ইউক্রেনের ড্রোনসহ কিছু অস্ত্রের গতি সীমিত করার পেছনে মার্কিন সরকার থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন স্পেসএক্স-এর প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক। নতুন এই বিধিনিষেধের কারণে নির্দিষ্ট গতির বেশি চললে অস্ত্রগুলো স্পেসএক্সের স্টারলিংক ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগ হারাচ্ছে।
ইউক্রেন রুশ লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন হামলা ও নিজেদের আকাশসীমা রক্ষায় স্পেসএক্স-এর স্টারলিংক ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে আসছে। তবে মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাতে ইউক্রেন অভিযোগ করে যে, নতুন কিছু গতির সীমা আরোপ করায় তাদের সামরিক অভিযান ব্যাহত হচ্ছে।
দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির এক উপদেষ্টার মতে, এই বিধিনিষেধগুলো কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয় বরং এটি কিয়েভ ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।
ইলন মাস্ক জানান, স্টারলিংকের সামরিক-স্তরের সহযোগী পরিষেবা স্টারশিল্ড মার্কিন সরকারের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ফলে এর গতি বা ব্যবহারের ওপর যেকোনো বিধিনিষেধের সিদ্ধান্ত নেয় মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং চূড়ান্তভাবে এটি মার্কিন প্রেসিডেন্টের মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়।
ইউক্রেনের কর্মকর্তারা সংযোগ পুনরায় চালু করার আহ্বান জানানোর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এসব মন্তব্য করেন মাস্ক।
ইলন মাস্কের স্পেসএক্স কোম্পানির মালিকানাধীন স্টারলিংক মঙ্গলবার রাতে গতিসীমা কমিয়ে ঘণ্টায় ১০০ মাইল (১৬০ কিমি/ঘণ্টা) করে দেয়; যার অর্থ হলো, এর চেয়ে বেশি গতিতে চলা যেকোনো অস্ত্র নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলে।
ইউক্রেনের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভ জানান, বুধবার (১৪ অক্টোবর) সন্ধ্যা নাগাদ সংযোগ আংশিকভাবে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।
এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, “ইউক্রেনের প্রতিরক্ষার জন্য স্টারশিল্ডের গতিসীমা পুরোপুরি তুলে দেওয়া এখন অত্যন্ত জরুরি।” ওই পোস্টে ইলন মাস্ককে ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি তার অব্যাহত সহযোগিতাও চান তিনি।
প্রায় এক ঘণ্টা পর ওই পোস্টের জবাব দেন মাস্ক। সেখানে তিনি তার প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে লেখেন, “স্টারশিল্ড সিস্টেম মার্কিন সরকারের মালিকানাধীন এবং তাদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। এর গতি বা ব্যবহারের ওপর যেকোনো বিধিনিষেধের সিদ্ধান্ত নেয় মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট।”
এ বিষয়ে মার্কিন সরকার এখনো কোনো মন্তব্য করেনি।
স্টারলিংক ও স্টারশিল্ড, দুটোই মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের। তবে এগুলোর উদ্দেশ্য আলাদা। স্টারলিংক হলো একটি বেসামরিক ইন্টারনেট সেবা, যা পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেট সংযোগ দেয়। বিশেষ করে দুর্গম এলাকায় এই সেবা গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, স্টারশিল্ড তৈরি করা হয়েছে সরকারি ও সামরিক ব্যবহারের জন্য।
মঙ্গলবার রাতে স্টারলিংকের ওপর এই বিধিনিষেধ এমন এক সময়ে আরোপ করা হয়, যখন ইউক্রেনে প্রাণঘাতী হামলা চালায় রাশিয়া।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, কিয়েভে এসব হামলায় বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছেন। জেলেনস্কি এই হামলাকে রাশিয়ার চালানো অন্যতম ভয়াবহ হামলা হিসেবে অভিহত করেন। তিনি বলেন, “উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। তবে কিছু ড্রোন আঘাতও হেনেছে।” এসব হামলার পর ইউক্রেনজুড়ে অন্তত ছয় লাখ মানুষ বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
এদিকে, রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টা হামলা অব্যাহত রেখেছে ইউক্রেন।
জেলেনস্কি দাবি করেন, ট্রাম্পের প্রস্তাবিত জ্বালানি খাতে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সম্মত না হলে ইউক্রেনের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় সীমিত করার হুমকি দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে মঙ্গলবার এই অভিযোগ অস্বীকার করেন ট্রাম্প।
গত রবিবার (১১ অক্টোবর) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে বলেন, “তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হচ্ছে- রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যেকার যুদ্ধে একটি ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণা করা হলো। উভয় পক্ষই এতে সম্মত হয়েছে। কেউ তা ভঙ্গ করবেন না।”
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এরপর একাধিকবার জানান, মস্কো যদি ইউক্রেনের তেল শোধনাগার ও অন্যান্য জ্বালানি স্থাপগুলোতে হামলা বন্ধ করে, তাহলে কিয়েভও এ ধরনের হামলা বন্ধ করতে প্রস্তুত।
আর এতে দেশটির ওপর ক্রমেই বিরক্ত হয়ে উঠেছেন ট্রাম্প।
জেলেনস্কি দাবি করেন, ট্রাম্পের প্রস্তাবিত জ্বালানি খাতে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সম্মত না হলে ইউক্রেনের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় সীমিত করার হুমকি দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে মঙ্গলবার এই অভিযোগ অস্বীকার করেন ট্রাম্প।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওয়াশিংটন ও মস্কোর মধ্যে একটি জ্বালানি চুক্তির ঘোষণা দিয়েছেন।
বুধবার যুক্তরাজ্য সফরের সময় জেলেনস্কি স্বীকার করেন, রাশিয়ার কাছ থেকে তিন লাখ টন ডিজেল আমদানির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি করার পর তিনি নিজেকে বিশ্বাসঘাতকতার শিকার বলে মনে করেছিলেন।
ব্রিটিশ সাংবাদিক পিয়ার্স মরগান তাকে প্রশ্ন করেন, ওই ঘটনায় তিনি নিজেকে বিশ্বাসঘাতকতার শিকার বলে মনে করেছিলেন কি না।
জবাবে জেলেনস্কি বলেন, “আসলেই, হ্যাঁ। তবে বিষয়টি শুধু আমার আবেগ বা অনুভূতির চেয়ে কিছুটা বেশি জটিল।”
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই টানাপোড়েনের মধ্যেই যুক্তরাজ্য সফর করছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। ডাউনিং স্ট্রিটে তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম এবং তিনি রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন।
ইউক্রেনের আকাশ রক্ষায় রাশিয়ার ড্রোন ভূপাতিত করতে ব্যবহৃত হালকা ওজনের বহুমুখী ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ প্রক্রিয়া দ্রুততর করার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাজ্য। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জেলেনস্কিকে জানান, "আমরা আপনাদের পাশে আছি এবং এই অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হবে না।”
তথ্যসূত্র: বিবিসি
