অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক শিক্ষা ও অভিবাসন নীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে কঠোর সব পরিবর্তনের ঢেউ লেগেছে। আবাসনসংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েন ঘিরে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ওপর কড়াকড়ি দিন দিন বাড়ছে। এক ভিসা থেকে অন্য ভিসায় পরিবর্তন (ভিসা হপিং) বন্ধ করা, অস্ট্রেলিয়ার ভেতর থেকে নতুন শিক্ষার্থী ভিসার আবেদন নিষিদ্ধ করা এবং আবেদন ফি তিন গুণ বাড়িয়ে প্রায় আড়াই হাজার ডলারে উন্নীত করার মতো সিদ্ধান্তে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। অনেকের মনেই প্রশ্ন—অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা কি তবে বাদ দেওয়া উচিত, নাকি এখনো কোনো বাস্তবসম্মত পথ খোলা আছে? অভিজ্ঞ কয়েকজন বিশ্লেষকের সঙ্গে কথা বলে ও বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে কিছু জিজ্ঞাসার সোজাসাপটা উত্তর তুলে ধরা হলো এখানে।
অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে যাওয়ার পরিকল্পনা কি আপাতত বাদ দেওয়া উচিত?
বিশ্লেষকেরা বলছেন, শিক্ষার্থী ভিসা বন্ধ হয়নি। অস্ট্রেলিয়া সরকার ২০২৭ সালের জন্যও নতুন শিক্ষার্থী ভর্তির পরিকল্পিত সীমা ২ লাখ ৯৫ হাজারই রেখেছে। তাই অস্ট্রেলিয়ায় পড়ার পরিকল্পনা থাকলে সেটা পুরোপুরি বাতিল করে দেওয়ার যৌক্তিক কারণ নেই। দেশটির অর্থনীতি ও সেবা খাত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তবে নির্বিচারে আবেদন না করে কৌশল পরিবর্তন করা জরুরি।
অস্ট্রেলিয়ায় যাঁরা পড়তে গেছেন, তাঁদের মধ্যে হঠাৎ এত আতঙ্ক কেন?
কারণ রাজনীতি। আবাসনসংকট আর জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ভোটারদের ক্ষোভ আছে। ক্ষমতাসীন লেবার সরকার অভিবাসীর সংখ্যা কমাতে চায়। বিরোধী জোট আরও কঠোর। তাঁরা শিক্ষার্থী ভর্তি বছরে ২ লাখ ৪০ হাজারে বেঁধে দিতে চায়, অস্থায়ী স্নাতক ভিসা প্রায় তুলে দিতে চায়। তবে এটি এখনো প্রস্তাব, আইন নয়।
এখনকার কড়াকড়ির পেছনে মূল রাজনৈতিক বাস্তবতাটা কী?
অস্ট্রেলিয়ার সাবেক উপসচিব ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আবুল রিজভীর মতে, বর্তমান নীতিগত কড়াকড়ির অনেকটাই স্থানীয় রাজনৈতিক চাপ এবং আসন্ন নির্বাচনকেন্দ্রিক ‘ড্রামা’। আবাসন ও মূল্যস্ফীতির ব্যর্থতা ঢাকতেই সরকার সাময়িকভাবে শিক্ষার্থীদের লক্ষ্যবস্তু করেছে। নির্বাচন ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অস্ট্রেলিয়ার শ্রমবাজারের প্রয়োজনেই এই নিয়মে আবার ভারসাম্য ফিরবে। তবে পরবর্তী ফেডারেল নির্বাচন ২০২৮ সালে। অভিজ্ঞদের মতে, নির্বাচনের পর উত্তেজনা কমতে পারে, কিন্তু পুরোনো দিন ফিরবে না।
এখন কারা সবচেয়ে বেশি ভিসা জটিলতা ও বাতিলের ঝুঁকিতে পড়ছেন?
নিবন্ধিত অভিবাসন পরামর্শক মোহাম্মদ নিজামউদ্দীন জানাচ্ছেন, তথাকথিত বেসরকারি আন্তর্জাতিক ক্যাম্পাস বা সস্তা ডিপ্লোমা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে ভিসা বাতিলের হার এখন সবচেয়ে বেশি। মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীদের কষ্টার্জিত অর্থ এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ না করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
নতুন শিক্ষার্থী ভিসা দেওয়া কি একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে?
না। প্রথম সারির সরকারি ও মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যোগ্যতা অনুযায়ী প্রকৃত শিক্ষার্থীরা এখনো নিয়মিত ভিসা পাচ্ছেন। অর্থাৎ ভিসা বন্ধ হয়নি, ছাঁটাই করা হচ্ছে অনিয়মিত ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে আসা আবেদনকারীদের।
প্রায় আড়াই হাজার ডলারের অস্বাভাবিক ভিসা আবেদন ফি কি ফেরতযোগ্য?
ভিসা বাতিল হলে এই পুরো ফি বাজেয়াপ্ত হয়। তাই মোহাম্মদ নিজামউদ্দীনের পরামর্শ হলো, শিক্ষাগত যোগ্যতা, তহবিলের স্বচ্ছতা এবং ইংরেজির দক্ষতায় কোনো ঘাটতি থাকলে অস্ট্রেলিয়ায় ফাইল জমা দেওয়ার মতো আর্থিক ঝুঁকি নেওয়া কোনোভাবেই ঠিক হবে না।
অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরত শিক্ষার্থীরা কি দেশটিতে থাকা অবস্থায় আর ভিসা বদলাতে পারবেন না?
সাধারণ ক্ষেত্রে ভিসা হপিং বন্ধ হলেও নির্দিষ্ট কিছু ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। যেমন বর্তমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মূল কোর্সের মেয়াদ ১২ মাস বাকি থাকলে, কিংবা উচ্চতর ডিগ্রি (স্নাতক শেষে স্নাতকোত্তর বা পিএইচডি) এবং সরকারি বৃত্তিপ্রাপ্ত হলে অস্ট্রেলিয়ার ভেতর থেকেই আবেদন করার সুযোগ বলবৎ আছে।
পরিবার বা স্বামী-স্ত্রী (স্পাউস) নিয়ে আসার নিয়মে কী পরিবর্তন এসেছে?
শিক্ষার্থী ভিসার ক্ষেত্রে আগের মতো সহজে পরিবারের সদস্য যোগ করার পথ সংকুচিত করা হয়েছে। মূল ভিসা অনুমোদনের পর নতুন করে নির্ভরশীল সদস্য যুক্ত করার সুযোগ কঠোরভাবে সীমিত করা হয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে না। ২ অক্টোবর থেকে নতুন নিয়মে পরিবারের সদস্য আনার সুযোগ সীমিত। ব্যতিক্রম শুধু পিএইচডি শিক্ষার্থী, সরকারি বৃত্তিধারী এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য। বাংলাদেশ এই তালিকায় নেই। নিজামউদ্দীনের পরামর্শ, পরিবার নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে আগে নিয়মের ব্যতিক্রমে পড়েন কি না যাচাই করুন।
অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে কোর্স বা প্রতিষ্ঠান বদলানো যাবে?
এখন অনেক কঠিন। মূল কোর্স শুরুর প্রথম ১২ মাস প্রতিষ্ঠান বদল চলবে না। উচ্চশিক্ষা থেকে কারিগরি কোর্সে যাওয়াও বন্ধ। ২০২৭ সালের জুলাই থেকে বদলাতে হলে আলাদা ভিসা লাগবে। সুতরাং প্রথমবারেই ঠিক কোর্স আর ঠিক প্রতিষ্ঠান বেছে নিন।
অন্য অস্থায়ী ভিসায় গিয়ে পরে শিক্ষার্থী ভিসা নেওয়ার পথ কি খোলা?
না। কর্মজীবী ছুটি, প্রশিক্ষণ, নিয়োগকর্তা-প্রযোজ্য বা অন্য অস্থায়ী ভিসায় থাকা কেউ অস্ট্রেলিয়ার ভেতর থেকে আর শিক্ষার্থী ভিসার আবেদন করতে পারবেন না। এক ভিসা থেকে আরেক ভিসায় ঘুরে দেশে থাকার মেয়াদ বাড়ানোকে সরকার ‘ভিসা হপিং’ বলছে এবং এই পথ বন্ধ করেছে।
পড়া শেষে কাজের ভিসা কি থাকবে?
আপাতত আছে, কিন্তু সেটিও নিরাপদ নয়। স্নাতক-পরবর্তী অস্থায়ী কাজের ভিসার ফিও এবার বেড়েছে। বিরোধী জোট ক্ষমতায় এলে এই ভিসা প্রায় তুলে দেওয়ার কথা বলছে। নিজামউদ্দীনের পরামর্শ, শুধু পড়া শেষের কাজের ভিসার ওপর ভরসা করে পরিকল্পনা সাজাবেন না। পড়াশোনার মানের ওপর জোর দিন, কারণ দক্ষতা থাকলে ভবিষ্যতে যেকোনো পথ খোলা থাকে।
তাড়াহুড়া করে কোনো সাধারণ কোর্সে ভর্তি হওয়া কি নিরাপদ?
কিছু অসাধু এজেন্ট ও প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের তাড়াহুড়া করে অননুমোদিত বা ঝুঁকিপূর্ণ কোর্সে ভর্তির প্ররোচনা দিচ্ছে। সহকারী মন্ত্রী জুলিয়ান হিল সতর্ক করেছেন, একসঙ্গে দুটি পূর্ণকালীন কোর্সে ভর্তি বা অসাধু উপায়ে ভিসার চেষ্টা করলে ভবিষ্যতে আজীবনের জন্য অস্ট্রেলিয়ার দরজা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
যাঁরা আবেদন করতে চান, তাঁদের করণীয় কী?
কোনো চটকদার বিজ্ঞাপনে কান না দিয়ে শুধু লেভেল-ওয়ান বা উচ্চমানের বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করুন। আপনার উদ্দেশ্য যে শুধুই পড়াশোনা, তা স্টেটমেন্ট অব পারপাস বা শিক্ষাসংক্রান্ত আবেদনে নিখুঁতভাবে প্রমাণ করুন।
সামনে কি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা আছে?
অস্ট্রেলিয়ার তীব্র শ্রমঘাটতি ও স্বাস্থ্য খাতের সংকট কাটাতে আন্তর্জাতিক মেধার বিকল্প নেই। সাময়িক এই নির্বাচনী উত্তেজনা ও প্রশাসনিক জট কেটে গেলে নিয়মগুলো আবারও স্বাভাবিক ধারায় ফিরতে পারে। তত দিন পর্যন্ত ধৈর্য ধরে সঠিক যোগ্যতা ও স্বচ্ছ তথ্য নিয়ে এগোলেই অস্ট্রেলিয়ায় পড়ার স্বপ্ন পূরণ করা সম্ভব।
লেখক: প্রথম আলোর সিডনি প্রতিনিধি ও অস্ট্রেলিয়ার নিবন্ধিত অভিবাসন পরামর্শক
