কক্সবাজারের উখিয়ায় টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকা-ে ১০ পর্যটকের মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা বলে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বরং এটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দীর্ঘদিনের অবহেলা, দুর্বল তদারকি ও আইন প্রয়োগের ব্যর্থতার নির্মম পরিণতি। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যেখানে সর্বোচ্চ সতর্কতা থাকার কথা, সেখানে অগ্নিনিরাপত্তার ন্যূনতম ব্যবস্থা ছাড়াই চলছে হোটেল-রিসোর্টের ব্যবসা। আরও উদ্বেগজনক হলো, এত বড় একটি দুর্ঘটনায় এত এত প্রাণহানির ঘটনা ঘটার পরও আশপাশে অনুমোদনহীন রিসোর্ট নির্মাণের কাজ অব্যাহত রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, আর কত মানুষের প্রাণহানি ঘটলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে?
দেশের একাধিক গণমাধ্যমের প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কক্সবাজার জেলায় দুই হাজারের বেশি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে। অথচ অগ্নিনিরাপত্তার সনদ রয়েছে মাত্র ১১৫টি প্রতিষ্ঠানের এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র রয়েছে, মাত্র ৪৪টি। এত বিপুলসংখ্যক পর্যটকের আবাসনকেন্দ্রে নিরাপত্তার এমন ঘাটতি ভয়াবহ ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়। আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো, টুপটুপ রিসোর্টকে পরিবেশ অধিদপ্তর বন্ধের নোটিশ দিয়েছিল, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ দুই দফা উচ্ছেদের নোটিশ দিয়েছিল এবং ফায়ার সার্ভিসও সতর্ক করেছিল। কিন্তু এসব নোটিশের কোনো তোয়াক্কা করেনি রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ। প্রশ্ন হলো, তাহলে এসব সতর্কবার্তা কার্যকর হলো না কেন? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি কেবল নোটিশ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছে?
সরকারকে অবিলম্বে এ প্রশ্নগুলোর জবাব খুঁজতে হবে। টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকা-ের নিরপেক্ষ তদন্ত করে আগুনের কারণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ভূমিকা নির্ধারণ করতে হবে। রিসোর্টের মালিক ও ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি দায়িত্বে অবহেলাকারী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আনতে হবে। কারো গাফিলতি কিংবা অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু মামলা করে দায় সারলে চলবে না। বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে কক্সবাজারের সব হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও গেস্টহাউসে জরুরি ভিত্তিতে সমন্বিত অভিযান চালাতে হবে। অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি নির্গমনপথ, ভবন নির্মাণের অনুমোদন এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র যাচাই করতে হবে। গুরুতর নিরাপত্তা ঘাটতি থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখতে হবে। অনুমোদনহীন নির্মাণ বন্ধের পাশাপাশি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা ব্যাবসায়িক স্বার্থের কাছে প্রশাসনের নতি স্বীকার করা চলবে না।
কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের বিকাশ জরুরি, কিন্তু মানুষের জীবন ও পরিবেশ ধ্বংস করে নয়। জরিমানা, নোটিশ ও মামলার পরও যদি অবৈধ ব্যবসা চলতে থাকে, তবে সেই প্রশাসনিক পদক্ষেপের কার্যকারিতা কোথায়? প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ও নিরাপত্তার অবস্থা যাচাইযোগ্য করে প্রকাশ করতে হবে এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারকে মনে রাখতে হবে, মানুষের জীবন ব্যাবসায়িক মুনাফার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান এবং আইন সবার জন্য সমান। অবৈধ রিসোর্টের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে, দায়িত্বে অবহেলাকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং কক্সবাজারের পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকাকে রক্ষায় কঠোর অবস্থান নিতে হবে। তার জন্য যেন আর কোনো প্রাণহানির অপেক্ষা করতে না হয়। দ্রুত কার্যকর অভিযান, নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থাই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।