প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বর্তমান সরকার শুধু যারা ভোট দিয়েছেন, তাদের নয়, যারা ভোট দেননি, তাদেরও সরকার হতে চায়। সব ধর্মের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তোলা এবং দেশের সব এলাকার সমান উন্নয়নে একসঙ্গে কাজ করতে চায় সরকার। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর পৌনে ১টার দিকে রংপুর মহানগরীর প্রেসক্লাব এলাকায় অবস্থিত ধর্মসভা রাধাগোবিন্দ মন্দিরে দুর্গাপূজা পরিদর্শন
শেষে বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান বলেন, ‘বর্তমান সরকার এমন একটি সরকার হতে চায়, এই সরকারকে যে ভোট দিয়েছে তারও সরকার হতে চায় এই সরকার, যে ভোট দেয়নি তার জন্যও এই সরকার সরকার হতে চায়।’
শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে মন্দির পরিদর্শনকালে প্রধানমন্ত্রী মন্দির কর্তৃপক্ষের হাতে ১০ লাখ টাকার অনুদানের চেক তুলে দেন। এ সময় তিনি পূজার্থী ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
তারেক রহমান বলেন, ‘এই দেশটি হাজার বছর ধরে সকল ধর্মের মানুষকে নিয়ে এগিয়ে চলছে, শান্তিতে আমরা সকলে মিলে বসবাস করছি। আমরা চাই বিগত হাজার বছর ধরে যেমন আমরা প্রত্যেকটি ধর্মের মানুষ এই দেশে শান্তিতে একসঙ্গে বসবাস করেছি, আগামী হাজার বছরও যাতে আমরা একসঙ্গে শান্তিতে বসবাস করতে পারি।’
সব ধর্মের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশ গড়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রিয় ভাইবোনেরা, আগামী দিনে আমরা যদি আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে চাই, তাহলে আমাদের সকল ধর্মমতের মানুষকে একসঙ্গে দেশের জন্য কাজ করে আমাদের প্রত্যাশিত সেই বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে হবে।’ নির্বাচনে কে সমর্থন দিয়েছেন আর কে দেননি, সেই পার্থক্য না করে সবার জন্য কাজ করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অর্থাৎ আমরা সকল এলাকা বা সকল মানুষের জন্য কাজ করতে চাই।’
অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়নের বৈষম্য কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারেক রহমান বলেন, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে সব এলাকায় সমবণ্টনের মাধ্যমে সমানভাবে উন্নয়ন করতে চান তারা। রংপুর মহানগরীর উন্নয়নে ইতোমধ্যে একটি বৈঠকে ১ হাজার ৮২৫ কোটি টাকার প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন তিনি।
স্থানীয় সরকারব্যবস্থার মাধ্যমে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘লোকাল গভর্মেন্টের মাধ্যমে জেলা পরিষদকে দিয়ে আমরা এই জেলা, এই জেলার রংপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলাগুলোতে, বিভিন্ন ইউনিয়নগুলোতে, বিভিন্ন গ্রামগুলোতে মানুষের প্রয়োজনে যে ইনফ্রাস্ট্রাকচার দরকার, ব্রিজ-কালভার্ট দরকার, স্কুল-কলেজ দরকার সেগুলো ইনশাআল্লাহ আমরা পর্যায়ক্রমিকভাবে গড়ে তুলব, যাতে মানুষ সকল প্রকার রাষ্ট্রের সকল সুযোগ-সুবিধা পেতে পারে।’
এসব উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই কাজগুলো যদি করতে হয়, তাহলে আমাদের সকলকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, ভেদাভেদকে ভুলে থাকতে হবে, একসঙ্গে হাত ধরে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।’
রাজনৈতিক মতপার্থক্য সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘যদি কিছু বলার থাকে, জনগণ সিদ্ধান্ত নিয়ে সংসদ গঠন করেছে, সেই সংসদে জনগণ তাদের প্রতিনিধিদেরকে পাঠিয়েছে। আপনাদের যদি কিছু বলার থাকে, যদি কিছু তুলে ধরার থাকে, আসুন আমরা সংসদে সেই কাজটি করি, সেই বিতর্কমূলক সেই সিদ্ধান্তটি জনগণের পক্ষে, জনগণ রাষ্ট্রের পক্ষে যেটি ভালো হবে সেই সিদ্ধান্ত আমরা গ্রহণ করি।’
দেশে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগ তুলে তারেক রহমান বলেন, আমরা দেখছি একটি মহল বিভিন্ন রকম বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে।’ মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দেখেছি অতীতে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধকে কোনো একটি দল বিতর্কিত করতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই ফলাফলটা খুব শুভ হয়নি, বাংলাদেশের মানুষ সেই ফলাফলটিকে বা সেই লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যটিকে ভালোভাবে গ্রহণ করেনি।’ ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ঠিক একইভাবে আমরা দেখেছি ২৪-এর যে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান, সেই গণ-অভ্যুত্থান থেকেও কোনো কোনো মহল বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে।’
মন্দিরের পেছনে নির্মাণাধীন একটি স্থাপনার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, সেখানে আর্থিকভাবে অসচ্ছল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিনামূল্যে থাকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। গ্রাম থেকে শহরে আসা ব্যক্তিদের আবাসনের সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে স্থাপনাটি নির্মাণ করা হচ্ছে।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার, বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক জয়ন্তু ?কুমার কুণ্ড, সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল, নিপুণ রায় চৌধুরী, ছাত্র দলের পার্থ দেব, গণেশ চন্দ্র রায় সাহস, রংপুর ধর্মসভার স্বপন কুমার ভুট্টচার্য প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
অনুষ্ঠানে মহিলা ও শিশুবিষয়কমন্ত্রী অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু ও মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদসহ রংপুরের সংসদ সদস্য ও জেলা নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি তারেক রহমানের প্রথম রংপুর সফর।
তারাগঞ্জ ও পাগলাপীরে পথসভা : এর আগে মঙ্গলবার সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে সামরিক বিমানে নীলফামারীর সৈয়দপুর বিমানবন্দরে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকে সড়কপথে রংপুরে যাওয়ার পথে তারাগঞ্জ ও পাগলাপীরে পথসভায় বক্তব্য দেন তিনি। ধর্মসভা রাধাগোবিন্দ মন্দিরে পৌঁছানোর সময় সড়কের দুই পাশে বিপুলসংখ্যক মানুষ তাকে স্বাগত জানান।
প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে রংপুর মহানগরীতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। পাশাপাশি গত পাঁচ দিন ধরে নগরের বিভিন্ন সড়কে পরিচ্ছন্নতা, সৌন্দর্যবর্ধন ও সংস্কারকাজ চলে।
রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কের পাগলাপীর থেকে মেডিক্যাল মোড় পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার সড়ক মেরামত করা হয়। এ ছাড়া নগরের ডিসির মোড় থেকে লালকুঠির মোড় পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ১৫০ মিটার সড়ক সংস্কার করা হয়। তবে প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে দ্রুত সংস্কারকাজ শেষ করায় এসব কাজের মান ও স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। রংপুরে কর্মসূচি শেষে একই দিনে রাজশাহী ও চট্টগ্রামের পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের কর্মসূচি ছিল প্রধানমন্ত্রীর।
