প্রচলিত বাজারের বাইরে রপ্তানির নতুন গন্তব্য খুঁজছে বাংলাদেশ। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে দক্ষিণ আমেরিকায় বাণিজ্য সম্প্রসারণে জোর দেওয়া হচ্ছে। এ অঞ্চলের ১১টি দেশে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ থেকে পণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ১৯ কোটি ৫১ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার। তবে এ বাজারেও তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরতা বেশি। মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ এসেছে ওভেন ও নিট পোশাক থেকে। ফলে নতুন বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং পোশাকের বাইরের খাতগুলোকে শক্তিশালী করার
ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দক্ষিণ আমেরিকায় বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি গন্তব্য ব্রাজিল ও চিলি। দেশ দুটিতে আলোচ্য তিন মাসে মোট ১২ কোটি ২৬ লাখ ৯০ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এ আয় দক্ষিণ আমেরিকার ১১টি দেশে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৬২ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ, এ অঞ্চলের বাজার সম্প্রসারণে ব্রাজিল ও চিলির গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।
একক দেশ হিসেবে সর্বোচ্চ ৭ কোটি ৮ লাখ ২০ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে ব্রাজিলে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চিলিতে রপ্তানি হয়েছে ৫ কোটি ১৮ লাখ ৭০ হাজার ডলারের পণ্য। তৃতীয় অবস্থানে থাকা পেরুতে রপ্তানি আয় ২ কোটি ৪২ লাখ ৪০ হাজার ডলার। এ ছাড়া কলম্বিয়ায় ১ কোটি ৮০ লাখ ৫০ হাজার, উরুগুয়েতে ১ কোটি ১৬ লাখ ৩০ হাজার এবং আর্জেন্টিনায় ১ কোটি ২ লাখ ৮০ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছেন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা।
অঞ্চলটির অন্য দেশগুলোতেও বাংলাদেশের পণ্যের বাজার রয়েছে। তবে রপ্তানি আয়ের বড় অংশ কয়েকটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এ অবস্থায় বিদ্যমান বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন ক্রেতা তৈরি ও দেশভিত্তিক চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পোশাকেই প্রায় ৮০ শতাংশ আয়
দক্ষিণ আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনও মূলত তৈরি পোশাকনির্ভর। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ওভেন পোশাক ও পোশাকের আনুষঙ্গিক পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৮ কোটি ৪৫ লাখ ৩০ হাজার ডলার। একই সময়ে নিট পোশাক রপ্তানি থেকে এসেছে ৭ কোটি ১০ লাখ ডলার। এ দুই উপখাত মিলিয়ে আয় দাঁড়িয়েছে ১৫ কোটি ৪৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার। দক্ষিণ আমেরিকায় বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৭৯ দশমিক ২ শতাংশ এসেছে এ দুটি খাত থেকে।
পোশাকের বাইরে রপ্তানি আয়ের তালিকায় রয়েছে ওষুধ, জুতা, টেক্সটাইল, চামড়াজাত পণ্য ও ট্রাভেল ব্যাগ। আলোচ্য সময়ে ওষুধ রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৬৫ লাখ ৮০ হাজার ডলার। জুতা ও সংশ্লিষ্ট পণ্য রপ্তানি করে এসেছে ৫৭ লাখ ১০ হাজার ডলার। তবে মোট রপ্তানিতে এসব পণ্যের অবদান এখনো তুলনামূলকভাবে কম।
রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনার ক্ষেত্রে পাটজাত পণ্য, চামড়ার সামগ্রী, গৃহসজ্জার উপকরণ এবং নকশিকাঁথাসহ ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পকে সম্ভাবনাময় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এসব পণ্যের নকশা, গুণগত মান ও বৈশিষ্ট্য দক্ষিণ আমেরিকার ক্রেতাদের কাছে তুলে ধরতে পারলে নতুন বাজার তৈরির সুযোগ রয়েছে। তবে এ জন্য স্থানীয় ভোক্তাদের পছন্দ, পণ্যের দাম, আমদানি নীতি ও বাজারজাতকরণের কৌশল সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা প্রয়োজন।
দক্ষিণ আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের পরিচিতি বাড়াতে আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে ইপিবি। এর অংশ হিসেবে গত ১১ থেকে ১৩ আগস্ট ব্রাজিলের সাও পাওলোতে অনুষ্ঠিত ‘হোম শো ব্রাজিল ২০২৬’ আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশ নেয় বাংলাদেশ। ইপিবির অর্থায়নে এবং ব্রাসিলিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের ব্যবস্থাপনায় দেশি চারটি প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নেয়।
প্রদর্শনীতে প্রতিষ্ঠানগুলো পাট, চামড়া, বাঁশ ও মাটির তৈরি বিভিন্ন নান্দনিক পণ্য তুলে ধরে। এর মাধ্যমে ব্রাজিলের ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পণ্য পরিচিত করার পাশাপাশি নতুন ব্যবসায়িক যোগাযোগ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়। পোশাকের বাইরে অন্যান্য পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে এ ধরনের প্রদর্শনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আন্তর্জাতিক মেলায় অংশগ্রহণই নতুন বাজার সম্প্রসারণের জন্য যথেষ্ট নয়। সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, পণ্যের নমুনা সরবরাহ, মান ও দামের প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তোলাও জরুরি। একই সঙ্গে বাজারভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে কোন দেশে কোন পণ্যের চাহিদা বেশি, তা চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, অল্প কয়েকটি বাজার ও একক পণ্যের ওপর অতি-নির্ভরতা যেকোনো বৈশ্বিক সংকটে রপ্তানি আয়কে ঝুঁকিতে ফেলে। এ কারণে নতুন বাজার ও বৈচিত্র্যময় পণ্য তুলে ধরা এখন অত্যন্ত জরুরি। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মেলায় অংশগ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট দেশের বাজারের চাহিদা, পণ্যের দাম ও ভোক্তাদের পছন্দ নিয়ে আগাম গবেষণা প্রয়োজন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগ রক্ষার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
