হেমন্তের স্নিগ্ধ সকালে সবুজ ফসলের মাঠে হঠাৎ চোখ আটকে যায় রঙিন হীরামন টিয়া পাখির অবাধ উড়াউড়িতে। কখনো ধানের শিষে বসে খাদ্য গ্রহণ করছে, আবার কখনো ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে পাশের সবুজ মাঠে। পাখির এমন প্রাণবন্ত বিচরণ ও সৌন্দর্য উপভোগ করতে নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার দোনইল গ্রামে প্রতিদিন ভিড় জমাচ্ছেন প্রকৃতিপ্রেমী ও আলোকচিত্রীরা (ফটোগ্রাফার)। কেউ অপলক দৃষ্টিতে দেখছেন, আবার কেউ ক্যামেরার লেন্সে বন্দি করছেন প্রকৃতির এই দুর্লভ মুহূর্ত।
রোববার ভোরে বদলগাছী উপজেলার বালুভরা ইউনিয়নের দোনইল গ্রামের ফসলের মাঠে এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের দেখা মেলে।
হেমন্তের শিশিরভেজা সকালে রঙিন হীরামন টিয়ার ডানার ছন্দ আর বিচরণ দেখতে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে ছুটে আসছেন বিভিন্ন বয়সী আলোকচিত্রী। কারও হাতে আধুনিক ক্যামেরা, আবার কারও হাতে ভিডিও ধারণের উন্নত সরঞ্জাম। দূর থেকে পাখিদের স্বাভাবিক ও অবাধ চলাচলের দৃশ্য ফ্রেমবন্দি করছেন তাঁরা।
জয়পুরহাট জেলা থেকে আসা আলোকচিত্রী সোহেল রানা জানান, অতি ভোরে বদলগাছীর ফসলের মাঠে হীরামন টিয়ার ছবি ও চিত্রগ্রাহ্য দৃশ্য সংগ্রহের জন্য তিনি এসেছেন। প্র প্রাকৃতিক পরিবেশে পাখির উড়াউড়ি ও খাবার খাওয়ার দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করতে পেরে তিনি দারুণ উচ্ছ্বসিত।
প্রতিবেশী আক্কেলপুর উপজেলা থেকে আসা প্রকৃতিপ্রেমী রাজন বলেন, "খুব ভোরে এসে প্রায় তিন-চার ঘণ্টা অপেক্ষার পর সকাল ৭টার দিকে হীরামন টিয়ার দেখা পেয়েছি। তারা খাবার খাচ্ছে এবং ধানক্ষেত থেকে শিষ কেটে উড়ে যাচ্ছে। এ মনোমুগ্ধকর দৃশ্য ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।"
শুধু পেশাদার আলোকচিত্রীই নন, টিয়া পাখির এমন বিরল সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসছেন সাধারণ প্রকৃতিপ্রেমী মানুষও। যান্ত্রিক জীবনের বাইরে ফসলের মাঠে পাখির এই বিচরণ তাঁদের প্রকৃতির কাছাকাছি আসার সুযোগ করে দিচ্ছে। কখনও মুখে ধানের শিষ নিয়ে উড়ে যাওয়া, আবার কখনও দল বেঁধে ঘাস ও শিষ কাটার এই মুহূর্তগুলোই হয়ে উঠছে প্রকৃতিপ্রেমীদের মুগ্ধতার মূল আকর্ষণ।
দোনইল গ্রামের শিক্ষক ও আলোকচিত্রী সঞ্জয় কুমার জানান, গত কয়েক মাস ধরে দোনইল-মহদীপুর এলাকার ফসলের মাঠে হীরামন টিয়ার নিয়মিত উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রতিদিন ভোর ৬টা থেকে সকাল সাড়ে ৭টা এবং বিকেলে সাড়ে ৩টা থেকে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত মাঠে এদের বিচরণ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
এদিকে হীরামন টিয়ার এই সৌন্দর্য ধরে রাখতে এবং পাখিদের নিরাপদ খাদ্যের জোগান দিতে দোনইল গ্রামের পাখিপ্রেমী যুবক আরিফ আফরান নিজ উদ্যোগে ও খরচে তাঁর জমিতে বিশেষ প্রজাতির জনসন ঘাসের চাষ করেছেন। সেই ঘাসের বীজ ও ফসল খেতে প্রতিদিন ভোরে নিয়মিত হীরামন টিয়ার দল ছুটে আসে।
আরিফ জানান, প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১৫ জন আলোকচিত্রী এই মাঠে আসেন। এ পর্যন্ত শতাধিক আলোকচিত্রী হীরামন টিয়াকে ফ্রেমবন্দি করতে বদলগাছীতে এসেছেন।
হেমন্তের ফসলের মাঠে হীরামন টিয়ার অবাধ বিচরণ এবং পাখির টানে মানুষের এমন ছুটে আসা সব মিলিয়ে বদলগাছীর দোনইল গ্রাম যেন এখন প্রকৃতি ও পাখিপ্রেমীদের এক মেলবন্ধনে পরিণত হয়েছে।
জেএইচআর
