ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজের ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে কঠিন সমীকরণের সামনে বাংলাদেশ। প্রথম ম্যাচে জিম্বাবুয়ের কাছে ৯৯ রানের বড় ব্যবধানে হারের পর বুধবার আফগানিস্তানের বিপক্ষে শুধু জিতলেই হবে না, ফাইনালে জায়গা করে নিতে হলে জিততে হবে বড় ব্যবধানে। অন্যদিকে, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১৫৮ রানের বিশাল জয় নিয়ে আসা আফগানিস্তান রয়েছে আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে।
শারজায় বুধবার সিরিজের শেষ রাউন্ড রবিন ম্যাচে মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান। এই ম্যাচের ফলের ওপর নির্ভর করছে ফাইনালে ওঠার সমীকরণ। আফগানিস্তানকে হারানোর পাশাপাশি বাংলাদেশকে রানরেটের হিসাবেও এগিয়ে থাকতে হবে।
বিজ্ঞাপন
প্রথমে ব্যাট করলে প্রায় ৪০ রানের ব্যবধানে জয়ের প্রয়োজন হতে পারে। আর পরে ব্যাটিং করলে প্রতিপক্ষের লক্ষ্য নির্ধারিত ওভারের চেয়ে কম সময়ে তাড়া করতে হবে। বাংলাদেশকে আটকে দিতে পারলে ফাইনালের আশা নিয়ে অপেক্ষায় থাকবে জিম্বাবুয়ে।
আফগানিস্তান ছন্দে, চাপে বাংলাদেশ
বিজ্ঞাপন
এখন পর্যন্ত সিরিজে দুই দলের পারফরম্যান্সে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা গেছে। প্রথম ম্যাচে জিম্বাবুয়ের কাছে বড় ব্যবধানে হেরেছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে, সোমবার একই প্রতিপক্ষকে ১৫৮ রানে উড়িয়ে দিয়ে নিজেদের শক্তিমত্তার প্রমাণ দিয়েছে আফগানিস্তান।
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আফগানিস্তানের জয়ে ব্যাটিং ও বোলিং- দুই বিভাগেই অবদান ছিল। সেদিক থেকে দলটিকে বেশ ভারসাম্যপূর্ণ মনে হচ্ছে। বিপরীতে, বাংলাদেশের ব্যাটিং ও বোলিং- দুই বিভাগেই দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে।
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম তিনটি উইকেট নেওয়ার পর আর সময়মতো সাফল্য পায়নি বাংলাদেশের বোলাররা। প্রতিপক্ষের ব্যাটাররা বড় সংগ্রহ গড়ে তোলার সুযোগ পান। পরে ব্যাটিংয়ে ভালো শুরুর সুবিধাও কাজে লাগাতে পারেননি বাংলাদেশের ব্যাটাররা।
বিজ্ঞাপন
দলের এমন পারফরম্যান্স নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পেসার তাসকিন আহমেদ ও প্রধান কোচ ফিল সিমন্স। তাসকিনের মতে, ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে খেলার ঘাটতি ছিল দলের মধ্যে। সিমন্সও বলেছেন, পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলার ক্ষেত্রে খেলোয়াড়দের বোঝাপড়ার অভাব ছিল।
সিনিয়র খেলোয়াড় ও কোচের এমন মন্তব্যে বাংলাদেশের ওয়ানডে পারফরম্যান্স নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ভালো খেলা এখন দলের প্রত্যাশা। তবে একটি ম্যাচে ভালো করলেই যে সব দুর্বলতা দূর হবে, তা নয়।
বিজ্ঞাপন
আতাল-ইব্রাহিমের ব্যাটে আফগানিস্তানের দাপট
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আফগানিস্তানের বড় জয়ের ভিত গড়ে দেন সেদিকুল্লাহ আতাল ও ইব্রাহিম জাদরান। আতাল তুলে নেন নিজের তৃতীয় ওয়ানডে সেঞ্চুরি। অন্যদিকে, ইব্রাহিম জাদরান আবারও নব্বইয়ের ঘরে আউট হন। তুলনামূলক ছোট আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে এ নিয়ে চতুর্থবার নব্বইয়ের ঘরে থামলেন তিনি।
জাদরানের ব্যাটিংয়ের সৌন্দর্য ও সীমাবদ্ধতা- দুই দিকই উঠে এসেছে তার সাম্প্রতিক ইনিংসে। তবে ধারাবাহিক রান পাওয়ার কারণে বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচেও তাঁকে বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
শারজায় এখন পর্যন্ত জাদরানের ওয়ানডে স্কোর ৬০ ও ২২। আগের ম্যাচে তার ব্যাটিংয়ের ছন্দ ও শট খেলার ধরন দেখে আরও বড় ইনিংসের সম্ভাবনা দেখছে আফগানিস্তান। এবার নব্বইয়ের ঘর পেরিয়ে সেঞ্চুরিতে পৌঁছানোই হবে তার লক্ষ্য।
জাদরান শুরুটা ভালো করলে আফগানিস্তান বড় সংগ্রহ গড়ার সুযোগ পাবে। তাই তাকে দ্রুত ফিরিয়ে দেওয়াই বাংলাদেশের বোলারদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
জাদরানকে থামানোর দায়িত্ব শরীফুলের কাঁধে
বিজ্ঞাপন
আফগানিস্তানের ওপেনার ইব্রাহিম জাদরানকে থামানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো রেকর্ড শরিফুল ইসলামের। সব সংস্করণ মিলিয়ে ৫৫ বলের মধ্যে ছয়বার জাদরানকে আউট করেছেন তিনি। এর মধ্যে ওয়ানডেতে দুইবার।
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আগের ম্যাচেও ভালো করেছেন শরীফুল। ৪৭ রান দিয়ে নিয়েছেন ২ উইকেট। এর আগে ম্যাকেতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টে সাত উইকেট নেওয়ার কৃতিত্বও রয়েছে তার।
বিজ্ঞাপন
ডানহাতি ব্যাটারের দিকে বল ভেতরে ঢোকানোর দক্ষতা শরীফুলের বোলিংকে কার্যকর করে তুলেছে। ফলে জাদরানের মতো ব্যাটারদেরও অনিশ্চয়তায় রাখতে পারেন তিনি। আফগানিস্তানের ব্যাটিংয়ের ভিত নড়বড়ে করতে শরীফুলের নতুন বলের স্পেল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে জাদরানকে আউট করাই যথেষ্ট নয়। আফগানিস্তানের অন্য ব্যাটারদেরও দ্রুত ফিরিয়ে দিতে হবে বাংলাদেশকে। তা না হলে বড় সংগ্রহের পথে এগিয়ে যেতে পারে আফগানরা।
বাংলাদেশের জন্য বড় হুমকি রশিদ খান
আফগানিস্তানের বোলিং আক্রমণের সবচেয়ে বড় অস্ত্র রশিদ খান। বাংলাদেশের বিপক্ষে তার রেকর্ডও বেশ সমৃদ্ধ। গত বছর আবুধাবিতে দুই দলের দ্বিপক্ষীয় সিরিজে বাংলাদেশের ব্যাটারদের বিপাকে ফেলেছিলেন এই লেগ স্পিনার। সেই সিরিজে পাঁচ উইকেটসহ মোট ১১ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি।
বাংলাদেশের বিপক্ষে এখন পর্যন্ত রশিদের উইকেটসংখ্যা ৩৫, গড় ১৯.২২। মাঝের ওভারগুলোতে তার উইকেট নেওয়ার সামর্থ্য বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের জন্য বড় পরীক্ষা হতে পারে।
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেও নিজের পরিচিত ভূমিকায় দেখা গেছে রশিদকে। মাঝের ওভারগুলোতে প্রতিপক্ষের ব্যাটিং লাইনআপে ধস নামিয়ে চার উইকেট নেন তিনি। তার সঙ্গে ফজলহক ফারুকি ও এএম গজনফরও ভালো বোলিং করেছেন। ফলে আফগানিস্তানের বোলিং আক্রমণকে সামলাতে বাংলাদেশকে ব্যাটিংয়ে অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হবে।
পরিস্থিতি বুঝে খেলার ঘাটতি দেখছেন সিমন্স
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হারের পর বাংলাদেশের প্রধান কোচ ফিল সিমন্স দলের ভুলগুলো তুলে ধরেছেন। তার মতে, শুরুতে তিনটি উইকেট নেওয়ার পর দ্রুত আরও উইকেট তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা উচিত ছিল। একই সঙ্গে ব্যাটিংয়ে ভালো শুরুর পর পুরো ৫০ ওভার খেলার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেনি দল।
