ভ্রমণের পরিকল্পনায় পোশাক, হোটেল আর যাতায়াতের হিসাব থাকে। কিন্তু, গন্তব্যের স্বাস্থ্যঝুঁকি, প্রয়োজনীয় ওষুধ কিংবা জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা নিয়ে কতটা ভাবি? আনন্দের ভ্রমণ নির্বিঘ্ন রাখতে আগে থেকেই কিছু স্বাস্থ্য প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
বেড়াতে যাওয়ার কথা ভাবলেই মনে পড়ে নতুন জায়গা দেখা, পছন্দের খাবার খাওয়া আর প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানোর কথা। কেউ পাহাড়ে যেতে চান, কেউ সমুদ্রের কাছে, আবার কারো পরিকল্পনা বিদেশ ভ্রমণের। গন্তব্য যেখানেই হোক, ভ্রমণের আনন্দ যেন অসুস্থতা বা স্বাস্থ্যগত জটিলতায় মাটি না হয়, সে জন্য আগেভাগেই কিছু প্রস্তুতি নেওয়া দরকার।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ভ্রমণ ও স্বাস্থ্যবিষয়ক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ভ্রমণের সময় কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন, তা নির্ভর করে ভ্রমণকারীর শারীরিক অবস্থা, যাত্রার ধরন এবং গন্তব্যের ওপর। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার পরিবর্তন, বায়ুদূষণ, সংক্রামক রোগ, নিরাপদ খাবার ও পানির অভাব এবং স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ—সবই ভ্রমণকারীর স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই ব্যাগ গোছানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রস্তুতিও থাকা চাই।
১. গন্তব্যের স্বাস্থ্যঝুঁকি আগে জানুন
ভ্রমণের প্রস্তুতি শুরু হোক গন্তব্য সম্পর্কে খোঁজ নেওয়ার মধ্য দিয়ে। আপনি যেখানে যাচ্ছেন, সেখানে আবহাওয়া কেমন, কোন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি রয়েছে, চিকিৎসাসেবা পাওয়া কতটা সহজ; এসব তথ্য আগে জেনে নিন।
পাহাড়ি এলাকায় গেলে উচ্চতার প্রভাব, গরম অঞ্চলে গেলে পানিশূন্যতা ও অতিরিক্ত তাপের ঝুঁকি, আর মশাবাহিত রোগের প্রকোপ রয়েছে এমন এলাকায় গেলে মশার কামড় থেকে সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে।
বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে গন্তব্য ও যাত্রাপথ অনুযায়ী কোন টিকা প্রয়োজন বা সুপারিশ করা হয়, সেটিও জেনে নেওয়া জরুরি। কোনো কোনো দেশে প্রবেশের জন্য নির্দিষ্ট টিকার প্রমাণপত্র প্রয়োজন হতে পারে।
সম্ভব হলে যাত্রার চার থেকে আট সপ্তাহ আগে ভ্রমণস্বাস্থ্য ক্লিনিক বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে। তবে যাত্রার সময় কাছাকাছি চলে এলেও পরামর্শ নেওয়া উপকারী হতে পারে।
২. নিয়মিত ওষুধ সঙ্গে নিতে ভুলবেন না
যারা নিয়মিত ওষুধ খান, তাদের জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভ্রমণের সময় ওষুধের বিরতি হলে অসুস্থতা বেড়ে যেতে পারে বা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
যাত্রার পুরো সময়ের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে রাখুন। সম্ভাব্য বিলম্ব বা পরিকল্পনা পরিবর্তনের কথা ভেবে কিছু অতিরিক্ত ওষুধ রাখার ব্যবস্থাও করুন। তবে, ওষুধের পরিমাণ ও ব্যবহারের বিষয়ে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত।
ওষুধ মূল প্যাকেটে রাখলে নাম, মাত্রা ও ব্যবহারের নির্দেশনা শনাক্ত করা সহজ হয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন বা ওষুধ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা চিঠিও সঙ্গে রাখুন। বিশেষ করে বিদেশ ভ্রমণে কিছু ওষুধ বহনের ওপর বিধিনিষেধ থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে গন্তব্য দেশের নিয়ম আগে জেনে নিতে হবে।
৩. দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকলে বাড়তি প্রস্তুতি
ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ, হাঁপানি, মৃগী বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসমস্যা থাকলেই যে ভ্রমণ করা যাবে না, তা নয়। তবে, নিজের শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী পরিকল্পনা করা জরুরি।
যাত্রার আগে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে জেনে নিন, ভ্রমণের সময় ওষুধ কীভাবে নিতে হবে, বিশেষ কোনো সরঞ্জাম সঙ্গে রাখা প্রয়োজন কি না এবং গন্তব্যে চিকিৎসাসেবা কোথায় পাওয়া যাবে।
দীর্ঘ বিমানযাত্রা, সময়ের পার্থক্য, ঘুমের অনিয়ম কিংবা অতিরিক্ত পরিশ্রম কিছু মানুষের শারীরিক সমস্যাকে বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে নিয়মিত ওষুধ গ্রহণের সময় যেন বদলে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী, ছোট শিশু এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ভ্রমণকারীদের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন অনুযায়ী আগাম প্রস্তুতি নেওয়া উচিত।
৪. খাবার ও পানির নিরাপত্তায় সতর্ক থাকুন
