প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে নতুন তালিকাভুক্ত কম্পানির শেয়ারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বরাদ্দের ৫০ শতাংশ প্রথম দিনেই বিক্রির সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। আইপিও বিধিমালার খসড়ায় এই শেয়ারের ওপর বিদ্যমান ৯০ দিনের লক-ইন তুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
প্রস্তাবটি কার্যকর হলে নতুন কম্পানির শেয়ারের লেনদেন শুরুর দিনেই প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বরাদ্দের অর্ধেক বিক্রি করতে পারবেন। নতুন শেয়ারের দাম দ্রুত বেড়ে গেলে এতে বড় মুনাফার সুযোগ তৈরি হবে। তবে লক-ইন শিথিল করায় শেয়ারের দামে কারসাজি এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
বিশেষ করে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা শেয়ারের দর নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তাদের একাংশ বরাদ্দ পাওয়া শেয়ারের অর্ধেক দ্রুত বিক্রি করে দিলে এর প্রভাব পড়তে পারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ওপর।
বর্তমান নিয়মে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বরাদ্দ পাওয়া শেয়ারের ৫০ শতাংশ বিক্রি করতে ৯০ দিন অপেক্ষা করতে হয়। পরবর্তী ২৫ শতাংশ শেয়ারে লক-ইন ১২০ দিন এবং অবশিষ্ট ২৫ শতাংশে ১৮০ দিন। ২০২৫ সালের বিধিমালা অনুযায়ী এই ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে।
নতুন খসড়ায় প্রথম ৫০ শতাংশ শেয়ারের লক-ইন পুরোপুরি তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। বাকি শেয়ারের ক্ষেত্রে লক-ইনের মেয়াদও কমানো হচ্ছে। পরবর্তী ২৫ শতাংশ শেয়ারে ৬০ দিন এবং শেষ ২৫ শতাংশে ৯০ দিনের লক-ইন রাখার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রস্তাব কার্যকর হলে বরাদ্দ পাওয়া শেয়ারের অর্ধেক বিক্রির ক্ষেত্রে কোনো অপেক্ষার সময় থাকবে না, আর বাকি অর্ধেক বিক্রির জন্য আগের তুলনায় কম সময় অপেক্ষা করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ও শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ ড. মাহমুদ ওসমান ইমাম মনে করেন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বরাদ্দ পাওয়া শেয়ারে লক-ইন থাকা প্রয়োজন।
তার মতে, বিশ্বের উন্নত শেয়ারবাজারেও বিভিন্ন মেয়াদে এ ধরনের বিধি-নিষেধ রয়েছে। বাংলাদেশের বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্ষমতা বিবেচনায় লক-ইনের মেয়াদ কমানো যেতে পারে, তবে বরাদ্দ পাওয়া শেয়ারের ৫০ শতাংশ পুরোপুরি লক-ইনের বাইরে রাখা ঠিক হবে না।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, লক-ইন তুলে দেওয়া হলে শেয়ারের দাম নিয়ে কারসাজির সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বেন। অতীতেও লক-ইন না থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
লক-ইন ব্যবস্থার পাশাপাশি নতুন তালিকাভুক্ত কম্পানির শেয়ারের প্রথম দিনের লেনদেনে সার্কিট ব্রেকার কার্যকর থাকবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের ট্রেডিং বিধিমালায় একসময় তালিকাভুক্তির পর প্রথম দুই দিন শেয়ারের দামের ওপর কোনো মূল্যসীমা ছিল না। তবে ২০২১ সালের ১৭ জুন বিএসইসির নির্দেশনার পর নতুন তালিকাভুক্ত কম্পানির শেয়ারের ক্ষেত্রেও সার্কিট ব্রেকার কার্যকর হয়। এর ফলে আগের দিনের দরের তুলনায় শেয়ারের দাম সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ ওঠানামার সুযোগ রাখা হয়।
নতুন খসড়া বিধিমালায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর ওপর ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে নতুন কম্পানির শেয়ারের লেনদেনে মূল্যসীমা কিভাবে কার্যকর হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
শেয়ারবাজারে নতুন তালিকাভুক্ত কম্পানির শেয়ার প্রথম দিনেই ইস্যু মূল্যের দুই-তিন গুণ দামে লেনদেন হওয়ার নজির রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রথম দিনের মূল্যসীমা না থাকলে এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা একই দিন বরাদ্দ পাওয়া শেয়ারের অর্ধেক বিক্রি করতে পারলে বড় অঙ্কের মুনাফা তুলে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে শেয়ারের প্রকৃত সরবরাহ, বিনিয়োগকারীদের চাহিদা ও লেনদেনের পরিস্থিতির ওপর দামের গতিপথ নির্ভর করবে।
লক-ইন ব্যবস্থার পরিবর্তনের পাশাপাশি বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য শেয়ার বরাদ্দের কোটা কমানোর প্রস্তাবও রয়েছে খসড়ায়। বিদ্যমান ৪০ শতাংশ কোটা কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে। তবে ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য আগের মতো ১০ শতাংশ কোটা বহাল রাখার প্রস্তাব রয়েছে। উভয় পদ্ধতিতেই মিউচুয়াল ফান্ডের জন্য ১০ শতাংশ শেয়ার বরাদ্দের ব্যবস্থা অপরিবর্তিত রাখার কথা বলা হয়েছে।
বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বিডের মাধ্যমে শেয়ারের দর নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। এ কারণে তাঁদের বরাদ্দ, শেয়ার বিক্রির সময়সীমা এবং লেনদেনে মূল্যসীমার মতো বিষয়গুলো আইপিও বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্তাবিত বিধিমালা কার্যকর হলে একদিকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অর্থ দ্রুত পুনর্বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে, অন্যদিকে নতুন তালিকাভুক্ত কম্পানির শেয়ারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করবে চূড়ান্ত বিধিমালা ও বাজার তদারকির কার্যকারিতার ওপর।
