বিজয়া দশমী মানেই বাঙালির হৃদয়ে একধরণের বিষাদ আর বিদায়ের সুর, তবে তারই মাঝে মেতে ওঠার ধামাকা অনুষঙ্গ হলো সিঁদুর খেলা। দেবীকে বরণ করে নেওয়ার পর বিবাহিত নারীরা একে অপরকে সিঁদুরে রাঙিয়ে তুলে আনন্দময় মুহূর্তে মেতে ওঠেন। এর পরপরই দেবীর বিসর্জনের মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটে বছরের অন্যতম সেরা শারদীয় আনন্দযজ্ঞের। বিজয়া দশমীর শুভ ক্ষণ থেকে শুরু করে নদী বা জলাশয়ের ঘাটে বিসর্জনের বিষাদময় সময় পর্যন্ত পোশাক, মেকআপ, গহনা এবং জুতোর নির্বাচনে থাকা চাই বিশেষ বুদ্ধিমত্তা ও নান্দনিকতা।
দশমী ও বিসর্জনের পোশাক নির্বাচন: ঐতিহ্য ও সুবিধার মেলবন্ধন
সিঁদুর খেলার বিশেষ মুহূর্তটির জন্য পোশাক নির্বাচন হওয়া উচিত বেশ বুঝে-শুনে, যা সহজে সামলানো যায় এবং সিঁদুরের রঙে রাঙা হলেও তার নান্দনিকতা বজায় থাকে। সিঁদুর খেলার জন্য নারীদের একদম নিখুঁত পছন্দ লাল পাড় সাদা বা বাসন্তী শাড়ি। তবে শাড়িটি যেন খুব বেশি দামি বা ভারী না হয়, কারণ সিঁদুরের লাল রঙ ও তেলের ছোঁয়া লেগে শাড়ি নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। হালকা লাল-সাদা কটন, তাঁত বা হাফ-সিল্ক শাড়ি পরলে নাচ-গান ও সিঁদুর খেলায় কোনো অস্বস্তি হয় না। অন্যদিকে, দেবী বিসর্জনের প্রহরে ঘাটে যাওয়ার জন্য একদম সাধারণ লাল-সাদা কটন বা একরঙা লাল সুতির শাড়ি কিংবা শালীন সুতির জামাকাপড় বেছে নেওয়াই শ্রেয়, যা বিদায়লগ্নের বিনম্র আবেগের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ওয়াটারপ্রুফ মেকআপ ও প্রাকৃতিক কেশসজ্জা
সিঁদুর খেলা ও ঘাটে বিসর্জনের সময় সাজগোজ হওয়া চাই অত্যন্ত মার্জিত ও টেকসই। সিঁদুর খেলা ও ঢাকের তালে নাচের সময় ঘাম বা সিঁদুরের কারণে মেকআপ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাই মেকআপ একদম ওয়াটারপ্রুফ হওয়া চাই। হালকা ওয়াটারপ্রুফ মেকআপ বেসের সাথে চোখে ওয়াটারপ্রুফ কাজল, আইলাইনার ও ঠোঁটে স্নিগ্ধ লাল লিপস্টিকই সিঁদুর খেলার দিনের সেরা রূপ। কেশসজ্জার ক্ষেত্রে পরিপাটি সাধারণ খোঁপা বা বেনি করে তাতে সিঁদুরের ছোঁয়া এনে দেওয়া যায়। আবার বিসর্জনের সময় ঘাটে যাওয়ার প্রহরে মেকআপ একদম সাদাসিধে ও ন্যাচারাল রাখা ভালো। কপালে লাল সিঁদুরের অনায়াস ছোঁয়া এবং খোলা চুলে বাতাসের স্পর্শেই বিসর্জনের করুণ অথচ সুন্দর আবহটি ফুটে ওঠে।
সুরক্ষার খাতিরে গহনার মার্জিত ব্যবহার
বিসর্জন ও সিঁদুর খেলার দিনে অতিরিক্ত গয়নাগাটি বা ঝকমকে অলংকার এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ। হুলস্থুল নাচ-গান, ধুনুচি নাচ এবং সিঁদুর খেলার মাঝে মূল্যবান অলংকার হারিয়ে যাওয়া কিংবা খসে পড়ার বড় ঝুঁকি থাকে। তাই সিঁদুর খেলা ও বিসর্জনের সময় হালকা সোনা, রূপা কিংবা মেটালের ছোট ছোট কানের দুল, বালা বা সরু চেইন পরা সবচেয়ে নিরাপদ। এতে ঐতিহ্যময় রূপও ধরে রাখা যায় এবং অহেতুক দুশ্চিন্তা থেকেও মুক্ত থাকা সম্ভব হয়।

পুরুষদের ঐতিহ্যবাহী পরিচ্ছদ ও পরিবেশোপযোগী জুতোর ব্যবহার
পুরুষদের জন্যও বিজয়া দশমী ও বিসর্জনের ক্ষণটি অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ। বিজয়ার কোলাকুলি, মিষ্টিমুখ এবং গুরুজনদের পদধূলি নেওয়ার সময় শুভ্র ও পরিচ্ছন্ন পোশাকে বিজয়ার আবাহন ফুটিয়ে তুলতে সাদা, ঘিয়ে বা লাল রঙের সুতির পাঞ্জাবি ও পাজামা পরা চিরায়ত ঐতিহ্য। আবার ঘাটে ঠাকুর বিসর্জনের সময় চলাফেরা করার জন্য আরামদায়ক সুতির ক্যাজুয়াল পাঞ্জাবি-পাজামা বা শর্ট কুর্তা পরলে বেশ সুবিধা হয়।
বিজয়া দশমীতে পুরুষদের পোশাকের সাথে জুতোর নির্বাচনে স্বাচ্ছন্দ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। সকালে কোলাকুলি ও বিজয়ার শুভেচ্ছাদানের প্রহরে ট্র্যাডিশনাল সাদা বা ঘিয়ে পাঞ্জাবি-পাজামার সাথে পায়ে চামড়ার কোলাপুরী স্যান্ডেল, নাগরা বা স্লিপ-অন জুতো পরা বেশ ক্লাসি ও আরামদায়ক। তবে বিকেলে বা সন্ধ্যায় বিসর্জনের ঘাটে যাওয়ার সময় যেখানে কাদা বা ভিড়ের সম্ভাবনা থাকে, সেখানে দামি জুতো এড়িয়ে চলাই ভালো। ঘাটে যাতায়াতের জন্য আরামদায়ক চামড়ার বেল্ট স্যান্ডেল, ক্যানভাস কেডস কিংবা সাধারণ স্নিকার্স বেছে নিলে পা সুরক্ষিত থাকে এবং বিসর্জনের পুরো প্রক্রিয়ায় অনায়াসে চলাফেরা করা সম্ভব হয়। বিসর্জন শেষে কোলাকুলি ও বড়দের আশ-আশীর্বাদ নেওয়ার মধ্য দিয়েই ইতি ঘটে রঙিন এই দুর্গোৎসবের।
