কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকায় টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রায় সাত ঘণ্টা ধরে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে মরদেহগুলো উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস। এর মধ্যে পাঁচজনের মরদেহ পাওয়া যায় দোতলার একটি কক্ষের বিছানায়। একই কক্ষের ওয়াশরুমে পাওয়া যায় আরেকজনের মরদেহ। আর তিনতলার একটি ওয়াশরুমে একে অপরকে জড়িয়ে ধরা অবস্থায় পাওয়া যায় চারজনের মরদেহ।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, রিসোর্টটির বিভিন্ন অংশে কাঠ ও প্লাস্টিকের বোট থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এতে ভেতরে থাকা ব্যক্তিরা নিরাপদে বের হওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ পাননি। উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর অবস্থা এমন যে, সেগুলোর পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের তিনটি ইউনিট উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়। এর মধ্যে একটি ইউনিট উখিয়া ফায়ার স্টেশনের এবং অন্য দুটি কক্সবাজার ফায়ার স্টেশনের। কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন ও সিনিয়র স্টেশন কর্মকর্তা দোলন আচার্যের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালিত হয়।
ওয়াশরুমে একে অপরকে জড়িয়ে চারজন
কক্সবাজার ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন কর্মকর্তা দোলন আচার্য বলেন, তিনতলাবিশিষ্ট রিসোর্টটির নিচতলায় ছিল কর্মীদের থাকার কক্ষ ও রান্নাঘর। দোতলা ও তিনতলায় পর্যটকদের জন্য আটটি কক্ষ ভাড়া দেয়া হতো।
দোলন আচার্য বলেন, উদ্ধার অভিযানের শুরুতে দোতলার একটি কক্ষে বিছানার ওপর পাঁচজনের মরদেহ পাওয়া যায়। একই কক্ষের ওয়াশরুমে পাওয়া যায় আরেকজনের মরদেহ। তাদের কারও পরিচয় শনাক্ত করার মতো অবস্থা ছিল না।
দোতলার অভিযান শেষ করে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তিনতলায় যান। সেখানে একটি কক্ষে কাউকে পাওয়া যায়নি। তবে একটি ওয়াশরুমের ভেতরে একে অপরকে জড়িয়ে ধরা অবস্থায় চারজনের মরদেহ পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে একজন পুরুষ, দুজন নারী ও একটি শিশু ছিল।
দোলন আচার্যের ভাষ্য, তাদের মরদেহের অবস্থা দেখে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি থেকে ধারণা করা হচ্ছে, প্রাণ বাঁচাতে তারা ওয়াশরুমে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
কাঠ ও প্লাস্টিকের বোটে দ্রুত ছড়ায় আগুন
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা সাইফুল বলেন, রিসোর্টে কাঠ ও প্লাস্টিকের বোট থাকায় আগুন ভয়াবহ আকার ধারণ করে। তার মতে, ভবনের ছাদ ইটের ঢালাইয়ের হলে আগুনের এমন বিস্তার হতো কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, প্রায় সাত ঘণ্টার অভিযানে প্রথমে ছয়জনের এবং পরে আরও চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তিনি বলেন, ভবনে কাঠ ও বোটসহ বিভিন্ন দাহ্য পদার্থ থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ভেতরে থাকা ব্যক্তিরা বের হওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ পাননি। আগুন লাগার প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমে জানা যাবে।
উদ্ধার করা মরদেহগুলো স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধি ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের পর টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টটি ব্যবহার অনুপযোগী ঘোষণা করা হয় বলেও জানান ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা।
এর আগে শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল ৭টার দিকে মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন পাটুয়ারটেক এলাকার রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট সকাল ৮টার দিকে উদ্ধার ও আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ শুরু করে। সকাল ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। ফায়ার সার্ভিসকে সহযোগিতা করেন বিজিবি, পুলিশ ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা।
দুপুর ২টা পর্যন্ত ১০ জনের মরদেহ উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করেন কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসেন। তিনি জানান, রিসোর্টের সব কক্ষ তল্লাশি করা সম্ভব হয়নি।
নিহতদের মধ্যে ছয়জন একই পরিবারের সদস্য ও নিকটাত্মীয় বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকার বনশ্রীর বাসিন্দা মো. আশিকুল ইসলামের স্ত্রী, শ্যালিকাসহ পরিবারের সদস্যরা।
পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বৃহস্পতিবার রিসোর্টটিতে বেড়াতে আসেন ঢাকার বনশ্রীর বাসিন্দা মো. আশিকুল ইসলাম। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী ইসরাত জাহান মালিহা, শ্যালিকা লায়লা জাহান নাবিলাসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা।