ভ্রমণে নতুন খাবার চেখে দেখার আনন্দ আছে। তবে খাবার ও পানির নিরাপত্তার বিষয়ে অসতর্ক হলে পেটের অসুখ, ডায়রিয়া কিংবা বমির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
খাবার ভালোভাবে রান্না করা কি না, পরিবেশনের জায়গা পরিচ্ছন্ন কি না এবং পানির উৎস নিরাপদ কি না, খেয়াল করুন। পানির নিরাপত্তা নিয়ে সন্দেহ থাকলে সিল করা নিরাপদ পানীয় বা উপযুক্তভাবে শোধন করা পানি বেছে নিন। বরফ তৈরিতে ব্যবহৃত পানিও নিরাপদ কি না, তা বিবেচনা করা দরকার।
খাওয়ার আগে ও শৌচাগার ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস বজায় রাখুন। হাত ধোয়ার সুযোগ না থাকলে উপযুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার কাজে লাগতে পারে।
বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে ভ্রমণ করলে খাবার ও পানির বিষয়ে বাড়তি সতর্ক থাকুন। ডায়রিয়া বা বমি শুরু হলে পানিশূন্যতার লক্ষণ খেয়াল করুন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নিন।
৫. ভ্রমণবিমা ও জরুরি কাগজপত্র রাখুন
ভ্রমণের সময় হঠাৎ অসুস্থতা বা দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। অপরিচিত জায়গায় চিকিৎসা নিতে গিয়ে খরচও বেশি হতে পারে। এ কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভ্রমণের আগে উপযুক্ত ভ্রমণবিমা করার পরামর্শ দিয়েছে।
বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিমা চিকিৎসা ব্যয়, জরুরি চিকিৎসা কিংবা প্রয়োজন হলে দেশে ফেরানোর ব্যয় বহন করে কি না, তা শর্ত দেখে বুঝে নিন। আগে থেকে কোনো স্বাস্থ্যসমস্যা থাকলে সেটি বিমা প্রতিষ্ঠানের কাছে সঠিকভাবে জানানোও গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্যবিমার কাগজপত্র, জরুরি যোগাযোগের নম্বর, প্রয়োজনীয় প্রেসক্রিপশন এবং টিকার নথি সঙ্গে রাখুন। কাগজপত্রের পাশাপাশি ফোনে নিরাপদ একটি কপি রাখলেও প্রয়োজনের সময় কাজে লাগতে পারে।
গন্তব্যে কাছাকাছি হাসপাতাল, চিকিৎসাকেন্দ্র বা ফার্মেসি কোথায় রয়েছে, সেটিও আগে জেনে রাখা ভালো।
৬. আবহাওয়া ও যাতায়াতের ঝুঁকি মাথায় রাখুন
ভ্রমণের সময় আবহাওয়ার পরিবর্তনকে অবহেলা করা ঠিক নয়। গরমে দীর্ঘক্ষণ বাইরে থাকলে পানিশূন্যতা ও শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। প্রয়োজন অনুযায়ী পানি পান করুন, রোদ থেকে বাঁচতে ছাতা বা টুপি ব্যবহার করুন এবং অতিরিক্ত গরমের সময় শারীরিক পরিশ্রম কমিয়ে দিন।
ঠান্ডা বা বৃষ্টিপ্রবণ এলাকায় গেলে উপযুক্ত পোশাক ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রী রাখুন। পাহাড়ে হাঁটা, সাঁতার কাটা কিংবা অন্য কোনো দুঃসাহসিক কার্যক্রমের পরিকল্পনা থাকলে নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী প্রস্তুতি নিন।
যাতায়াতের ক্ষেত্রেও নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ। গাড়িতে সিটবেল্ট ব্যবহার, মোটরসাইকেলে হেলমেট পরা এবং অপরিচিত রাস্তায় সতর্কভাবে চলাফেরা করা দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
৭. ফিরে এসেও শরীরের দিকে নজর দিন
ভ্রমণ শেষ হলেই স্বাস্থ্যঝুঁকি শেষ হয়ে যায় না। কোথাও বেড়াতে গিয়ে সংক্রমণের সংস্পর্শে এলে দেশে ফেরার পরও অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিতে পারে। ফেরার পর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে জ্বর, দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া, বারবার বমি, জন্ডিস বা অন্য অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ভ্রমণের সময় কোথায় গিয়েছিলেন, কোনো অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছিলেন কি না এবং কী কী ওষুধ বা টিকা নিয়েছেন, সে তথ্য চিকিৎসককে জানান।
ম্যালেরিয়ার চিকিৎসা নিয়ে থাকলে কিংবা ভ্রমণের সময় কোনো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বিশেষভাবে জরুরি। গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।
আনন্দের ভ্রমণ হোক সচেতন প্রস্তুতিতে
ভ্রমণের পরিকল্পনা মানে শুধু কোথায় থাকবেন, কী খাবেন বা কী দেখবেন, তার হিসাব নয়। নিজের ও ভ্রমণসঙ্গীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিও পরিকল্পনার অংশ হওয়া উচিত।
গন্তব্য সম্পর্কে আগাম তথ্য সংগ্রহ, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা, নিরাপদ খাবার-পানি বেছে নেওয়া এবং জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা সম্পর্কে জানা—এই ছোট ছোট পদক্ষেপ ভ্রমণের সময় অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি সামলাতে সাহায্য করতে পারে।
কারণ, সুন্দর ভ্রমণের স্মৃতি শুধু নতুন জায়গা দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সুস্থভাবে ঘুরে এসে সেই স্মৃতিগুলো উপভোগ করতে পারাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা
