পবিত্র কোরআনের দ্বিতীয় ও সর্ববৃহৎ সূরা আল-বাকারার শেষ দুই আয়াতে রয়েছে ঈমানের ঘোষণা, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা, রহমত কামনা এবং সাহায্যের আবেদন। হাদিসে আয়াত দুটির বিশেষ মর্যাদা বর্ণিত হয়েছে। রাতে ঘুমানোর আগে এই দুই আয়াত তিলাওয়াতের ফজিলত সম্পর্কেও বলেছেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। মুসলিমদের দৈনন্দিন আমলে এই আয়াত দুটির গুরুত্ব তাই বিশেষ।
সূরা আল-বাকারা মদিনায় অবতীর্ণ হয়েছে। এতে রয়েছে তাওহিদের শিক্ষা, কুফর, শিরক ও মুনাফিকের পরিচয়, ইসলামের মৌলিক বিধিবিধান এবং উম্মতে মুহাম্মদির পরিচয়। বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপটে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। পবিত্র কোরআনের সূরাগুলোর নাম, আয়তন ও অবতরণের পটভূমিতেও রয়েছে বৈচিত্র্য। কোনো সূরা দীর্ঘ, কোনোটি মাঝারি, আবার কোনোটি ছোট। ২৮৬ আয়াত নিয়ে সূরা আল-বাকারা কোরআনের দীর্ঘতম সূরা। এতে ৬ হাজার ২২১টি শব্দ ও ২৫ হাজার ৫০০টি অক্ষর রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াতের অর্থ
সূরা বাকারার ২৮৫ ও ২৮৬ নম্বর আয়াতে বিশ্বাস, আনুগত্য, ক্ষমা প্রার্থনা ও আল্লাহর সাহায্য কামনার বিষয়গুলো উঠে এসেছে। প্রথম আয়াতে মহানবী (সা.) ও মুমিনদের আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা, কিতাব ও রাসুলদের প্রতি বিশ্বাসের কথা বলা হয়েছে। তাঁরা আল্লাহর রাসুলদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেন না। তাঁরা বলেন, আমরা শুনলাম ও আনুগত্য করলাম। হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা আপনার কাছে ক্ষমা চাই এবং আপনার কাছেই আমাদের প্রত্যাবর্তন।
পরের আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন না। মানুষ যে ভালো বা মন্দ কাজ করে, তার প্রতিফল তারই প্রাপ্য। এরপর আল্লাহর কাছে কয়েকটি প্রার্থনা করা হয়েছে। ভুলে গেলে বা ভুল করলে যেন পাকড়াও করা না হয়, পূর্ববর্তীদের মতো কঠিন দায়িত্ব যেন চাপিয়ে দেওয়া না হয় এবং অসহনীয় বোঝা যেন দেওয়া না হয়। একই সঙ্গে পাপ মোচন, ক্ষমা ও রহমত কামনা করা হয়েছে। আয়াতের শেষে আল্লাহকে অভিভাবক হিসেবে স্বীকার করে অবিশ্বাসী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাহায্য প্রার্থনা করা হয়েছে।
দুটি আয়াতের বিশেষ মর্যাদা
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, একবার জিবরাইল (আ.) মহানবী (সা.)-এর কাছে উপবিষ্ট ছিলেন। হঠাৎ তিনি আকাশের দিকে একটি শব্দ শুনতে পেয়ে মাথা তুলে বললেন, আসমানের একটি দরজা আজ খুলে দেওয়া হয়েছে, যা এর আগে কখনো খোলা হয়নি। সেই দরজা দিয়ে একজন ফেরেশতা অবতরণ করেন। তিনি বলেন, এই ফেরেশতা আজকের আগে কখনো অবতরণ করেননি।
ফেরেশতা সালাম জানিয়ে মহানবী (সা.)-কে দুটি নুরের সুসংবাদ দেন। তা হলো সূরা ফাতিহা ও সূরা বাকারার শেষাংশ। এই দুটি অংশের আগে আর কোনো নবীকে দেওয়া হয়নি বলে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। এগুলোর যে অক্ষর পাঠ করা হবে, তার প্রতিদান দেওয়া হবে। অর্থাৎ আয়াত দুটিতে থাকা প্রার্থনাগুলোর বিশেষ মর্যাদা রয়েছে।
সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াতের আমল সম্পর্কে হাদিসে আরও বর্ণনা রয়েছে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, তাঁকে সিদরাতুল মুনতাহায় নিয়ে যাওয়ার সময় তিনটি বিষয় দান করা হয়েছিল। সেগুলো হলো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত এবং তাঁর উম্মতের মধ্যে যারা আল্লাহর সঙ্গে শিরক করে না, তাদের কবিরা গুনাহ ক্ষমা হওয়ার সুসংবাদ।
হজরত আলী (রা.) বলেছেন, তাঁর মতে সামান্য বুদ্ধিবিবেচনাসম্পন্ন ব্যক্তিরও এই দুটি আয়াত পাঠ না করে ঘুমাতে যাওয়া উচিত নয়। জুবাইর ইবনে নুফাইর (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা সূরা আল-বাকারার সমাপ্তি ঘটিয়েছেন এমন দুটি আয়াত দিয়ে, যা তাঁকে আল্লাহর আরশের নিচের ভান্ডার থেকে দেওয়া হয়েছে। তাই আয়াত দুটি শেখার এবং স্ত্রীদেরও শেখানোর কথা বলেছেন তিনি। বর্ণনায় আয়াত দুটিকে আল্লাহর রহমত, তাঁর নৈকট্য লাভের উপায় এবং দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের প্রার্থনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাতে তিলাওয়াতের ফজিলত
বদরি সাহাবি হজরত আবু মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, সূরা বাকারার শেষে এমন দুটি আয়াত রয়েছে, যে ব্যক্তি রাতে আয়াত দুটি তিলাওয়াত করবে, তার জন্য তা যথেষ্ট হবে।
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলা হয়, রাতে কোরআন তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে আয়াত দুটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বর্ণনায় রাতের অনিষ্ট থেকে সুরক্ষা এবং অপ্রিয় বিষয় থেকে হেফাজতের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণে অনেক মুসলিম রাতে ঘুমানোর আগে সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত তিলাওয়াত করে থাকেন।
আয়াত দুটিতে আল্লাহর কাছে ক্ষমা, রহমত ও সাহায্য চাওয়া হয়েছে। একজন মুমিনের জন্য এগুলো নিজের ভুলত্রুটি স্বীকার, আল্লাহর ওপর ভরসা এবং তাঁর কাছে আশ্রয় চাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে।
জান্নাতের পথ সুগম করার আমল
সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াতের মর্যাদা সম্পর্কে আরও একটি বর্ণনায় কোরআনের সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ সূরা ও আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করার কথা এসেছে। সেখানে সূরা ইখলাসকে কোরআনের মর্যাদাপূর্ণ সূরা এবং আয়াতুল কুরসিকে মর্যাদাপূর্ণ আয়াত হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পরে এমন আয়াত সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়, যা মহানবী (সা.) ও তাঁর উম্মতের উপকারে আসবে। উত্তরে সূরা বাকারার ২৮৫ ও ২৮৬ নম্বর আয়াতের কথা বলা হয়।
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, মিরাজের রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সঙ্গে সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত মহানবী (সা.)-কে দেওয়া হয়েছিল। হাদিসে এই আয়াত দুটির বিশেষ মর্যাদার কথা এসেছে। নিয়মিত তিলাওয়াতের মাধ্যমে একজন মুসলিম আল্লাহর কাছে ক্ষমা, রহমত ও সাহায্য চাইতে পারেন।
সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াতের আমল মুসলিমদের জন্য ঈমানের স্বীকৃতি, আনুগত্য এবং আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে আয়াত দুটির নিয়মিত তিলাওয়াত এবং হাদিসে বর্ণিত ফজিলত ও মর্যাদা লাভের তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট
