সগিরা গুনাহ অর্থ ছোট গুনাহ। যেসব গুনাহের ব্যাপারে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) সতর্ক করেছেন, কিন্তু কোনো শাস্তির কথা বলেননি, সেগুলোই সগিরা গুনাহ। যেকোনো কবিরা গুনাহের ভূমিকা বা প্রাথমিক কাজগুলো মূলত সগিরা গুনাহ। যেমন, জিনা বা ব্যভিচার করা কবিরা গুনাহ। কিন্তু বেগানা নারীর দিকে অনৈতিক দৃষ্টিতে তাকানো ব্যভিচারের দিকে নিয়ে যায়। তাই এই অনৈতিক দৃষ্টিপাত সগিরা গুনাহ।
নেক আমলের মাধ্যমে সগিরা গুনাহ ক্ষমা হয়ে যায়; এ ক্ষেত্রে তাওবার প্রয়োজন হয় না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যদি সেসব কবিরা গুনাহ পরিহার করো, যা থেকে তোমাদের বারণ করা হয়েছে, তাহলে আমি তোমাদের (সগিরা) গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেব এবং তোমাদের প্রবেশ করাব সম্মানজনক প্রবেশস্থলে।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৩১)
তবে বিভিন্ন কারণে ছোট ছোট গুনাহ কখনো বড় গুনাহে পরিণত হতে পারে। এমন ছয়টি কারণ রয়েছে।
গুনাহের ওপর অবিচল থাকা ও বারবার তা করা
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো ব্যক্তি নারীদের দিকে তাকায়। চোখেরও ব্যভিচার আছে, আর চোখের ব্যভিচার হলো হারাম দৃষ্টিতে তাকানো। প্রকৃত ব্যভিচারের তুলনায় চোখের ব্যভিচার ছোট গুনাহ। কিন্তু কেউ যদি বারবার এই গুনাহ করতে থাকে এবং এর ওপর অবিচল থাকে, তাহলে তা বড় গুনাহে পরিণত হয়। কারণ, সে দৃষ্টি অবনত না করার ব্যাপারে অনড় থাকে এবং হারাম জিনিসের দিকে বারবার তাকানোর অভ্যাস বজায় রাখে। অতএব, গুনাহের ওপর অবিচল থাকা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
গুনাহকে তুচ্ছ মনে করা
উদাহরণ হিসেবে, আপনি কোনো ধূমপায়ীকে বললেন, ‘আল্লাহকে ভয় করুন। ধূমপান হারাম। আপনার বয়সও অনেক হয়েছে।’ কিন্তু তিনি বললেন, ‘এটা তো ছোটখাটো গুনাহ!’ এখানে তাঁর ভুল হলো, তিনি গুনাহকে তুচ্ছ মনে করছেন।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘মুমিন ব্যক্তি তার গুনাহগুলোকে এত ভারি মনে করে, যেন সে একটা পর্বতের নিচে উপবিষ্ট আছে, আর সে আশঙ্কা করছে যে হয়তো পর্বতটা তার ওপর ধসে পড়বে। আর পাপিষ্ঠ ব্যক্তি তার গুনাহগুলোকে মাছির মতো মনে করে, যা তার নাকের ওপর দিয়ে চলে যায়।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৩০৮)
হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমরা ছোট ছোট গুনাহ থেকে বেঁচে থেকো। কেননা তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে ওই সম্প্রদায়ের মতো, যারা কোনো উপত্যকায় অবতরণ করেছে। অতঃপর প্রত্যেকে একটি করে কাঠ নিয়ে এসেছে। এমনকি তা স্তূপাকার ধারণ করেছে। যার দ্বারা তারা রুটি পাকাতে পারে। আর নিশ্চয়ই ছোট ছোট গুনাহ যখন পাপীকে পাকড়াও করবে তখন তাকে ধ্বংস করে ছাড়বে।’ (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস : ২২৮৬০)
গুনাহ করে আনন্দিত হওয়া
কেউ কেউ গুনাহ করার পর আনন্দিত হয়। অথচ গুনাহ করে আনন্দিত হওয়া সেই গুনাহের চেয়েও গুরুতর হতে পারে। কাউকে নিজের খারাপ কাজ নিয়ে আনন্দিত হতে দেখা যায়। সে কীভাবে একজনকে গালি দিয়েছে, কীভাবে আরেকজনের রক্ত ঝরিয়েছে, তা নিয়ে গর্ব করে। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুসলমানকে গালি দেওয়া ফাসেকি এবং তার সঙ্গে লড়াই করা কুফরি কাজ।’ (নাসাঈ, হাদিস : ৪১২৩)
আবার কেউ কোনো সম্ভ্রান্ত ও পবিত্র নারীকে বিপথগামী করতে পেরে আনন্দিত হয়। কীভাবে তাঁর সম্মানহানি করতে পেরেছে, তা নিয়ে গর্ব করে। অথচ আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’ (সুরা আন-নূর, আয়াত : ১৯)
কাজেই সতর্ক হওয়া জরুরি। গুনাহ করে আনন্দিত হওয়া সেই গুনাহের চেয়েও গুরুতর হতে পারে।
আল্লাহ যে গুনাহ গোপন রেখেছেন, সেটিকে অবহেলা করা
গুনাহ করার পর এর সঙ্গে যুক্ত হওয়া কিছু বিষয় অনেক সময় মূল গুনাহের চেয়েও গুরুতর হয়ে ওঠে। গুনাহ করার সময় ডানে ও বামে যাঁরা আছেন, তাঁদের প্রতি লজ্জাবোধ না করা গুনাহের চেয়েও গুরুতর। আল্লাহ আপনার সঙ্গে কী আচরণ করবেন, তা না জেনেও হাসিখুশি থাকাও গুনাহের চেয়েও গুরুতর। আবার গুনাহ করার সুযোগ হাতছাড়া হলে তার জন্য দুঃখিত হওয়াও গুরুতর অপরাধ হতে পারে।
আল্লাহ বলেন, ‘আর জেনে রেখো, আল্লাহ তোমাদের অন্তরের খবর রাখেন। অতএব তাঁকে ভয় করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৩৫)
প্রকাশ্যে গুনাহ করা ও তা প্রচার করা
কোনো ব্যক্তি রাতে গুনাহ করল এবং আল্লাহ তার গুনাহ গোপন রাখলেন। কিন্তু পরদিন সে অন্যদের কাছে নিজের গুনাহের কথা বলতে শুরু করল। এভাবে সে নিজেই আল্লাহর দেওয়া গোপনীয়তার আবরণ ছিন্ন করল।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমার উম্মতের সবাইকে ক্ষমা করা হতে পারে, প্রকাশ্যে গুনাহকারীরা ছাড়া।’ (বুখারি, হাদিস : ৬০৬৯)
তাই নিজের গুনাহ নিয়ে গর্ব করা, তা প্রচার করা এবং প্রকাশ্যে গুনাহ করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
অনুকরণীয় ব্যক্তির ছোট ছোট পাপ বড় পাপের রূপ নেয়
এমন একজন ব্যক্তির কথা চিন্তা করুন, যিনি কোনো কারখানার পরিচালক, বিদ্যালয়ের প্রধান, কলেজের শিক্ষক, মসজিদের ইমাম, মাদরাসার শিক্ষক কিংবা একজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব। তিনি ধূমপান শুরু করলেন। তাঁকে দেখে তাঁর দলের অন্যরাও ধূমপান শুরু করল। এরপর তিনি মাদক সেবন শুরু করলেন। অন্যরাও তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করতে লাগল। পরে বিষয়টি অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ল এবং একটি সাধারণ প্রবণতায় পরিণত হলো।
যখন আপনি এমন কেউ হন, যাঁকে অন্যরা অনুসরণ করে, তখন আপনার ছোট পাপও অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে বড় পাপের রূপ নিতে পারে। এ ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই হাদিসটি প্রযোজ্য : ‘যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো মন্দ প্রথার প্রচলন করে, তার ওপর সেই কাজের পাপ বর্তাবে এবং তার পরে যারা সেই অনুযায়ী আমল করবে, তাদের পাপের সমপরিমাণ পাপও তার ওপর বর্তাবে; অথচ তাদের পাপের পরিমাণ থেকে কিছুই কমানো হবে না।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২০৩; তিরমিজি, হাদিস : ২৬৭৫)
এমএমটি
-20261016092322.jpg&w=1440&q=75)