সিমন্স বলেন, ‘পরিস্থিতি বুঝতে আমাদের ঘাটতি ছিল। তিনটি উইকেট নেওয়ার পর চাপ বাড়িয়ে দ্রুত আরেকটি উইকেট নেওয়ার চেষ্টা করা উচিত ছিল। যদিও তারা খুব ভালো ব্যাটিং করেছে। এরপর আমরা যখন ব্যাটিং করেছি, তখনও পরিস্থিতি বোঝার ঘাটতি ছিল। এত ভালো শুরুর পর আমাদের শুধু নিশ্চিত করতে হতো, যেন পুরো ৫০ ওভার ব্যাটিং করতে পারি। তাহলেই আমরা ম্যাচটি জিততে পারতাম।’
কোচের এই বক্তব্যে স্পষ্ট, শুধু দক্ষতার অভাব নয়, ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা দেখছেন তিনি। আফগানিস্তানের বিপক্ষে এই ভুলগুলো কাটিয়ে উঠতে না পারলে বড় ব্যবধানে জয় পাওয়া কঠিন হবে।
একাদশে পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম আফগানিস্তানের
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দাপুটে জয়ের পর আফগানিস্তানের একাদশে বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। তবে পেসারদের বিশ্রাম দেওয়ার কথা ভাবলে পরিবর্তন আসতে পারে।
আফগানিস্তানের সম্ভাব্য একাদশ: রহমানউল্লাহ গুরবাজ (উইকেটকিপার), ইব্রাহিম জাদরান, সেদিকুল্লাহ আতাল, রহমত শাহ (অধিনায়ক), হাশমতউল্লাহ শহিদি, আজমতউল্লাহ ওমরজাই, মোহাম্মদ নবী, রশিদ খান, এএম গজনফর, জিয়া উর রহমান ও ফজলহক ফারুকি।
বাংলাদেশের একাদশ নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে। মেহেদী হাসান মিরাজ ভাইরাল জ্বর থেকে সেরে না উঠলে দল সাজানো কঠিন হতে পারে।
বাংলাদেশের সম্ভাব্য একাদশ: তানজিদ হাসান, সৌম্য সরকার, নাজমুল হোসেন শান্ত, সাইফ হাসান, তাওহিদ হৃদয় (অধিনায়ক), মোসাদ্দেক হোসেন, নুরুল হাসান (উইকেটকিপার), রিশাদ হোসেন, তাসকিন আহমেদ, শরীফুল ইসলাম ও মুস্তাফিজুর রহমান।
শারজার পিচে আগে ব্যাটিংয়ের সুবিধা
শারজায় টসজয়ী দল আগে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। দিন-রাতের ওয়ানডেতে দ্বিতীয়ার্ধে গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে পিচে কিছুটা গ্রিপ তৈরি হতে পারে। ফলে আগে ব্যাটিং করে বড় সংগ্রহ গড়ে তোলা সুবিধাজনক হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য তাই টসের পাশাপাশি প্রথম ইনিংসে ব্যাটিংয়ের সুযোগ পেলে সেটিকে কাজে লাগানো গুরুত্বপূর্ণ। আগে ব্যাটিং করলে প্রায় ৪০ রানের ব্যবধানে জয়ের লক্ষ্য পূরণ করতে হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর রান তাড়া করলে প্রতিপক্ষের লক্ষ্য কম ওভারে পেরিয়ে যেতে হবে।
তাসকিনের সাফল্য, জাদরানের নব্বইয়ে থামার প্রবণতা
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশের আগের ম্যাচে তাসকিন আহমেদ প্রথম পাওয়ার প্লেতে তিন উইকেট নিয়েছিলেন। তার ক্যারিয়ারে এই প্রথম পাওয়ার প্লেতে তিন উইকেট নেওয়ার ঘটনা ঘটে।
অন্যদিকে, জাদরান শেষ ম্যাচে ৯০ রান করেছেন। বাংলাদেশের বিপক্ষে গত বছর টানা দুটি ৯৫ রানের ইনিংস খেলেছিলেন তিনি। তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারে ১১টি অর্ধশতকের মধ্যে চারবার নব্বইয়ের ঘরে আউট হয়েছেন।
রশিদ খানের বাংলাদেশের বিপক্ষে ৩৫ উইকেট এবং ১৯.২২ গড়ও ম্যাচের আগে গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান। এসব তথ্য দুই দলের শক্তি ও দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আইএইচএস/
ফলো করুন
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।
