ওভিয়েদোর রাস্তায় হাজারো মানুষের উচ্ছ্বাস, রাজকীয় মঞ্চে বিশেষ সম্মাননা। স্পেনে লিওনেল মেসির প্রত্যাবর্তন যেন পরিণত হয়েছিল এক উৎসবে! ফুটবলীয় কীর্তির পাশাপাশি মানবিক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি হিসেবে প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস ক্রীড়া পুরস্কার গ্রহণ করে নতুন ইতিহাস গড়েছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। আর তার এই অর্জনে আবেগঘন অভিনন্দন জানিয়েছে সাবেক ক্লাব বার্সেলোনা।
স্পেনের ওভিয়েদো শহরের ক্যাম্পোআমোর থিয়েটারে প্রিন্সেস লিওনরের হাত থেকে ২০২৬ সালের মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার গ্রহণ করেন মেসি। ব্যক্তিগতভাবে এই সম্মান পাওয়া প্রথম ফুটবলার তিনি। পুরস্কার গ্রহণের মধ্য দিয়ে ফুটবল ইতিহাসে নিজের অবস্থানের পাশাপাশি মাঠের বাইরের অবদানও নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করলেন ৩৯ বছর বয়সী এই তারকা।
মেসিকে ঘিরে ওভিয়েদোর উন্মাদনা ছিল চোখে পড়ার মতো। কিংবদন্তিকে একনজর দেখতে শহরের রাস্তায় ভিড় করেন হাজারো মানুষ। ব্যাগপাইপ ও ড্রামের বাজনা, আর্জেন্টিনার জার্সি পরা সমর্থকদের উল্লাস আর উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছান তিনি। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম ‘এএস’-এর দাবি, মেসিকে ঘিরে কয়েক দিনের এই উন্মাদনা ২০২৩ সালে হলিউড কিংবদন্তি মেরিল স্ট্রিপের সফরকেও ছাড়িয়ে গেছে।
এই আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মেসি। বর্ণাঢ্য ফুটবল ক্যারিয়ারের পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে তার অবদানকে গুরুত্ব দিয়েছে পুরস্কারটির জুরিবোর্ড। গত জুনে তাকে বিজয়ী ঘোষণা করার সময় জুরিরা মেসিকে ‘সর্বকালের সবচেয়ে সফল ফুটবলার’ হিসেবে অভিহিত করার পাশাপাশি তার সামাজিক কর্মকাণ্ডেরও প্রশংসা করেন।
পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে মেসিকে নিয়ে বিশেষভাবে কথা বলেন প্রিন্সেস লিওনর। তার বক্তব্যে উঠে আসে ফুটবলের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ঐক্য তৈরিতে মেসির অসাধারণ ক্ষমতা।
প্রিন্সেস লিওনর বলেন, ‘জানি না আর কোনো কিংবদন্তি সবাইকে একই অনুভূতিতে গাঁথতে পেরেছেন কি না। একটি মুহূর্ত, গোলের জন্য সবাই যখন অপেক্ষা করে, তখন সবাইকে এক সূত্রে গাঁথা হয়ে যায়। এ কারণেই মেসির দিকে এবং তার অতুলনীয় ক্যারিয়ারে তাকানোটা অর্থবহ। এটি আমাদের সামনে আর্জেন্টাইন ফুটবলারের এক দারুণ সংজ্ঞা তুলে ধরে। স্পোর্তিং গিহনের এক সাবেক খেলোয়াড় বলেন, “তিনি মুহূর্তের দশ ভাগের এক ভাগে সবচেয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং অহংকারকে ছাপিয়ে দলগত চেতনাকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন।”’
সম্মাননা পাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামেও নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন মেসি। তিনি লেখেন, ‘ক্রীড়াক্ষেত্রে প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস অ্যাওয়ার্ড পাওয়াটা দারুণ সম্মানের। সব পুরস্কারজয়ীকে অভিনন্দন, আপনাদের সবার সঙ্গে দেখা হয়ে দারুণ সময় কেটেছে।’
মেসির এই অর্জনে সবচেয়ে আবেগী প্রতিক্রিয়াগুলোর একটি এসেছে তার সাবেক ক্লাব বার্সেলোনার কাছ থেকে। কাতালান ক্লাবটির হয়ে ১৭ মৌসুম কাটানো এই কিংবদন্তিকে অভিনন্দন জানিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বিবৃতি প্রকাশ করেছে বার্সা। সেখানে তার প্রতিভা, অবদান ও দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা স্মরণ করেছে ক্লাবটি।
বার্সেলোনা লিখেছে, ‘২০২৬ সালের প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস ক্রীড়া পুরস্কার জেতায় লিও মেসিকে অভিনন্দন। তোমার অসাধারণ প্রতিভার যথার্থ স্বীকৃতি এটি। মাঠে ও মাঠের বাইরে তোমার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে গেছে। খেলাটির প্রতি তোমার উৎকর্ষ, অঙ্গীকার ও সংহতির কারণে তুমি বিশ্ব ফুটবলের এক মানদণ্ডে পরিণত হয়েছ।’
শুধু অভিনন্দন জানিয়েই থামেনি বার্সেলোনা। মেসির ক্যারিয়ারে নিজেদের অবদানের পাশাপাশি তার সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ককে ক্লাবের ঐতিহ্যের অংশ হিসেবেও উল্লেখ করেছে তারা। বিবৃতিতে আরও লেখা হয়েছে, ‘তোমার অত্যন্ত সফল ক্যারিয়ারে এফসি বার্সেলোনা ছিল তোমার জীবন ও পথচলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই অবিচ্ছেদ্য বন্ধন ক্লাবের উত্তরাধিকারের অংশ। আর এই বন্ধনের সঙ্গে তোমার সম্পৃক্ততা সব সময়ই আমাদের গর্বের উৎস হয়ে থাকবে।’
মাত্র ১৩ বছর বয়সে বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়া একাডেমিতে যোগ দিয়েছিলেন মেসি। ২০০০ সালে ক্লাবটির বয়সভিত্তিক দলে শুরু হওয়া সেই যাত্রা শেষ হয় ২০২১ সালে। এর মধ্যে বার্সেলোনার মূল দলে কাটিয়েছেন ১৭টি মৌসুম। ক্লাবটির হয়ে জিতেছেন অসংখ্য শিরোপা, গড়েছেন একের পর এক রেকর্ড। লা লিগা থেকে চ্যাম্পিয়নস লিগ-সাফল্যের প্রায় সব শিখরই ছুঁয়েছেন কাতালানদের জার্সিতে!
বার্সেলোনা ছেড়ে প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ে দুই বছর কাটানোর পর বর্তমানে ইন্টার মায়ামিতে খেলছেন মেসি। বিদায়ের সময় বার্সেলোনার সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হলেও সময়ের ব্যবধানে সেই দূরত্ব অনেকটাই মুছে গেছে। ক্লাবটির সাম্প্রতিক বিবৃতিতে তাই ফুটে উঠেছে পুরোনো সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
পুরস্কার ঘিরে অবশ্য বিতর্কও কম হয়নি। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে আর্জেন্টিনার হারের পর স্পেনে মেসির এই সম্মান প্রত্যাহারের দাবিতে আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু সেই বিরোধিতা উপেক্ষা করেই পুরস্কার প্রদানকারী ফাউন্ডেশন বিজয়ীদের তালিকায় তার নাম বহাল রাখে। মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতা যে একজন খেলোয়াড়ের সামগ্রিক অবদানকে মুছে দিতে পারে না, এই সিদ্ধান্তে যেন সেই বার্তাই স্পষ্ট হয়েছে।
পুরস্কার গ্রহণের পর স্পেন ছাড়ার আগে রাজকীয় সংবর্ধনাতেও অংশ নেন মেসি। স্থানীয় সময় দুপুর সাড়ে ১২টায় অন্য বিজয়ীদের সঙ্গে কোভাদোঙ্গা কক্ষে ঐতিহ্যবাহী এই আয়োজনে যোগ দেন তিনি। এবারই প্রথম রাজা ও রানি ছাড়াই এককভাবে এই সংবর্ধনার আয়োজন করেন প্রিন্সেস লিওনর।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্পেন জাতীয় ফুটবল দলের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে মেসির আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল স্পেন। সেই প্রতিপক্ষের অধিনায়ককে এবার প্রশংসায় ভাসিয়েছেন স্পেন কোচও।
মেসিকে নিয়ে দে লা ফুয়েন্তে বলেন, ‘খেলাধুলা ও ফুটবলে মেসি যে ঐতিহ্য রেখে যাচ্ছেন, তা ব্যতিক্রমী। একজন মানুষ ও খেলোয়াড় হিসেবে তিনি বহু মূল্যবোধের এক অসাধারণ উদাহরণ।’
১৯৮১ সালে যাত্রা শুরু করা প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস পুরস্কার স্প্যানিশভাষী বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা। এর সঙ্গে দেওয়া হয় ৫০ হাজার ইউরো প্রাইজমানি। মানবিক সহাবস্থান, সংহতি ও বৈশ্বিক সহযোগিতা এগিয়ে নিতে শিল্পকলা, বিজ্ঞান ও ক্রীড়াসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই পুরস্কার দেওয়া হয়।
এর আগে ক্রীড়াক্ষেত্রে এই সম্মাননা পেয়েছেন সেরেনা উইলিয়ামস, রাফায়েল নাদাল, এলিয়ুদ কিপচোগে ও লিন্ডসে ভনের মতো কিংবদন্তিরা। সেই তালিকায় এবার যুক্ত হলো মেসির নাম!
