কালবেলা · সাধারণ
পরিকল্পনার অভাবে সুন্দরবনের পর্যটন শিল্পে ক্ষতির আশঙ্কা
১৪/১০/২০২৬

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার বাংলাদেশের পর্যটন খাতে রয়েছে অপার সম্ভাবনা। দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পশ্চিমের ম্যানগ্রোভ বন, ভ্রমণপিপাসুদের জন্য হয়ে উঠেছে আগ্রহের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সম্মুখীন হতে হচ্ছে নানারকম প্রতিকূলতার। পরিবেশ অধিদপ্তর ও বনবিভাগসহ পর্যটন শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবে বারবার হোঁচট খাচ্ছে সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন শিল্প ইকো-রিসোর্ট।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতা, সঠিক পরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়নের অভাবসহ আরও নানা কারণে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছে না খুলনার দাকোপ উপজেলার সুন্দরবন-সংলগ্ন নদী তীরবর্তী লোকালয়ের পাশেই গড়ে ওঠা পরিবেশবান্ধব আবাসন ও পর্যটন শিল্প। পরিবেশ অধিদপ্তর সাম্প্রতিক ওই অঞ্চলের প্রায় ১৭ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ১৫টি রিসোর্ট বন্ধের নির্দেশ দেয়। এতে পর্যটন খাতে ক্ষতির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইকো-রিসোর্ট স্বত্বাধিকারীদের দাবি, স্থানীয় জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এসব রিসোর্টগুলো। রিসোর্টগুলো বন্ধ না করে সঠিক পরিচালনা, মান নিয়ন্ত্রণ, যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত পর্যটন নীতি প্রয়োজন বলে জানান মালিকেরা।
জীববৈচিত্র্যের প্রাচুর্যের কারণে সুন্দরবন পৃথিবীর অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্র থেকে স্বতন্ত্র। সুন্দরবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রয়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের নাম। এছাড়াও রয়েছে নানা ধরনের পাখি, চিত্রাহরিণ, কুমির, ডলফিনসহ অসংখ্য প্রজাতির প্রাণি। তাই দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য একই সঙ্গে বিনোদন ও গবেষণার স্থান হয়ে উঠতে পারে সুন্দরবন।
পরিবেশবিদরা বলছেন, পর্যটন খাতকে যদি সুন্দর করে নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনা করা যায় তাহলে এটা একটা বিরাট সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত হবে। সুন্দরবনের পরিবেশ অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে পর্যটন সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগ প্রয়োজন। কিন্তু যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে ব্যাহত হচ্ছে পর্যটনকেন্দ্রিক অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়ন।
ইরাবতী ইকো-রিসোর্ট অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের ব্যবস্থাপক পলাশ মণ্ডল বলেন, আমরা সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। জীবন-জীবিকার তাড়নায় বৈধ অবৈধভাবে সুন্দরবনের সম্পদ আহরণ করতে হতো। কিন্তু এখন গ্রামে ইকো রিসোর্ট গড়ে ওঠায় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন আর আমাদের সুন্দরবনের সম্পদ ধ্বংস করতে হয় না। এসব রিসোর্ট ঘিরে গ্রামের পরিবেশও পরিবর্তিত হচ্ছে। মানুষ তাদের জীবন-জীবিকা ও সার্বিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে।
স্থানীয় অত্যন্ত ২০ জন লোকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২১ সাল থেকে উপজেলার কৈলাশগঞ্জ ও বাণীশান্তা ইউনিয়নের তিনটি গ্রামে সুন্দরবনের বাইরে সম্পূর্ণ ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে গড়ে উঠেছে এসব ইকো-রিসোর্ট। এখানে ব্যবস্থাপক থেকে শুরু করে অন্য সব স্টাফ গ্রাম থেকেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি রিসোর্টে কমপক্ষে ৮ থেকে সর্বোচ্চ ২০ জন পর্যন্ত জনবল রয়েছে। বর্তমানে এই এলাকার প্রায় দুই সহস্রাধিক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া গ্রামের শিশুদের হাতে খঁড়ির জন্য ইকো-রিসোর্ট উদ্যোক্তারা ছোট ছোট পাঠশালা গড়ে তুলেছেন। এমনকি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল গঠন করে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও পরিচালনা করা হচ্ছে।
রিসোর্ট ওনার অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের (রোয়াস) সভাপতি ইমন ইসলাম কালবেলাকে বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তর রিসোর্টগুলো বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে এমন কোনো অফিসিয়াল চিঠি আমাদের কাছে সরাসরি আসেনি। তবে বিভিন্ন মাধ্যমে এ ব্যাপারে জেনেছি, এখন আইনগতভাবে বিষয়টি সামনে নিয়ে রিসোর্ট পরিচালনা করব। ইকো রিসোর্টে একদিকে যেমন দেশি-বিদেশি পর্যটকরা অবস্থান করে খুব কাছ থেকেই সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগ করতে পারেন, অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা বিভিন্নভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, পর্যটকদের খাবারের জন্য গ্রাম থেকেই বাজার করা হয়। সুন্দরবনে যাতায়াতের জন্য গ্রামের নৌকা এবং মাঝি, সড়কে যাতায়াতের জন্য যানবাহন গ্রামের লোকেরাই সরবরাহ করে থাকে। এসবের মূল উদ্দেশ্য পর্যটন শিল্পকে, বিশেষ করে সুন্দরবনকে পর্যটকদের কাছে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা। পাশাপাশি গ্রামবাসীর বিকল্প কর্মসংস্থান হওয়ায় সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীলতা কমছে।
জানতে চাইলে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্টি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক মো. ওয়াসিউল ইসলাম জানান, সুন্দরবনকেন্দ্রিক পরিবেশবান্ধব পর্যটন শিল্পের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এতে একদিকে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে। অন্যদিকে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত বিপুল জনগোষ্ঠির কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। তবে বনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং সুন্দরবন ভ্রমণের নীতিমালা কঠোরভাবে পালন করতে হবে। তা না হলে সঠিক পরিকল্পনার অভাবে সুন্দরবনের পর্যটন শিল্পের মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