দিনাজপুরের বীরগঞ্জ গোলাপগঞ্জে ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী আদিবাসী মেলায় উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেলাটিকে ‘বউ মেলা’ বা ‘জীবনসঙ্গী খোঁজার মেলা’ হিসেবে প্রচার করা হলেও বাস্তবে এর সঙ্গে এমন কোনো আয়োজনের সম্পর্ক নেই। বরং এটি সাঁওতালসহ বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের মিলনমেলা, যেখানে নিজেদের সংস্কৃতি, ভাষা, নাচ ও গান তুলে ধরেন তারা।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বিকেল ৩টা থেকে বীরগঞ্জের গোলাপগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। বিজয়া দশমীর পরদিন প্রতিবছর এ মেলার আয়োজন করা হয় বলে জানান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
দিনাজপুরের বিভিন্ন উপজেলা ও দূরদূরান্তে ছড়িয়ে থাকা আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ এ মেলায় অংশ নেন। দীর্ঘদিন পর আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ এবং পারস্পরিক সম্পর্কের বন্ধন দৃঢ় করাই এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
আদিবাসী নারী নেত্রী রিটা হেমব্রম বলেন, গত তিন বছর ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ঐতিহ্যবাহী মেলা নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। প্রচার করা হচ্ছে, এখানে কোনো মেয়েকে পছন্দ হলেই বিয়ে করা যায়। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। এ ধরনের প্রচারে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষের সম্মান ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং তাঁদের মধ্যে বিভক্তি তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
তিনি বলেন, পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রতিবছর বিজয়া দশমীর পরদিন এ মেলার আয়োজন করা হয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের পাশাপাশি সাঁওতাল নারী-পুরুষ ও তাঁদের আত্মীয়স্বজন এখানে আসেন। তাঁদের দেখা-সাক্ষাৎ, আনন্দ ভাগাভাগি এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য চর্চাই মেলার মূল উদ্দেশ্য।
সাঁওতাল সম্প্রদায়ের শ্যামলী মুর্মু বলেন, এ মেলায় ছেলে-মেয়েদের পছন্দের ভিত্তিতে বিয়ে দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হতে পারে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেভাবে প্রচার করা হচ্ছে, তার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। এ ধরনের অপপ্রচার একটি সম্প্রদায়কে ছোট করার শামিল।
নীলফামারী থেকে মেলায় ঘুরতে আসা জাকারিয়া পিন্টু বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেলাটিকে জীবনসঙ্গী খোঁজার বা বউ মেলা হিসেবে জেনেছিলেন। কিন্তু সরেজমিনে এসে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখেছেন। এখানে আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক আয়োজন ও মানুষের মিলন ঘটেছে। জীবনসঙ্গী খোঁজার মেলা হিসেবে প্রচারের কোনো বাস্তবতা তিনি দেখেননি।
মেলার আয়োজক বীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমা খাতুন বলেন, এটি আদিবাসীদের প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী মেলা। আদিবাসীদের ভাষা, নাচ, গান ও সংস্কৃতি তুলে ধরার পাশাপাশি তাঁদের ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং বিকাশের উদ্দেশ্যে প্রতিবছর এ আয়োজন করা হয়। মেলায় নারী ও পুরুষেরা পৃথকভাবে নিজেদের ভাষায় গান ও নৃত্য পরিবেশন করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিযোগিতারও আয়োজন থাকে।
তিনি আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেলাটিকে ‘বউ মেলা’ বা ‘জীবনসঙ্গী খোঁজার মেলা’ হিসেবে প্রচার করা হলেও এটি প্রকৃতপক্ষে আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও পারস্পরিক মিলনমেলার আয়োজন।
সুলতান মাহমুদ/এসএন
