ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করতে গিয়ে দিল্লির ঐতিহাসিক জন্তর মন্তরে প্রবেশের চেষ্টা করেন ‘ককরোচ’ আন্দোলনের নেতারা। মঙ্গলবার ব্যারিকেড টপকে সেখানে ঢোকার পর তাঁদের আটক করে পুলিশ। ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কের জেরে চলতি মাসজুড়ে দেশটিতে প্রায় প্রতিদিনই বিক্ষোভ করছেন আন্দোলনটির সমর্থক ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা।
সমালোচকদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে লাখ লাখ ভোটারের নাম বাদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে নির্বাচন কমিশন কোনো দলকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কমিশনের দাবি, ভুলভাবে বাদ পড়া ভোটাররা পুনরায় নিবন্ধন করতে পারবেন। অন্যদিকে বিজেপির অভিযোগ, বৈধ নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিরোধীরা গণতন্ত্রকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে।
সোমবার বিরোধী দলগুলোর আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিলে হাজারো মানুষ অংশ নেন। এর আগে সপ্তাহান্তে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভ কর্মসূচি ঠেকাতে পুলিশি অভিযানে দলটির নেতাসহ হাজারো বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়।
সোমবার দিল্লি পুলিশ জানায়, রাজধানীর কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্থিত জন্টর মন্তরকে আর আনুষ্ঠানিক বিক্ষোভস্থল হিসেবে নির্ধারণ করা হচ্ছে না। বিক্ষোভের জন্য নতুন তিনটি স্থানও চিহ্নিত করা হয়েছে। এর প্রতিবাদে সিজেপির নেতারা জন্টর মন্তরে প্রবেশ করে স্থানটি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন বলে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সিজেপির দাবি, দলটির নেতা আশুতোষ রাঙ্কা, সৌরভ দাস ও অজিঙ্কা শিন্দেসহ প্রায় ২০ জন ওই স্থানে প্রবেশের পর আটক হন। দলটির সরাসরি সম্প্রচার করা ভিডিওতে প্রায় এক ডজন মানুষকে ফটক ও ব্যারিকেড টপকে ভেতরে ঢুকতে দেখা যায়। এ সময় তাঁরা ভারতের জাতীয় পতাকা নাড়িয়ে স্লোগান দেন। পরে পুলিশ তাঁদের আটক করে। এ বিষয়ে দিল্লি পুলিশের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গত কয়েক মাসে সরকারি স্কুলের অবকাঠামো থেকে শুরু করে কর্মসংস্থান—বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলন করে আসছে তরুণদের এই সংগঠন। গত ১২ বছরে মোদি ও তাঁর দলের জন্য এটিকে অন্যতম বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। চলতি বছরের শুরুতে জন্টর মন্তরে সংগঠনটির সমর্থকদের কয়েক সপ্তাহের অবস্থান কর্মসূচির পর পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার দিল্লির ব্যবসায়িক কেন্দ্র কনট প্লেসেও বিক্ষোভ হয়। টেলিভিশন ফুটেজে দেখা যায়, অবস্থান কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করলে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের ছাত্রসংগঠনের কয়েক ডজন সদস্যকে পুলিশ বাসে তুলে নিয়ে যায়। পূর্বাঞ্চলীয় শহর পাটনাতেও বিক্ষোভ মিছিলের সময় বামপন্থী ছাত্রসংগঠনের একটি ছোট দল পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করে।
সপ্তাহান্তের ঘটনাগুলোর সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের আটক করার প্রতিবাদে নয়াদিল্লির প্রেস ক্লাব অব ইন্ডিয়ায় প্রায় ১৫০ সাংবাদিক সমবেত হয়ে মিছিল করেন।
গত মাসে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভোটার তালিকা সংশোধন, নিবন্ধনপ্রক্রিয়া ও ডিজিটাল ব্যবস্থা নিয়ে নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের দুই সহকারী অভ্যন্তরীণভাবে বেশ কয়েকটি উদ্বেগের কথা জানিয়েছিলেন। এরপর থেকেই বিক্ষোভ আরও জোরালো হয়।
গত বছর শুরু হওয়া ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় তালিকা থেকে ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বাদ পড়াদের মধ্যে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ মৃত, ৬ কোটি ৩০ লাখ অন্যত্র চলে গেছেন এবং ৩ কোটি মানুষকে খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়েছে।
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এই বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘু ভোটাররা তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের মতে, এসব ভোটারের বড় অংশ হিন্দুত্ববাদী বিজেপিকে সমর্থন করার সম্ভাবনা কম। তবে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি—উভয় পক্ষই এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
সূত্র: রয়টার্স
এমএস/
