আজকাল ওয়েবডেস্ক: টালির চালের ছোট্ট ঘর। দেওয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে। অভাবের সংসারে প্রতিদিনের লড়াই। সেই ঘর থেকেই স্বপ্ন দেখেছিল ছেলেটা। পায়ে ফুটবল নিয়ে ছুটে বেড়ানোর স্বপ্ন। একদিন দেশের জার্সি গায়ে বিশ্বমঞ্চে নামার স্বপ্ন।
শুক্রবার সেই স্বপ্নেরই যেন আরও এক ধাপ পূরণ হল রিষড়ার সাতগড়ার সৌম্যজিৎ সরকারের। ফিফা অনূর্ধ্ব-১৫ ফুটবল বিশ্বকাপে ভারতের হয়ে মাঠে নেমে প্রতিপক্ষের জালে বল জড়াল ১৫ বছরের এই কিশোর। লাওসের বিরুদ্ধে ৪-২ গোলে জিতল ভারত। আর সেই জয়ের অন্যতম মুহূর্ত হয়ে রইল সৌম্যজিতের দুরন্ত গোল।
আজারবাইজানের বাকুতে শনিবার, ২৪ অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে এই প্রতিযোগিতা। চলবে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত। লাওসের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচেই নজর কেড়েছে রিষড়ার এই কিশোর। প্রতিপক্ষের বক্সের বাইরে থেকে তাঁর নেওয়া জোরালো শট জড়িয়ে যায় জালে। গোলের পর উচ্ছ্বাস শুধু মাঠে নয়, ছড়িয়ে পড়েছে সাতগড়ার বাড়িতেও। টেলিভিশনের পর্দায় ছেলের কীর্তি দেখে গর্বে বুক ভরে উঠেছে বাবা-মায়ের। তবে এই আনন্দের পিছনে রয়েছে বছরের পর বছর লড়াই, ত্যাগ আর অদম্য জেদ।
সাতগড়া হাই স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র সৌম্যজিৎ মূলত ডিফেন্ডার। প্রতিপক্ষের আক্রমণ রুখে দেওয়াই তার কাজ। কিন্তু সুযোগ পেলে আক্রমণে উঠে গোল করতেও যে সে সমান পারদর্শী, তার প্রমাণ মিলেছে লাওসের বিরুদ্ধে। ডিফেন্স সামলানোর দায়িত্বে থাকা ছেলেটির পা থেকেই এল বিশ্বমঞ্চে ভারতের হয়ে গোল। ছেলের এই কৃতিত্বে আপ্লুত মা পুষ্পাঞ্জলি সরকার। তাঁর কথায়, “ও ছোট থেকেই ফুটবল খুব ভালবাসে। নারু স্যারের কাছে প্রশিক্ষণ শুরু। তার পরে বিভিন্ন ক্লাবে খেলেছে। আই লিগ, নার্সারি লিগেও খেলার অভিজ্ঞতা হয়েছে। এক সময় এফসি মাদ্রাজ থেকে ট্রায়ালের ডাক আসে। সেখানে নির্বাচিত হওয়ার পরে গত তিন বছর ধরে ওই ক্লাবেই রয়েছে।”
সৌম্যজিতের জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার খবরও এসেছিল আচমকাই। পুষ্পাঞ্জলি বলেন, “গত ১৫ আগস্ট এফসি মাদ্রাজ থেকে ফোন করে জানানো হয়, ভারতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপে খেলার জন্য ওকে ট্রায়ালে ডাকা হয়েছে। তার পরে এই জায়গায় পৌঁছনো। ছেলেকে দেশের হয়ে খেলতে দেখার অনুভূতি ভাষায় বোঝানো যায় না। আমরা ভীষণ গর্বিত। চাই, ও আরও ভাল খেলুক, দেশের নাম উজ্জ্বল করুক।”

তবে এই সাফল্যের পথ মোটেই মসৃণ ছিল না। সৌম্যজিতের বাবা পাঁচু গোপাল সরকার একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন। মা গৃহবধূ। সীমিত আয়ের সংসারে ছেলের ফুটবল প্রশিক্ষণ, পড়াশোনা এবং খেলার খরচ সামলানো সহজ ছিল না। তবু ছেলের স্বপ্নে বাধা হয়ে দাঁড়াননি তাঁরা। পাশে থেকেছেন পরিবারের অন্য সদস্যরাও। পাঁচু গোপালের কথায়, “ছোট থেকে ও অনেক কষ্ট করেছে। লড়াই করে আজ এই জায়গায় পৌঁছেছে। আমরাও সাধ্যমতো সাহায্য করেছি। বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রেও ওর দাদু-দিদারা পাশে দাঁড়িয়েছেন। পড়াশোনা আর খেলা একসঙ্গে চালানো কঠিন। তবু ও চেষ্টা করেছে, শিক্ষকও সহযোগিতা করেছেন। বাবা হিসেবে এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে! আজ ছেলে দেশের হয়ে বিশ্বমঞ্চে খেলছে।”
সৌম্যজিতের ফুটবলের প্রথম পাঠ শুরু হয়েছিল ছোটবেলার কোচ শান্তনু দেবের কাছে। সেই সময় থেকেই ছেলেটির মধ্যে প্রতিভা ও পরিশ্রম করার মানসিকতা দেখেছিলেন তিনি। শান্তনু বলেন, “অনেক বাধা পেরিয়ে সৌম্যজিৎ আজ এই জায়গায় এসেছে। ছোট থেকেই ও মেধাবী, পরিশ্রমী। আমি নিজে ওকে বিধাননগর-সহ বিভিন্ন জায়গায় প্রশিক্ষণের জন্য নিয়ে যেতাম। পরিবারও সব সময় পাশে থেকেছে। আজ দেশের হয়ে বিশ্বমঞ্চে ওকে খেলতে দেখে কোচ হিসেবে গর্ব হচ্ছে। আগামী দিনে ভারতীয় ফুটবলে আরও এক সুধীর কর্মকার হয়ে উঠুক সৌম্যজিৎ—এটাই চাই।”
এক দিকে বিশ্বমঞ্চের আলো, অন্য দিকে সাতগড়ার সেই সাধারণ বাড়ি। বাড়ির দেওয়ালে হয়তো এখনও অভাবের চিহ্ন, কিন্তু সৌম্যজিতের পায়ের জাদুতে স্বপ্ন দেখছে গোটা পরিবার। লাওসের বিরুদ্ধে তাঁর গোল যেন সেই স্বপ্নেরই এক টুকরো বাস্তব। প্রথম সাফল্যেই থেমে থাকতে চায় না পরিবার। মা পুষ্পাঞ্জলির কথায়, “অনেক পথ চলা বাকি। ও আরও এগিয়ে যাক। একজন বাঙালি হিসেবে দেশের নাম আরও উঁচুতে নিয়ে যাক—এটাই আমাদের চাওয়া।”
সাতগড়ার ছোট্ট ঘর থেকে আজারবাইজানের ফুটবল মাঠ—সৌম্যজিতের এই যাত্রা শুধু একটি গোলের গল্প নয়। এ গল্প অভাবকে হার মানানোর, পরিবারের পাশে থাকার, আর স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যাওয়ার। যে পায়ে এক দিন শুরু হয়েছিল ফুটবলের প্রথম পাঠ, সেই পায়েই আজ বিশ্বমঞ্চে ভারতের হয়ে গোল। এবার স্বপ্ন আরও দূরের। আরও বড় মঞ্চের। আরও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের।
