জীবিত থেকেও ভোটার তালিকায় ‘মৃত’, তালিকায় নাম ফেরাতে হিমশিম
চ্যানেল আই অনলাইনপ্রকাশ:
জীবিত থাকার প্রমাণ দিতে ভারতের রাজধানী দিল্লির সরকারি দপ্তরগুলোতে একের পর এক ছুটছেন ৫৩ বছর বয়সী দর্জি কামতা প্রসাদ। ভোটার তালিকায় তাকে মৃত হিসেবে চিহ্নিত করায় নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে এখন রীতিমতো প্রশাসনিক জটিলতার মুখে পড়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) প্রকাশিত বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রসাদ ভারতের প্রায় ১৩ কোটি মানুষের একজন, যাদের নাম ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রমের আওতায় বাদ দেওয়া হয়েছে। দেশটির নির্বাচন কমিশনের পরিচালিত স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) কর্মসূচি নিয়ে ব্যাপক প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে এ ঘটনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার পেছনে ‘যৌক্তিক অসংগতি’ থেকে শুরু করে ভোটারকে মৃত হিসেবে নথিভুক্ত করার মতো বিভিন্ন কারণ দেখানো হয়েছে। ফলে অনেক ভোটারকে নিজেদের ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার পাশাপাশি জীবিত থাকার প্রমাণ দিতেও সরকারি দপ্তরে দৌড়াতে হচ্ছে।
প্রসাদের পরিবারে চারজন সদস্য। প্রতিদিন ২৫০ রুপি (প্রায় ২.৬৩ মার্কিন ডলার) মজুরিতে কাজ করে পরিবারের ভরণপোষণ করেন তিনি। কিন্তু নিজের নাম ভোটার তালিকায় ফিরিয়ে আনতে দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে গিয়ে তাকে নিয়মিত কাজ বাদ দিতে হচ্ছে।
প্রসাদ বলেন, ‘বিষয়টি জানার পর আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। এরপর থেকে আমি জীবিত, এটি প্রমাণ করতে সব জায়গায় ঘুরছি।’
নির্বাচন কমিশনের ৩১ আগস্ট প্রকাশিত খসড়া ভোটার তালিকা অনুযায়ী, দিল্লিতে প্রায় ৪২ লাখ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে।
ভোটার তালিকা সংশোধন ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক
ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়ার ঘটনায় ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিরোধী দল ও বিভিন্ন যুব সংগঠন নয়াদিল্লিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় প্রতিদিনই বিক্ষোভ করছে। এসব বিক্ষোভে পুলিশ বলপ্রয়োগ করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমার ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় কারসাজি করেছেন, যাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সুবিধা পায়। তবে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি—উভয় পক্ষই এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
দিল্লির একটি বেসরকারি সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবক রাজেন্দ্র কুমারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রসাদের এলাকায় প্রায় ৯ হাজার ভোটারের মধ্যে প্রায় ২ হাজার জনের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। তাদের অনুপস্থিত, অন্যত্র স্থানান্তরিত, মৃত অথবা অন্য জায়গায় নিবন্ধিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ওই এলাকায় প্রসাদই একমাত্র ব্যক্তি, যাকে মৃত হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। তবে দেশের বিভিন্ন স্থানে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
নাম ফেরাতে প্রশাসনিক জটিলতা
নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, ভুয়া বা দ্বৈত নিবন্ধন, মৃত ব্যক্তি, অন্যত্র স্থানান্তরিত ভোটার এবং অন্যান্য অযোগ্য ব্যক্তির নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। তবে ভুলবশত যাদের নাম বাদ পড়েছে, তারা প্রয়োজনীয় নথি জমা দিয়ে দাবি জানাতে এবং ভোটার তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার আগে আপিল করতে পারবেন।
কিন্তু বাস্তবে ভোটারদের অনেককেই দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী, তাদের জীবিত থাকার প্রমাণ, বসবাসের ঠিকানা, তথ্যে অসংগতি সংশোধন কিংবা নতুন করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হচ্ছে।
এ জন্য একাধিকবার নির্বাচন কার্যালয়ে যাওয়া, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের শুনানিতে অংশ নেওয়া এবং পর্যায়ক্রমে আপিল করার প্রয়োজন হচ্ছে। কারও কারও ক্ষেত্রে নাম পুনর্বহালের চেষ্টা কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাস পর্যন্ত গড়াচ্ছে।
প্রসাদ বলেন, ‘আমি তাদের বলেছি, গত বিধানসভা ও সাধারণ নির্বাচনে ভোট দিয়েছি। ৩৫ বছর ধরে ভোট দিয়ে আসছি। কিন্তু কেউ আমার কথা শুনছেন না।’
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলেও ভারতের নির্বাচন কমিশন কোনো জবাব দেয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নতুন ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের পরামর্শ
কয়েক সপ্তাহের প্রতিবাদের পর দিল্লিসহ কয়েকটি রাজ্যে নতুন করে যাচাই-বাছাইয়ের নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। প্রসাদ জানিয়েছেন, কর্মকর্তারা তাকে আশ্বাস দিয়েছেন যে তার নাম ভোটার তালিকায় পুনর্বহাল করা হবে।
তবে সবার ক্ষেত্রে একই ধরনের আশ্বাস মিলছে না। দিল্লির একটি বেসরকারি স্কুলের ৩৮ বছর বয়সী শিক্ষক কমল লালকে ভোটার তালিকায় ‘স্থানান্তরিত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অথচ তিনি এখনও একটি উড়ালসড়কের নিচে বসবাস করেন, যেখানে আরও কয়েকটি পরিবার রয়েছে।
লাল বলেন, ‘আমরা এ দেশে ভোট দিয়ে আসছি। অথচ জমির কাগজপত্র বা পানির বিল নেই বলে আমাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে—এটা খুবই হতাশাজনক।’
তিনি জানান, সেপ্টেম্বরে প্রথম নিজের নাম বাদ পড়ার বিষয়টি জানতে পারেন। এরপর থেকে নির্বাচন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ, শুনানিতে অংশগ্রহণ এবং একাধিকবার নাম পুনর্বহালের আবেদন করেছেন।
কিছু ভোটারকে তাদের আগের নিবন্ধন ফিরিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে নতুন ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের আবেদন করতে বলা হয়েছে। এতে তাদের মধ্যে অসন্তোষ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
দরিদ্র ভোটারদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার প্রভাব নিয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগ আরও গভীর। তাদের আশঙ্কা, ভোটার হিসেবে পরিচয় ও নিবন্ধন নিয়ে জটিলতা তৈরি হলে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।
৩৯ বছর বয়সী মামতা, যিনি নিজের পদবি ব্যবহার করেন না, বলেন, ‘স্থানীয় নির্বাচনী কর্মকর্তারা এখন আমাদের নতুন ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের আবেদন করতে বলছেন। কিন্তু আমার স্বামী এতে একেবারেই রাজি নন, কারণ তিনি গত কয়েকটি নির্বাচনেও ভোট দিয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার ভয় হচ্ছে, আমাদের নাম যদি ভোটার তালিকায় ফিরিয়ে আনা না হয়, তাহলে ভর্তুকি মূল্যে রেশন ও সরকারের অন্যান্য কল্যাণমূলক সুবিধা পাওয়া নিয়েও সমস্যা হতে পারে।’
ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রমকে ঘিরে চলমান বিতর্কে এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—ভুলবশত বাদ পড়া ভোটারদের অধিকার কত দ্রুত পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে সাধারণ মানুষকে আর কতটা ভোগান্তি পোহাতে হবে।
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
