কোলেস্টেরল বাড়ার ভয়ে ডিম, চিংড়ি কিংবা চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলেন অনেকে। একসময় প্রাণিজ খাবারে থাকা কোলেস্টেরলকে হার্টের স্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
তবে গবেষণা বলছে, অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে খাবার থেকে পাওয়া কোলেস্টেরলের প্রভাব ধারণার চেয়ে কম। বরং স্যাচুরেটেড ফ্যাট গ্রহণ, সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম ও বংশগতির মতো বিষয় রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রায় বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।
পুষ্টিবিদ শ্যানন স্টকেরোর মতে, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সব ধরনের চর্বি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং ক্ষতিকর চর্বির পরিবর্তে স্বাস্থ্যকর চর্বি বেছে নেওয়া এবং আঁশসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
কোলেস্টেরল নিয়ে ভুল ধারণা
কোলেস্টেরল বেশি থাকা খাবার খেলেই রক্তে কোলেস্টেরল বেড়ে যায়—এটি প্রচলিত একটি ভুল ধারণা। শরীর নিজেও প্রাকৃতিকভাবে কোলেস্টেরল তৈরি করে, যা কোষের গঠন, হরমোন উৎপাদন ও হজমপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
স্যাচুরেটেড ফ্যাট রক্তে এলডিএল বা ‘খারাপ’ কোলেস্টেরল বাড়াতে পারে। চর্বিযুক্ত মাংস, মাখন ও পূর্ণ চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত খাবারে এটি বেশি থাকে। অন্যদিকে, ট্রান্স ফ্যাট এলডিএল বাড়ানোর পাশাপাশি এইচডিএল বা ‘ভালো’ কোলেস্টেরল কমাতে পারে। তাই এসব চর্বি গ্রহণ সীমিত রাখা প্রয়োজন।
অপরদিকে, অলিভ অয়েল, অ্যাভোকাডো, বাদাম, বীজ ও চর্বিযুক্ত মাছে থাকা অসম্পৃক্ত চর্বি স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিবর্তে খেলে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।
আঁশসমৃদ্ধ খাবার কেন জরুরি?
কোলেস্টেরল কমাতে দ্রবণীয় আঁশ বিশেষভাবে উপকারী। ওটস, শিম, মসুর ডাল, আপেল ও বার্লিতে এ ধরনের আঁশ পাওয়া যায়। এটি পরিপাকতন্ত্রে কোলেস্টেরলযুক্ত কিছু উপাদানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সেগুলো শরীর থেকে বের করে দিতে সাহায্য করে। ফলে রক্তে এলডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রা কমতে পারে।
পূর্ণ শস্য, ফলমূল, শাকসবজি, ডাল, বাদাম ও বীজ দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সহায়তা করে। এতে ওজন নিয়ন্ত্রণ ও হার্টের স্বাস্থ্য ভালো রাখাও সহজ হয়।
ডিম-চিংড়ি কি বাদ দিতে হবে?
বেশির ভাগ মানুষের জন্য ডিম ও চিংড়ি সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। এগুলো উচ্চমানের প্রোটিন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে। তাই নির্দিষ্ট একটি খাবার বাদ দেওয়ার পরিবর্তে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া ভালো।
খাবারে ছোট পরিবর্তন এনে উপকার পাওয়া সম্ভব। রান্নায় মাখন বা পশুর চর্বির বদলে অলিভ অয়েল ব্যবহার করা যায়। মাংসের কিছু অংশের পরিবর্তে ডাল বা কালো শিম যোগ করলে আঁশ বাড়ে এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাট কমে। প্রক্রিয়াজাত চর্বিযুক্ত মাংসের বদলে মাছ খাওয়া এবং ক্রিমযুক্ত স্প্রেডের পরিবর্তে হুমুস, অ্যাভোকাডো বা বাদামের মাখন বেছে নেওয়াও ভালো বিকল্প।
যে খাদ্যাভ্যাস সবচেয়ে কার্যকর
কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ ও হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে ভূমধ্যসাগরীয় খাদ্যাভ্যাস (এ পদ্ধতিতে শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, বাদাম, মাছ ও পূর্ণ শস্য বেশি খাওয়া হয়) এবং ড্যাশ ডায়েট (উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক এই খাদ্যপদ্ধতিতে শাকসবজি, ফলমূল, পূর্ণ শস্য, ডাল, বাদাম ও কম চর্বিযুক্ত দুধ খাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়) বেশ উপকারী।
এসব খাদ্যতালিকায় ফলমূল, শাকসবজি, ডাল, বাদাম, লাল চাল বা লাল আটার মতো পূর্ণ শস্য এবং স্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার বেশি থাকে।
অন্যদিকে, কিটো ও শুধু প্রাণিজ খাবার খাওয়ার খাদ্যাভ্যাসে কারও কারও ওজন কমতে পারে। তবে এসব খাবারে স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি থাকলে রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল (এলডিএল) বেড়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ হলো, পছন্দের খাবার পুরোপুরি বাদ না দিয়ে পরিমাণ ও খাওয়ার হার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার বা শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করা জরুরি। উচ্চ কোলেস্টেরল থাকলে চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিয়ে নিজের স্বাস্থ্য ও জীবনযাপনের সঙ্গে মানানসই খাদ্যপরিকল্পনা তৈরি করা উচিত।
সূত্র: ওয়েবএমডি