প্রধান অতিথির বক্তব্যে শামা ওবায়েদ বলেন, ‘বর্তমান বিশ্বে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হচ্ছে, আঞ্চলিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে কোনো একটি দেশ বা বলয়ের দিকে না ঝুঁকে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে সবার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় বাংলাদেশ। একই সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের সাফল্য শুধু তার বিস্তৃতি দিয়ে নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে অবদানের ভিত্তিতে মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
গতকাল বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) আয়োজনে ‘ফরেন পলিসি অব বাংলাদেশ: নেভিগেটিং পাথওয়েজ ইন আ শিফটিং ওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
সেমিনারে উপস্থাপিত চারটি গবেষণাপত্রে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। প্রবন্ধ উপস্থাপকরা উদীয়মান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতির সমন্বয়, সমসাময়িক প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা অগ্রাধিকারের গুরুত্ব এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়গুলো আলোচনা করেন।
এছাড়া ক্রমবর্ধমান অনিশ্চিত বহুপক্ষীয় ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়া, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিকাশের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর উপায় পর্যালোচনা করা হয়। একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তুলতে আদর্শিক অঙ্গীকার ও নীতিগত মূল্যবোধ সমুন্নত রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রবন্ধ উপস্থাপকরা। তাদের মতে, জাতীয় স্বার্থ এগিয়ে নেয়ার পাশাপাশি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের দায়িত্বশীল ভূমিকা জোরদার করতে ভারসাম্যপূর্ণ, বাস্তবসম্মত ও দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতি প্রয়োজন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে শামা ওবায়েদ বলেন, ‘বর্তমান বিশ্বে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হচ্ছে, আঞ্চলিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হতে হবে জাতীয় স্বার্থভিত্তিক, যা পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার পাশাপাশি দেশের সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা রক্ষা করবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’’ পররাষ্ট্রনীতির মূল কথাও এটি।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ‘‘হয় এটা, নয়তো ওটা’’ এমন কোনো অবস্থান নেই। কোনো একটি দেশকে বেছে নিয়ে অন্য দেশকে বাদ দেয়ার পরিবর্তে সবার সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে চায় সরকার। অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ, নতুন বাজারে প্রবেশাধিকার এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব জোরদারেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।’
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, তৈরি পোশাকের পাশাপাশি সিরামিক, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং পাট ও পাটজাত পণ্যের রফতানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। বিনিয়োগ পরিবেশকে আরো স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতেও সরকার কাজ করছে। এআই, ডেটা সেন্টার এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সরকারি সেবায় প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণকে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তি কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, মধ্য এশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার সুযোগ সম্প্রসারণের কথা বলেন শামা ওবায়েদ। আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করা, বিমসটেকের মাধ্যমে সহযোগিতা গভীর করা এবং আসিয়ান আঞ্চলিক ফোরামে গঠনমূলক সম্পৃক্ততার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
সেমিনারে সভাপতিত্ব ও স্বাগত বক্তব্য দেন বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আ স ম রিদওয়ানুর রহমান। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিদেশী কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী, ব্যবসায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, গবেষক ও বিভিন্ন থিংক ট্যাংকের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন।
