বুধবার (১৪ অক্টোবর ২০২৬) চট্টগ্রামের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৭-এর বিচারক মো. সাখাওয়াত হোসেন গ্রেপ্তার হাছিনা বেগমকে কাস্টডি ওয়ারেন্টের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এর আগে মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সীতাকুণ্ড মডেল থানার দুই তদন্ত কর্মকর্তার পৃথক তদন্তের অংশ হিসেবে পরিচালিত অভিযানে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পৈতৃক সম্পত্তির নামজারি নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগ, মামলার নথি ও এজাহার সূত্রে জানা যায়, সীতাকুণ্ড পৌরসভার দক্ষিণ-পশ্চিম শিবপুর এলাকার বাসিন্দা মরহুম মো. খায়ের উল্লাহর দুই মেয়ে—জ্যেষ্ঠ কন্যা হাছিনা বানু এবং কনিষ্ঠ কন্যা মোছা. হাছিনা বেগম প্রকাশ কালনী। অভিযোগ অনুযায়ী, পৈতৃক সম্পত্তিতে উভয়ের প্রাপ্য হিস্যা থাকা সত্ত্বেও একক নামজারির মাধ্যমে জ্যেষ্ঠ কন্যাকে তাঁর প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করা হয়।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, হাছিনা বেগম তাঁর স্বামী দেলোয়ার হোসেন ও অজ্ঞাতনামা সাইবার অপরাধীদের সহায়তায় সীতাকুণ্ড পৌরসভার সরকারি ডাটাবেজ পোর্টাল https://sitakunda.prottoyon.net-এর এর আদলে একটি নকল ওয়েবসাইট তৈরি করেন। ওই নকল ওয়েবসাইট ব্যবহার করে কিউআর কোডযুক্ত জাল ওয়ারিশ সনদ প্রস্তুত করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। সনদটির নম্বর ১০৪৪৪৬ এবং তারিখ ১২ এপ্রিল ২০২৬।
অভিযোগ অনুযায়ী, জাল সনদে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম এবং সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার স্ক্যান করা সিল ও স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়।
৫৭.৪৫ শতক জমির একক নামজারির অভিযোগ, মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, জাল ওয়ারিশ সনদটি সীতাকুণ্ড সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে দাখিল করে শিবপুর মৌজার আরএস/বিএস দাগভুক্ত মোট ০.৫৭৪৫ একর বা ৫৭.৪৫ শতক পৈতৃক সম্পত্তির একক নামজারি খতিয়ান তৈরি করা হয়। খতিয়ানটির নম্বর ২০২৬-১০০০৩৩। এর মাধ্যমে বাদীপক্ষের মায়ের প্রাপ্য সম্পত্তির অংশ আত্মসাতের চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ আনা হয়েছে।
বিষয়টি জানার পর পৌর প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। পৌরসভার নিজস্ব তদন্তে সনদটি সরকারি ব্যবস্থার মাধ্যমে তৈরি হয়নি এবং নকল ওয়েবসাইট ব্যবহার করে জাল নথি প্রস্তুত করা হয়েছে বলে উঠে আসে। পরে সীতাকুণ্ড পৌরসভা স্মারক নম্বর সীঃপৌঃ/২০২৬/১৭৮, তারিখ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মাধ্যমে সনদটি অবৈধ ঘোষণা করে বাতিল করে।
এ ঘটনায় এর আগে ‘দৈনিক আমার দেশ’, ‘দৈনিক সমকাল’, ‘দৈনিক মানবজমিন’, ‘দৈনিক সাঙ্গু’, ‘দৈনিক কর্ণফুলী’ ও ‘দৈনিক চট্টগ্রাম মঞ্চ’সহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পৃথক দুই আদালতের নির্দেশে মামলা, সংক্ষুব্ধ হাছিনা বানুর পক্ষে তাঁর ছেলে অ্যাডভোকেট মো. আলী আজম গত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ চট্টগ্রামের পৃথক দুই আদালতে নালিশি আবেদন করেন।
সাইবার পিটিশন মামলা নম্বর ৫২৬/২০২৬-এ চট্টগ্রামের সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও জেলা ও দায়রা জজ কাজী মিজানুর রহমান অভিযোগকারীর জবানবন্দি গ্রহণ এবং নথিপত্র পর্যালোচনা করেন। পরে অভিযোগটি এজাহার হিসেবে গণ্য করে সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ১৮(১)(খ)(গ), ১৯(১)(গ), ২১(১), ২২(১) ও ২৭(১) ধারায় নিয়মিত মামলা রুজুর নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ২৫ নভেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের আদেশ দেওয়া হয়। ট্রাইব্যুনালের স্মারক নম্বর ১৫১২/২৬-এর ভিত্তিতে ২৮ সেপ্টেম্বর সীতাকুণ্ড মডেল থানায় ৫৬ নম্বর মামলা রেকর্ড করা হয়।
একই দিনে সীতাকুণ্ড থানার আমলী আদালত-৭-এ দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারায় সি.আর. মামলা নম্বর ৮০৭/২০২৬ দায়ের করা হয়। সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাখাওয়াত হোসেন নালিশি দরখাস্তটি এজাহার হিসেবে গণ্য করে নিয়মিত মামলা রুজুর নির্দেশ দেন। আদালতের স্মারক নম্বর ১১৯৪-এর ভিত্তিতে ১ অক্টোবর সীতাকুণ্ড মডেল থানায় ৫ নম্বর মামলা রুজু হয়।
সাইবার সুরক্ষা আইনের ৫৬ নম্বর মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় সীতাকুণ্ড মডেল থানার এসআই মো. মাহমুদুল হাসানকে। অন্যদিকে দণ্ডবিধির ৫ নম্বর মামলার তদন্তের দায়িত্ব পান এসআই মো. কামরুজ্জামান। অভিযানে গ্রেপ্তার, কারাগারে প্রধান আসামি, মামলাসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দুই তদন্ত কর্মকর্তার তৎপরতায় তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সীতাকুণ্ডের শিবপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রধান আসামি হাছিনা বেগম প্রকাশ কালনীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন বুধবার তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে বিচারক মো. সাখাওয়াত হোসেন তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
তবে মামলার অপর এজাহারনামীয় আসামি দেলোয়ার হোসেন এবং নকল ওয়েবসাইট তৈরির সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের এখনো গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
নেপথ্যের সাইবার চক্র শনাক্তের দাবি, মামলার বাদী অ্যাডভোকেট মো. আলী আজম বলেন, “সরকারি ওয়েবসাইট ক্লোন করে এবং সরকারি কর্মকর্তাদের সিল-স্বাক্ষর জাল করে ওয়ারিশ সনদ তৈরির অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। ওই সনদ ব্যবহার করে পৈতৃক সম্পত্তির নামজারি নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগও রয়েছে। প্রধান আসামি হাছিনা বেগম গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যাওয়ায় আমরা আইনের প্রতি আস্থাশীল হয়েছি। তবে তাঁর স্বামী দেলোয়ার হোসেনসহ নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদেরও দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।”
বাদীপক্ষের আইনজীবী ও চট্টগ্রাম জেলা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (অতিরিক্ত পিপি) অ্যাডভোকেট মো. সরওয়ার হোসাইন লাভলু বলেন, সরকারি ওয়েবসাইটের আদলে নকল পোর্টাল তৈরি করে কর্মকর্তাদের সিল-স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগ রাষ্ট্রীয় ও স্থানীয় সরকারি ডিজিটাল সেবার নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক। পৃথক দুই আদালতের নির্দেশে দুটি মামলা হয়েছে এবং প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তারের পর আদালত কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, তদন্তের মাধ্যমে নকল ওয়েবসাইটটি কে তৈরি করেছে, কারা প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছে এবং জাল সনদ প্রস্তুত ও জমির নামজারির সঙ্গে আর কারা জড়িত, তা বের করা জরুরি। ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণ ও আইনানুগ তদন্তের মাধ্যমে পলাতক আসামি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
পুলিশ জানিয়েছে, মামলার অপর আসামি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে নকল ওয়েবসাইট তৈরির উৎস, জাল সনদ প্রস্তুতের প্রক্রিয়া এবং বিতর্কিত নামজারির সঙ্গে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে।
সরকারি পোর্টাল ক্লোন করে জাল নথি তৈরির অভিযোগ এবং পৈতৃক সম্পত্তির নামজারি নিয়ে বিরোধের নিষ্পত্তি এখন তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা আদালতে প্রমাণিত হওয়ার পরই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় নির্ধারিত হবে।
The post সীতাকুণ্ডে সরকারি ওয়েবসাইট ক্লোন করে জমি জালিয়াতির অভিযোগ, দুই মামলায় প্রধান আসামি কারাগারে appeared first on ভোরের চেতনা.
