পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের রাজধানী পেশোয়ারে একটি বেসরকারি স্কুলের ছাদ ধসে অন্তত ২৮ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ২৭ জন শিক্ষার্থী ও একজন নারী শিক্ষক রয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরো ১৯ জন। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) পেশোয়ারের আফ্রিদি আবাদ এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরো কয়েকজন আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাঁদের উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।
পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনার সময় আল খায়ের স্কুলের শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে ছিল। হঠাৎ ছাদ ধসে পড়লে তাঁরা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে। পেশোয়ারের ডেপুটি কমিশনার আফাক ওয়াজির এ তথ্য জানিয়েছেন।
জরুরি উদ্ধারকারী সংস্থা রেসকিউ ১১২২-এর মুখপাত্র বিলাল আহমেদ ফয়জি জানিয়েছেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে অভিযান চলছে। উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে তাঁদের বের করে আনার চেষ্টা করছেন। আহতদের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে এর আগে জানিয়েছিলেন লেডি রিডিং হাসপাতালের একজন মুখপাত্র। দুর্ঘটনার পর হাসপাতালটিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে স্বজনদের খোঁজে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান অভিভাবক সামিউল্লাহ। তিনি জানান, সকাল ৮টা ৫০ মিনিটের দিকে বাড়ি থেকে ফোন পেয়ে প্রায় ১০ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। সেখানে আট বছরের কম বয়সি তিনটি মেয়েশিশুকে উদ্ধার করেন তিনি।
সামিউল্লাহ বলেন, তাঁদের ছয় সন্তান ওই স্কুলে পড়ে। ভবনটির অবস্থা দেখে প্রথমে তাঁর মনে হয়েছিল, ধসে পড়া অংশের নিচে থাকা শ্রেণিকক্ষে অবস্থানরত তাঁর ছেলেও হয়তো মারা গেছে। পরে জানতে পারেন, পানি খেতে শ্রেণিকক্ষ থেকে বের হওয়ায় তাঁর ছেলে দুর্ঘটনার সময় সেখানে ছিল না।
তদন্তের নির্দেশ, শোক প্রকাশ
মর্মান্তিক এ ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন খাইবার পাখতুনখোয়ার গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্দি। ছাদ ধসে পড়ার কারণ তদন্তের নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, নিষ্পাপ শিশুদের মূল্যবান জীবন হারানো অত্যন্ত বেদনাদায়ক ট্র্যাজেডি।
পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, শিশুরা দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তাদের প্রতিটি মৃত্যু পুরো জাতির জন্য ট্র্যাজেডি। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারিও গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, হৃদয়বিদারক এ ঘটনায় পুরো জাতি শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ছাদ ধসের কারণ নির্ধারণে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের পাশাপাশি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নিরাপত্তার মানদণ্ড মেনে নির্মিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
পাকিস্তানে ভবনধসের একের পর এক ঘটনা
পাকিস্তানে ভবন ও ছাদ ধসে প্রাণহানির ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহারকে এ ধরনের দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে ডন।
গত জুলাইয়ে উমরকোটের কাছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাইরের দেয়ালের একাংশ ধসে তিন থেকে ১৩ বছর বয়সি তিন মেয়েশিশু নিহত হয়। একই মাসে লাহোরের বাগবানপুরা এলাকায় নির্মাণাধীন একটি বেসরকারি স্কুল ভবনের ছাদ ধসে এক শিশু নিহত এবং অন্তত পাঁচজন আহত হয়।
এর আগে জুনে লাহোরের কাহনা এলাকায় একটি বেসরকারি কোচিং সেন্টারের ছাদ ধসে ১৪ শিশু নিহত হয়। এর দুই মাসেরও কম সময় আগে ডেরা গাজি খানের একটি বেসরকারি স্কুলের শ্রেণিকক্ষের ছাদ ধসে চার শিশু নিহত এবং ২০ জন আহত হয়েছিল।
গত সপ্তাহে পাকপত্তনে ভারি বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার সময় একটি বাড়ির ছাদ ধসে দুই ব্যক্তি নিহত হন। এ ছাড়া জুন ও আগস্টে ছাদ ধসের বিভিন্ন ঘটনায় অন্তত পাঁচজনের মৃত্যুর তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পেশোয়ারের স্কুলে প্রাণহানির এ ঘটনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা তদারকির গুরুত্ব আবারো সামনে এনেছে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে এমন প্রাণহানি ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
সানা/আপ্র/১৫/১০/২০২৬
