প্রীতম দাস::
চিকিৎসকের সংকট, শয্যার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি রোগী, নার্স ও অন্যান্য জনবলের ঘাটতি সব মিলিয়ে নাজুক অবস্থায় সুনামগঞ্জের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা। জেলা সদর হাসপাতালসহ জেলার ১২টি উপজেলায় চিকিৎসকের ৩৭১টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১১২ জন। শূন্য রয়েছে ২৫৯টি পদ, যা মোট পদের প্রায় ৭০ শতাংশ। ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পেতে ভোগান্তিতে পড়ছেন জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা রোগীরা।
সবচেয়ে বেশি চাপ সামলাতে হচ্ছে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালকে। হাসপাতালটিতে চিকিৎসকের ৭৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২৪ জন। শূন্য রয়েছে ৫০টি পদ। অথচ গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন আট থেকে নয় শতাধিক ভর্তি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে হাসপাতালসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এর বাইরে প্রতিদিন কয়েকশ রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসছেন।
শয্যা না পেয়ে অনেক রোগীকে হাসপাতালের মেঝে ও সিঁড়ির মুখে অবস্থান করে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। কোনো কোনো শয্যায় একাধিক রোগী থাকছেন। এর সঙ্গে বিভিন্ন ওয়ার্ডে পানির সরবরাহের সমস্যা ও বাথরুম ব্যবহারে ভোগান্তি যুক্ত হওয়ায় রোগী এবং তাঁদের স্বজনদের দুর্ভোগ আরও বাড়ছে।
সুনামগঞ্জের প্রায় ২৮ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম প্রধান ভরসা জেলা সদর হাসপাতাল। ২০০৯ সালে হাসপাতালটিকে ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। কিন্তু শয্যাসংখ্যা বাড়লেও প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবল নিয়োগ না হওয়ায় হাসপাতালটিকে প্রতিনিয়ত অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে হচ্ছে।
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসকের ৭৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ২৪ জন। ৫০টি মেডিকেল অফিসার পদের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ১২ জন। নার্সের ২৬৩টি পদের বিপরীতে কর্মরত ১৯৬ জন; শূন্য রয়েছে ৬৭টি পদ। এ ছাড়া মেডিকেল টেকনোলজিস্টসহ অন্যান্য কর্মীর ১৩৬টি পদের মধ্যে ১০৮টি পদই শূন্য।
চিকিৎসক ও নার্সের এই ঘাটতির মধ্যেই বিপুলসংখ্যক রোগীকে সেবা দিতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। ফলে চিকিৎসকপ্রতি রোগীর চাপ বাড়ছে, পাশাপাশি রোগীদের প্রয়োজনীয় সেবা পেতেও দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ সেবাপ্রত্যাশীদের।
হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের প্রায় অর্ধেক শিশু ও বয়স্ক বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অথচ শিশু রোগের চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র একজন। এ ছাড়া হৃদরোগ, দন্ত, নাক-কান-গলা, চক্ষু ও হাড়জোড়া বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় এসব রোগের চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের সংকটে পড়তে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে রোগ নির্ণয় ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রে রোগীদের বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য অনেককে অন্যত্র যাওয়ার প্রয়োজনও দেখা দিতে পারে। এতে সময় ও অর্থের বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে রোগী ও তাঁদের পরিবারের ওপর।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাঁদের স্বজনদের অভিযোগ, প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসক ও শয্যা কম থাকায় তাঁরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না। অনেককে শয্যা না পেয়ে মেঝেতে কিংবা চলাচলের জায়গায় থাকতে হচ্ছে। কোনো কোনো ওয়ার্ডে পানির সরবরাহ না থাকায় এবং বাথরুম ব্যবহার করতে না পারায় রোগীদের দুর্ভোগ আরও বাড়ছে।
তাঁদের মতে, সরকারি হাসপাতাল সাধারণ মানুষের চিকিৎসার প্রধান আশ্রয়স্থল। সেখানে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, শয্যা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা না গেলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়বেন দরিদ্র ও অসহায় রোগীরা। তাই চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগের পাশাপাশি হাসপাতালের অবকাঠামোগত সমস্যাগুলোও দ্রুত সমাধানের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ আলী আশরাফ সোহাগ বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্সের সংকট রয়েছে। প্রতিদিন আট থেকে নয় শতাধিক রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ভর্তি রোগীদের প্রায় অর্ধেকই শিশু। জনবল সংকট এবং শয্যার তুলনায় অতিরিক্ত রোগীর চাপ থাকলেও চিকিৎসাসেবা চালু রাখা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। পানির সরবরাহসহ হাসপাতালের কিছু সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে। জনবল সংকটের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. চৌধুরী জালাল উদ্দিন মুর্শেদ (রুমি) চিকিৎসক সংকটকে দীর্ঘদিনের সমস্যা উল্লেখ করে বলেন, জেলা সদর হাসপাতালসহ জেলার ১২টি উপজেলায় চিকিৎসকের মোট ৩৭১টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১১২ জন। ফলে বিপুলসংখ্যক পদ শূন্য রয়েছে।
তিনি রোগীদের উদ্দেশে বলেন, ডেঙ্গু কিংবা অন্য কোনো রোগের উপসর্গ দেখা দিলে নিজেরা চিকিৎসা না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে যেতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হবে।
জেলার ১২টি উপজেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকের ২৫৯টি পদ শূন্য থাকার চিত্র সুনামগঞ্জের স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে জেলা সদর হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞের ঘাটতি পূরণ না হলে রোগীর চাপ সামলানো এবং মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
চিকিৎসক ও নার্সের শূন্য পদ পূরণ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ, শয্যা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম বাড়ানো এবং পানি ও শৌচাগারের সমস্যার সমাধানে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ চান রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা। তাঁদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে সুনামগঞ্জের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবার সংকট কমবে এবং সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
