ফ্রান্সজুড়ে সপ্তাহান্তে দাঙ্গা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় সৃষ্ট পরিস্থিতি পর্যালোচনায় সোমবার মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠক করছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু। আধুনিক ফ্রান্সের ইতিহাসে জনশৃঙ্খলা ভঙ্গের অন্যতম গুরুতর ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এই সহিংসতা।
সোমবার সকালে ফরাসি প্রেসিডেন্টের সরকারি দপ্তর এলিসি প্রাসাদ জানায়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ তাঁকে পদত্যাগের পরিবর্তে দেশের রাস্তাঘাটের নিরাপত্তা বাড়ানোর উপায় খুঁজে বের করতে এবং সপ্তাহান্তের সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতে বলেছেন।
শনিবার জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং মানসম্মত সরকারি সেবার সুযোগ কমে যাওয়ার প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ বিক্ষোভ করেন। তাঁদের অধিকাংশের কর্মসূচি ছিল শান্তিপূর্ণ। সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার মান ও সুযোগ-সুবিধা নিয়েও ক্ষোভ ছিল বিক্ষোভকারীদের মধ্যে। তবে পরে কালো পোশাক ও মুখোশ পরা কিছু কর্মী এবং ভাঙচুরকারীর উপস্থিতিতে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে।
আনুমানিক দেড় হাজার দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট ও ভাঙচুর চালানো হয়। দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে এবং জলকামান ব্যবহার করে। কয়েকটি স্থানে পুলিশকে লাঠি দিয়ে লোকজনকে আঘাত করতেও দেখা যায়। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার প্রায় এক হাজার পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সাতজনের অবস্থা গুরুতর।
শনিবারের নির্ধারিত একাধিক বিক্ষোভ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতির ঘাটতি এবং পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন না করার অভিযোগ উঠেছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজের বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, কয়েকটি শ্রমিক সংগঠন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাঁর ভূমিকার সমালোচনা করা হয়েছে।
ফরাসি পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের প্রেসিডেন্ট ইয়ায়েল ব্রাউন-পিভে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও পরিস্থিতি কীভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেল, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরুর আহ্বান জানিয়েছেন।
রোববার রাতে প্যারিসের ভাঙচুর হওয়া কয়েকটি দোকানের পাশের দেয়ালে লাল রঙে লেখা একটি বাক্য চোখে পড়ে—‘আলোর নগরী অন্ধকারে’। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসকে ‘আলোর নগরী’ বলা হয়।
সহিংসতা থামাতে ফ্রান্সের বিভিন্ন এলাকায় সাময়িক কারফিউ জারি কিংবা জরুরি অবস্থা ঘোষণার গুঞ্জন ছড়িয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত রোববার টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট মাখোঁ জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনার আশ্বাস দেন তিনি।
তবে ফরাসি সংবাদমাধ্যমে মাখোঁর বক্তব্যের সমালোচনা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, ভাষণে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়নি।
এখন কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের কীভাবে বিচারের আওতায় আনা হবে? শহর ও জনবসতিতে নিরাপত্তা কীভাবে বাড়ানো হবে? ধ্বংস হওয়া ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষতিপূরণ কীভাবে দেওয়া হবে? আর সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা কবে শুরু হবে?
গত মাসে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ থেকেই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছিল। রোববার ফ্রান্সের শ্রমিক সংগঠন সিজিটি-র মহাসচিব সোফি বেনে অভিযোগ করেন, মাখোঁ শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি সেবার মান কমে যাওয়ার বিষয়গুলো যথাযথভাবে আমলে নেননি।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, এসব সমস্যা মোকাবিলার দায়িত্ব এখন প্রধানমন্ত্রী লেকর্নুর ওপর এসে পড়েছে। ফ্রান্সে মাখোঁকে অনেকেই মেয়াদ শেষের দিকে থাকা দুর্বল রাজনৈতিক অবস্থানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখছেন। আগামী প্রায় ছয় মাসের মধ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা। এরই মধ্যে তাঁর উত্তরসূরি হওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।
অভিবাসনবিরোধী জাতীয়তাবাদী ডানপন্থী নেতা মারিন ল্য পেন এবং পুঁজিবাদবিরোধী বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশো—দুই শিবিরই রাজনৈতিক বিতর্কে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন। এতে রাজনীতি ও রাজপথ—দুই ক্ষেত্রেই উত্তেজনা বাড়ছে।
ফ্রান্সের পার্লামেন্টও গভীরভাবে বিভক্ত। তিনটি প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যে মতবিরোধের কারণে আইন প্রণয়ন কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক সংকটের পাশাপাশি ঋণের চাপও ফ্রান্সের সরকারের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। দেশটির সরকারি ঋণ দ্রুত বাড়তে থাকায় বিনিয়োগকারীরা তা নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সরকারের ওপর চাপ দিচ্ছেন। কিন্তু সরকারি সেবা বা সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় কমালে আরও বেশি মানুষ বিক্ষোভে যোগ দিতে পারেন—এমন আশঙ্কাও রয়েছে সরকারের।
শনিবারের সহিংসতায় আতঙ্কিত ফরাসি নাগরিকদের মধ্যে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কাঁদানে গ্যাসে আচ্ছন্ন শহর, নির্বিঘ্নে লুটপাটের দৃশ্য এবং জ্বলতে থাকা সরকারি ভবনের ছবি জনমনে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
তবে সাধারণ মানুষের অভিযোগ, ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তা নিয়ে তাঁদের উদ্বেগের বিপরীতে রাজনৈতিক নেতারা একে অপরকে দোষারোপ করতেই বেশি ব্যস্ত।
তিন সন্তানের বাবা ও শিক্ষক এদুয়ার বলেন, আমরা যখন নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন, তখন তাঁরা এই পরিস্থিতিকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগের রাজনৈতিক লড়াইয়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন।
শনিবারের সহিংসতার জন্য মাখোঁ ও প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠী ও অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদের দায়ী করেছেন। অন্যদিকে বামপন্থী নেতা মেলঁশো সরকারের ‘অযোগ্যতার’ অভিযোগ তুলেছেন। জাতীয়তাবাদী ডানপন্থী নেতা মারিন ল্য পেন এক ভিডিও বার্তায় মাখোঁ প্রশাসনকে ‘শক্তিহীন, ক্লান্ত ও দিশাহীন’ বলে সমালোচনা করেছেন।
নভেম্বরের বিক্ষোভ নিয়ে উদ্বেগ
ফরাসি কর্তৃপক্ষ আগামী দুই সপ্তাহ পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত থাকবে বলে আশা করছে। সোমবার থেকে শিক্ষার্থীদের মধ্যবর্তী ছুটি শুরু হওয়ায় বিক্ষোভের চাপ সাময়িকভাবে কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে আগামী ৫ নভেম্বর বড় ধরনের বিক্ষোভের ঘোষণা দিয়েছে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন এবং ২০১৮ সালে মাখোঁর প্রথম মেয়াদে এক বছরের বেশি সময় ধরে আন্দোলন চালানো ‘ইয়েলো ভেস্ট’ বা হলুদ জ্যাকেট আন্দোলনের বিভিন্ন অংশ।
ফলে ফ্রান্সের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা নিয়ে দেশজুড়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
