
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বাড়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি আকাশচুম্বী হয়ে উঠছে সমুদ্রপথে তেল পরিবহনের ব্যয়। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু অপরিশোধিত তেল নয়, পরিশোধিত জ্বালানির বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১ দশমিক ২২ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১০ দশমিক ১৩ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম বেড়েছে ১ দশমিক ১১ শতাংশ, দাঁড়িয়েছে ৯৮ দশমিক ৯২ ডলারে।
হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তাঝুঁকি, সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়ায় বাজারে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) দাবি, অনুমোদনহীন পথে চলার চেষ্টা করা তিনটি ট্যাংকারের চলাচল নৌ-মাইন দিয়ে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, মাইনের কারণে দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে আগুনও ধরে।
এদিকে ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী সোমবার সৌদি আরবের ইয়ানবুতে সৌদি আরামকোর স্থাপনা, শাইবাহ তেলক্ষেত্র এবং রিয়াদ ও আবহা বিমানবন্দরে হামলার দাবি করেছে। এসব ঘটনার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামো ও পরিবহনপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
জ্বালানি বাজারে এর প্রভাব শুধু সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কায় সীমাবদ্ধ নয়। সংঘাতের কারণে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন, বিকল্প পথে পরিবহন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাড়তি খরচও তেলের চূড়ান্ত দামে চাপ সৃষ্টি করছে।
ব্যারেলপ্রতি পরিবহন ব্যয় ২০ ডলারের ওপরে
বাজারে চাপের আরেকটি বড় কারণ তেল পরিবহনের ব্যয় বৃদ্ধি। গোল্ডম্যান স্যাকসের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের গড় ভাড়া ব্যারেলপ্রতি ২০ ডলারের ওপরে উঠেছে। এক বছর আগে এই ব্যয় ছিল প্রায় ৩ ডলার।
অর্থাৎ, তেল পরিবহনের গড় ব্যয় এক বছরের ব্যবধানে প্রায় সাত গুণের বেশি বেড়েছে। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে যুদ্ধঝুঁকিজনিত অতিরিক্ত বিমা ব্যয় প্রতি ব্যারেলে প্রায় ৭ ডলার বৃদ্ধির জন্য দায়ী। পারস্য উপসাগরের বাইরে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের মতো কার্যক্রমে বাড়তি ব্যয় যোগ হচ্ছে আরও প্রায় ৪ ডলার।
এ পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, জ্বালানি বাজারে সংকটের চাপ এখন শুধু তেলের উৎপাদন বা সরবরাহের ওপর নির্ভর করছে না। পরিবহনব্যবস্থার ব্যয় বেড়ে যাওয়াও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এশিয়ার শোধনাগার ও ভোক্তাদের ওপর চাপ বাড়তে পারে
পরিবহন ব্যয় দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে অপরিশোধিত তেলের বিভিন্ন ধরনের দামের ব্যবধান বাড়তে পারে। এতে এশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোর জন্য কাঁচামাল সংগ্রহ আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে শোধনাগারগুলোর মুনাফার ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অপরিশোধিত তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় একসঙ্গে বাড়লে পেট্রোল, ডিজেল ও অন্যান্য পরিশোধিত জ্বালানির উৎপাদন ও সরবরাহ খরচও বেড়ে যেতে পারে। তবে সেই বাড়তি ব্যয় কতটা এবং কত দ্রুত ভোক্তাপর্যায়ে পৌঁছাবে, তা নির্ভর করবে সংঘাতের স্থায়িত্ব, জাহাজ চলাচলের পরিস্থিতি এবং সরবরাহব্যবস্থার ওপর।
বাজারের সামনে প্রধান অনিশ্চয়তা
বর্তমান পরিস্থিতিতে তেলের বাজারের গতিপথ নির্ধারণে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কতটা স্বাভাবিক থাকে, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার ঝুঁকি কতটা বাড়ে এবং পরিবহন ব্যয় কখন কমতে শুরু করে।
সংঘাত প্রশমিত হলে পরিবহন ও নিরাপত্তা ব্যয় কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিপরীতে, নৌপথে ঝুঁকি বাড়তে থাকলে সরবরাহে বিঘ্নের আশঙ্কা ও অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় তেলের দামে আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সব মিলিয়ে, আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে বর্তমান মূল্যবৃদ্ধি শুধু ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রতিক্রিয়া নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবহনব্যবস্থার বাড়তি ব্যয় ও সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা। এই চাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব জ্বালানি আমদানিকারক দেশ, শোধনাগার এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরও পড়তে পারে।
The post হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি; বিশ্ববাজারে বাড়ল তেলের দাম appeared first on অর্থসূচক.
