ইনানীতে ইকো-রিসোর্টে ৬ পর্যটক পুড়ে অঙ্গার
তদন্ত কমিটি দৈনিক সত্যকথা প্রতিদিনকে জানান, প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী রিসোর্টের রান্নাঘরের গ্যাস সিলিন্ডারের চুল্লি বা বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকেই এই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে
কক্সবাজার প্রতিনিধি: কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ইনানী সমুদ্রসৈকত সংলগ্ন পাটোয়ারটেক এলাকায় মেরিন ড্রাইভ সড়ক ঘেঁষে গড়ে ওঠা জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র টুপটুপ রেস্তোরাঁ ও রিসোর্টে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আজ শনিবার (১৭ অক্টোবর, ২০২৬) সকালের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় অন্তত ৬ জন পর্যটক জীবন্ত পুড়ে মারা গেছেন। এছাড়া অগ্নিদগ্ধ ও গুরুতর আহত হয়েছেন আরও ৭ জন, যাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
ঘটনার সূত্রপাত ও অগ্নিকাণ্ডের তীব্রতা
স্থানীয় বাসিন্দা ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, আজ ১৭ অক্টোবর সকাল আনুমানিক ৭টা ২৫ মিনিটে মেরিন ড্রাইভ সড়ক সংলগ্ন এই ইকো-স্টাইল রিসোর্টটিতে আগুনের সূত্রপাত হয়। ৩ তলা বিশিষ্ট এই রিসোর্টটি মূলত সম্পূর্ণ বাঁশ এবং কাঠ দিয়ে তৈরি একটি পরিবেশবান্ধব স্থাপনা ছিল। এর অবকাঠামো কাঠ ও বাঁশের হওয়ায় আগুন লাগার পর তা অত্যন্ত দ্রুত, মুহূর্তের মধ্যে পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে এবং রিসোর্টটি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। দুর্ঘটনার সময় রিসোর্টটিতে প্রায় ১৮ জন পর্যটক রাত্রিযাপন করছিলেন।
ফায়ার সার্ভিস ও বিজিবির উদ্ধার অভিযান
আগুন লাগার খবর পেয়ে উখিয়া ফায়ার স্টেশনের ৩টি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে রওনা হয়। স্টেশন থেকে দুর্ঘটনাস্থল প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগলেও সকাল ৮টা থেকে ফায়ার ফাইটাররা সরাসরি উদ্ধারকাজ ও আগুন নেভানোর কাজ শুরু করেন। আগুনের তীব্রতা বাড়ায় পরবর্তীতে উদ্ধার অভিযানে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের পাশাপাশি BGB-এর জওয়ানরাও যোগ দেন। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার সম্মিলিত ও একটানা চেষ্টার পর সকাল ১০টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে এবং বেলা ১১টার দিকে তা পুরোপুরি নির্বাপণ করা সম্ভব হয়।
হতাহতের বিবরণ ও পরিচয় শনাক্তকরণ
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উদ্ধারকারী দল ধ্বংসস্তূপের তল্লাশি অভিযানের সময় রিসোর্টের একটি কক্ষ থেকে ৪টি এবং পৃথক দুটি কক্ষ থেকে আরও ২টি পুড়ে যাওয়া মরদেহ উদ্ধার করে। নিহতদের দেহগুলো সম্পূর্ণ কয়লা হয়ে যাওয়ায় প্রাথমিকভাবে তাদের নাম-পরিচয় বা চেহারা চেনার কোনো উপায় নেই। এছাড়া রিসোর্টের বুকিং রেজিস্টার ও নথিপত্র আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ায় পর্যটকদের তাৎক্ষণিক তথ্য পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ডিএনএ টেস্টের সহায়তা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে, দগ্ধ ও আহত ৭ জনকে উদ্ধার করে দ্রুত উখিয়া হাসপাতাল ও কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ফায়ার সেফটি লাইসেন্স ও কর্তৃপক্ষের অবস্থান
এই টুপটুপ রিসোর্টের কোনো বৈধ ফায়ার সেফটি বা অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স ছিল না। এমনকি ঝুঁকিপূর্ণ কাঠের কাঠামোর কারণে গত জুন মাসেই রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল, যা তারা সম্পূর্ণ অবহেলা করেছে।
ভয়াবহ এই ঘটনার পরপরই রিসোর্টের মালিক, ম্যানেজার এবং অন্য কর্মচারীরা এলাকা ছেড়ে পালিয়েছেন। বর্তমানে উদ্ধার কাজ শেষ পর্যায়ে হলেও অবহেলাজনিত মৃত্যু ও লাইসেন্স ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণভাবে রিসোর্ট পরিচালনার অপরাধে মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে পুলিশ বাদী হয়ে একটি নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়েরের আইনি প্রক্রিয়া চালাচ্ছে এবং পলাতকদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু হয়েছে।
উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন
অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান, গাফিলতি নিরূপণ এবং সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি দৈনিক সত্য কথা প্রতিদিনকে জানান, প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী রিসোর্টের রান্নাঘরের গ্যাস সিলিন্ডারের চুল্লি বা বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকেই এই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। ছুটির দিনে মেরিন ড্রাইভের এই জনপ্রিয় পর্যটন স্পটে এমন ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে পুরো কক্সবাজার জেলাজুড়ে গভীর শোক ও আতঙ্ক নেমে এসেছে।
The post ইনানীতে ইকো-রিসোর্টে ৬ পর্যটক পুড়ে অঙ্গার appeared first on Daily Sotto Kotha Protidin.
