আলোচনা হবে; সিটি প্রশাসক নাই, মেয়র নাই, এ তো হতে পারে না! তারা আসবেন না কেন, আমার মাথায় ঢোকে না। এমপিরা যদি থাকতে পারেন, হোয়াই নট প্রশাসক? হোয়াই নট মেয়র? আমি বুঝি না। হোয়াই নট পুলিশ কমিশনার? তাহলে কী তাঁরা আমাদের চেয়েও সুপেরিওর। রুল অব প্রিসিডেন্স, আমি থাকব ওরা থাকবে না কেন? ওরা কি বড় লাটসাহেব হয়ে গেছে? নিজেকে লাটসাহেব ভাববেন না। ইউ আর দ্য সার্ভেন্ট অব দ্য পিপল।’
সংসদ সদস্য সভাটি পুনর্নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেন।
সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমানের বক্তব্যের জবাবে জেলা প্রশাসক ও জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি ইসরাত জাহান বলেন, আইনশৃঙ্খলা কমিটি জেলার সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম। এখানে সরকারি কর্মকর্তাসহ উপস্থিত সবার পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদা বজায় রেখে আলোচনা করা সমীচীন। যেকোনো বক্তব্য উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সবারই শব্দচয়নের ব্যাপারে আরও দায়িত্বশীল ও সতর্ক থাকা উচিত।
জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহানের সভাপতিত্বে ওই আইনশৃঙ্খলা সভায় রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী, রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী এবং রংপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল আমিনসহ মহানগর ও জেলা পুলিশের কর্মকর্তা এবং জেলার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন
