মেধা ও মননের বিকাশ, সৃজনশীলতার উন্মেষ এবং সুপ্ত প্রতিভার প্রকাশ—এই প্রত্যয়কে ধারণ করে নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চেইঞ্জেস স্কুলে গত ১০ অক্টোবর ২০২৬, শনিবার, অনুষ্ঠিত হয়েছে বিতর্ক, চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতা। শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আন্তরিক সহযোগিতা এবং অভিভাবকদের উপস্থিতিতে সকাল থেকেই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে উৎসবমুখর ও প্রাণচঞ্চল।
এ যেন ছিল মেধা, মনন ও সৃজনশীলতার এক বর্ণিল মিলনমেলা। কোথাও যুক্তির শাণিত উচ্চারণ, কোথাও রঙ-তুলির নিপুণ আঁচড়ে কল্পনার বিচিত্র প্রকাশ, আবার কোথাও শব্দের সুশৃঙ্খল বিন্যাসে ভাবনার মূর্ত প্রকাশ—প্রতিটি আয়োজনেই শিক্ষার্থীরা তুলে ধরে তাদের নিজস্ব প্রতিভা, আত্মবিশ্বাস ও সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর। প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে তারা যেমন নিজেদের যোগ্যতা প্রকাশের সুযোগ পেয়েছে, তেমনি অর্জন করেছে নতুন অভিজ্ঞতা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সুস্থ প্রতিদ্বন্দ্বিতার শিক্ষা।
বিতর্ক প্রতিযোগিতা:
প্রযুক্তির অগ্রগতি, নাকি মানবতার নতুন ফাঁদ?
“Technological Advancement Traps Humanity Rather Than Creating Perfect Society” ("টেকনোলজিক্যাল এডভান্সমেন্ট ট্র্যাপস হিউম্যানিটি রাদার দেন ক্রিয়েটিং পারফেক্ট সোসাইটি") —অর্থাৎ, “একটি আদর্শ সমাজ গড়ে তোলার পরিবর্তে প্রযুক্তির অগ্রগতি মানবতাকে ফাঁদে আবদ্ধ করে”—সমসাময়িক বিশ্বের এক গুরুত্বপূর্ণ ও চিন্তাজাগানিয়া বিষয়কে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হয় বিতর্ক প্রতিযোগিতা।
প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক জীবনে মানুষের অগ্রগতি, সামাজিক পরিবর্তন, মানবিক মূল্যবোধ এবং একটি আদর্শ সমাজ নির্মাণে প্রযুক্তির ভূমিকা নিয়ে দুই দলের অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের যুক্তি ও পাল্টাযুক্তি উপস্থাপন করে। তথ্য, বিশ্লেষণ ও বক্তব্যের দৃঢ়তায় বিতর্কের মঞ্চ হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। এ আয়োজন শিক্ষার্থীদের যুক্তিবাদী চিন্তা, তাৎক্ষণিক বিশ্লেষণ এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার গুরুত্বকে তুলে ধরে।
প্রতিযোগিতায় বিষয়ের পক্ষে অংশগ্রহণকারী দল বিজয়ী হয়। বিজয়ী দলের সদস্যরা হলো—অদ্রি, দোয়া, তাহসিন, তাজওয়ার ও সুস্মি। অন্যদিকে, বিপক্ষ দলে অংশ নেয় রামিসা, রাইফা, সাজিদ, মারিয়া ও সাবিহা। বিপক্ষ দলের সাবিহা তার বক্তব্য উপস্থাপনার দক্ষতা ও যুক্তিনির্ভর প্রকাশভঙ্গির স্বীকৃতিস্বরূপ অর্জন করে ‘বেস্ট স্পিকার’-এর সম্মাননা।
রচনা প্রতিযোগিতা:
মানুষের চিন্তা যখন শব্দের শরীর পায়, তখনই ভাবনার জগৎ হয়ে ওঠে প্রকাশের এক অনন্য মাধ্যম। রচনা প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীরা তাদের মননশীলতা, কল্পনাশক্তি ও লেখনীর দক্ষতা প্রকাশের সুযোগ পায়। ভাবনাকে সুসংবদ্ধ ভাষায় প্রকাশ করার এই প্রয়াসে বিজয়ীদের তালিকায় স্থান করে নেয়—
প্রথম স্থান: রেজোয়ানা রাইসা — দশম শ্রেণি, দ্বিতীয় স্থান: মাইশা বিনতে সিদ্দীক — অষ্টম শ্রেণি, তৃতীয় স্থান: ফাতেমা বিনতে রাফি — সপ্তম শ্রেণি, চতুর্থ স্থান: জায়ানা — ষষ্ঠ শ্রেণি, পঞ্চম স্থান: আফিফা — ষষ্ঠ শ্রেণি।
বিজয়ীদের এই অর্জন তাদের চিন্তার গভীরতা, অধ্যবসায় ও লেখনীর দক্ষতার পরিচয় বহন করে। একই সঙ্গে এ প্রতিযোগিতা শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস, ভাষাচর্চা এবং নিজস্ব চিন্তা প্রকাশের প্রতি আগ্রহী করে তোলার একটি কার্যকর ক্ষেত্র হিসেবে ভূমিকা রাখে।
চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা: রঙের ক্যানভাসে কল্পনার উড়ান
রঙেরও নিজস্ব ভাষা আছে—যে ভাষায় কখনো প্রকৃতি কথা বলে, কখনো স্বপ্ন ডানা মেলে, আবার কখনো শিশুমনের নিভৃত অনুভূতি হয়ে ওঠে দৃশ্যমান। চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীরা রঙ ও রেখার মেলবন্ধনে তাদের কল্পনা, শিল্পবোধ ও সৃজনশীলতার পরিচয় তুলে ধরে। সাদা কাগজের বুকে রঙের বিচিত্র বিন্যাসে প্রকাশ পায় তাদের নিজস্ব ভাবনার জগৎ।
মিড-সিনিয়র সেকশন
প্রথম স্থান: মাইশা ইসলাম ইলমা — সপ্তম শ্রেণি, দ্বিতীয় স্থান: মাহা — পঞ্চম শ্রেণি, তৃতীয় স্থান: হাফসা — সপ্তম শ্রেণি, চতুর্থ স্থান: সাবরিন — ষষ্ঠ শ্রেণি,
জুনিয়র সেকশন
প্রথম শ্রেণি
প্রথম স্থান: আরহী সাহা, দ্বিতীয় স্থান: আরাদ্রা সাহা, তৃতীয় স্থান: অর্ণি রয়
দ্বিতীয় শ্রেণি
প্রথম স্থান: সূর্য শেখর, দ্বিতীয় স্থান: উম্মে জাহান সিনহা
তৃতীয় শ্রেণি
প্রথম স্থান: আয়শা হক আনিসা, দ্বিতীয় স্থান: শ্রীনিথী মালাকার, তৃতীয় স্থান: নাবিহা রহমান
চতুর্থ শ্রেণি
প্রথম স্থান: তাসকিয়া আক্তার, দ্বিতীয় স্থান: মাভিশা মারিয়াম
প্রি-প্রাইমারি বিভাগ
শিশুদের সৃজনশীলতার বিকাশে প্রাথমিক স্তর থেকেই শিল্পচর্চার গুরুত্ব অপরিসীম। চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার প্রি-প্রাইমারি বিভাগেও ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছে।
প্লে গ্রুপ
প্রথম স্থান: আজওয়াড আওসাফ তাওহা, দ্বিতীয় স্থান: আনায়া ইরহা জায়নাব
নার্সারি
প্রথম স্থান: আনাবিয়া তাজরিয়ান, দ্বিতীয় স্থান: মুহাম্মদ আয়ান চৌধুরী
কেজি-ওয়ান
প্রথম স্থান: ফাতেমাতুজ জোহরা, দ্বিতীয় স্থান: আবরার হিশাম ফাইয়াজ, তৃতীয় স্থান: আরজা নান্দী
কেজি-টু
প্রথম স্থান: মোঃ সালমান ফার্সী, দ্বিতীয় স্থান: সাফরিন ফেরদৌস, তৃতীয় স্থান: দিপশা মন্ডল
সহশিক্ষা কার্যক্রম: পরিপূর্ণ মানুষ গড়ার অনন্য পাঠশালা
শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জন কিংবা পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করা নয়; বরং শিক্ষার্থীদের এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে তারা জ্ঞান, সৃজনশীলতা, যুক্তিবোধ, আত্মবিশ্বাস ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে পারে। শ্রেণিকক্ষের পাঠ তাদের জ্ঞানের ভিত্তি নির্মাণ করে, আর সহশিক্ষা কার্যক্রম সেই জ্ঞানকে বাস্তব অভিজ্ঞতা, সৃজনশীলতা ও আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে আরও পরিপূর্ণ করে তোলে।
চেইঞ্জেস স্কুলের এ আয়োজন শিক্ষার্থীদের সামনে তেমনই এক সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র উন্মোচন করেছে। বিতর্ক তাদের শিখিয়েছে যুক্তির আলোয় বিষয়কে বিশ্লেষণ করতে, রচনা শিখিয়েছে ভাবনাকে ভাষায় রূপ দিতে, আর চিত্রাঙ্কন দিয়েছে কল্পনাকে রঙিন প্রকাশে রূপান্তরিত করার স্বাধীনতা। এসব অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের মধ্যে শৃঙ্খলা, অধ্যবসায়, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সুস্থ প্রতিযোগিতার মানসিকতা গড়ে তুলতে সহায়ক।
চেইঞ্জেস স্কুলের এই আয়োজন তাই কেবল একটি প্রতিযোগিতার দিন নয়; এটি শিক্ষার্থীদের প্রতিভা বিকাশ, স্বপ্নের বিস্তার এবং আগামীর পথে আত্মবিশ্বাসী হয়ে এগিয়ে যাওয়ার এক অনুপ্রেরণাময় অধ্যায়।
প্রতিযোগিতায় বিজয়ী সব শিক্ষার্থীকে আন্তরিক অভিনন্দন এবং অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য রইল শুভকামনা। কারণ, সাফল্যের আনন্দ যেমন বিজয়ীর প্রাপ্য, তেমনি অংশগ্রহণের সাহস ও শেখার আগ্রহও সমানভাবে মূল্যবান। আজকের এই ক্ষুদে প্রতিযোগীরাই আগামী দিনের চিন্তাবিদ, শিল্পী, লেখক ও নেতৃত্বদাতা।
