খন্দকার মোহাম্মাদ আলী বাবু, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:
মাদক নামের তিনটি অক্ষর যেন মা, মাটি ও দেশকে কলঙ্কিত করছে। এর নেপথ্যে রয়েছে কিছু অসাধু, কুবুদ্ধিসম্পন্ন ও অর্থলোভী ব্যক্তি, যাদের ছত্রচ্ছায়ায় বিলাসী জীবনের স্বপ্নে বিভোর হয়ে কিছু কুচক্রী মহল ভোগবিলাসের রাজত্ব কায়েম করতে চায়। এদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন সমাজের কিছু পরিচিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। মর্যাদার আসনে বসে ক্ষমতার দম্ভে বিলাসী জীবনের স্বপ্ন পূরণে মাদক ব্যবসাকে তাঁরা আলাদিনের চেরাগ মনে করছেন।
ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রের শৃঙ্খলাব্যবস্থাকে আজ গভীর সংকটে ফেলেছে মাদক। প্রতিনিয়ত খুন, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে মাদকের যোগসূত্রের অভিযোগ উঠে আসছে। অথচ অপরাধীরা এসব অপরাধকে যেন তেমন গুরুত্বই দিচ্ছে না। ভয়ংকর কর্মকাণ্ডের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়েও তারা আবার নতুন করে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর হুমকি দিচ্ছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত চেষ্টা করেও সমাজে কাঙ্ক্ষিত শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হিমশিম খাচ্ছে।
উন্নয়ন অনুসন্ধান ফাউন্ডেশনের সেচ্ছাসেবীদের মাঠ পর্যায়ের তথ্যে জানাযায়, পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছে যে, মাদকের ভয়াল বিস্তার ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সাধারণ মানুষ মাদকের নাম শুনলেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। সমাজের কিছু সচেতন ব্যক্তি প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলেও মাদকচক্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবাদকারীদের কেউ কেউ অজ্ঞাত অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা কিংবা হয়রানির মুখে পড়ে পিছিয়ে যেতে বাধ্য হন। ফলে সমাজে প্রতিবাদী মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে, মাদক ব্যবসায়ীরা নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে সমাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
এ চিত্র যেন বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রভাব ও পেশিশক্তির অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এসবের সুযোগ নিয়ে মাদকচক্র পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যুবসমাজকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে।
মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কৌশলী সহযোগীরা নেপথ্যে থেকে অর্থের বিনিময়ে সমাজের সহজ-সরল মানুষকে ব্যবহার করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও মাদক বহনকারী ব্যক্তিদের পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতা শনাক্ত করতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন। মাদক ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কৌশলে ছদ্মবেশী ব্যক্তিদের মাধ্যমে মাদকদ্রব্য বহন করে থাকে। ফলে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সংবাদ পেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন কাউকে আটক করে, তখন অনেক সময় এলাকার কিছু মানুষ তাঁর পক্ষে অবস্থান নিয়ে দাবি করেন, ওই ব্যক্তি ভালো মানুষ এবং তিনি এমন কাজ করতে পারেন না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে। কিন্তু প্রকৃত অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে পরিচয় বা সামাজিক অবস্থান যা-ই হোক, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা জরুরি।
এলাকার সচেতন মহলের মতে, মাদক ব্যবসায়ীরা নানা কৌশলে সমাজের দরিদ্র ও অসহায় ব্যক্তিদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। প্রথমে তাদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হয়। পরে সুযোগ বুঝে তাদের মাদক বহনসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে ফেলা হয়। একপর্যায়ে দেখা যায়, প্রকৃত মাদক ব্যবসায়ীরা নেপথ্যে থেকে যায়, আর অসহায় ব্যক্তিরা অপরাধের দায়ে ফেঁসে যায়। এভাবেই দেশের বিভিন্ন স্থানে মাদকের সাম্রাজ্য বিস্তারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে এবং বাড়ছে মাদকসংশ্লিষ্ট অপরাধের ঝুঁকি।
চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, ধর্ষণ ও হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধের পেছনে মাদকের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। মাদক নির্মূলে শুধু মাদক বহনকারী বা সেবনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই চলবে না; এর সঙ্গে জড়িত মূল হোতা, অর্থের জোগানদাতা, উৎপাদক, সরবরাহকারী ও সহযোগীদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং তরুণদের সচেতন করে তোলার উদ্যোগ জোরদার করা জরুরি।
তাই রাষ্ট্রব্যবস্থায় মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় মাদক সমাজব্যবস্থাকে ধ্বংস করার পাশাপাশি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎকেও বিপন্ন করে তুলবে। মাদক নির্মূলে প্রয়োজন আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, সামাজিক প্রতিরোধ এবং সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ।
এ জাতীয় আরো খবর..
