লিকলিকে গড়নের শিল্পাকে দেখে কে বলবে তার বয়স একান্ন। বিতর্ক-সংগ্রামের পর বয়সকে সংখ্যায় আটকে রেখে কেবলই ছুটে চলেছেন এই অভিনেত্রী। ৩৩ বছর আগে ‘বাজিগর’ দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন, যা তার জীবনের গ্রাফই বদলে দিয়েছে। এই জার্নিতে সহশিল্পী হিসেবে পেয়েছিলেন শাহরুখ খান ও কাজলকে। সিনেমাটি এই তিনজনকে তারকা বানিয়েছে।
তবে ‘বাজিগর’ সিনেমায় শিল্পার যুক্ত হওয়ার নাটকীয় গল্প, শুটিং সেটে দুর্ঘটনা, পরিশ্রম-ত্যাগ তাকে আলাদা করেছে। অভিষেক সিনেমায় শিল্পার বিশেষ কিছু ঘটনা নিয়ে এই প্রতিবেদন—
‘বাজিগর’ সিনেমা মুক্তির আগে পরিচালক জুটি আব্বাস-মাস্তানের সময়টা ভালো যাচ্ছিল না। তবে এই সিনেমা আগের ফ্লপের ব্যথা দূর করে দেয়
‘বাজিগর’ সিনেমার জন্য পরিচালক জুটি আব্বাস-মাস্তানের প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল অভিনেত্রী শ্রীদেবীকে দিয়ে দুই বোনের (কাজল ও শিল্পার চরিত্র) দ্বৈত চরিত্র রূপায়ন করাবেন। কিন্তু পরবর্তীতে পরিচালকরা মত বদলান। কারণ তারা ভাবেন—একই নায়িকাকে পর্দায় দুইবার মরতে দেখা এবং শাহরুখের মতো একজন খলনায়কের হাতে খুন হতে দেখতে পছন্দ করবেন না দর্শকরা। ফলে তারা নতুন মুখ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
‘বাজিগর’ সিনেমার ‘সীমা চোপড়া’ চরিত্রটির জন্য জুহি চাওলা, মাধুরী দীক্ষিত, মাধুর মতো বড় তারকাদের প্রস্তাব দেন নির্মাতারা। কিন্তু চরিত্রটির দৈর্ঘ্য ছোট হওয়ায় এবং সিনেমার প্রথমার্ধেই চরিত্রটি মারা যাওয়ার কারণে তারা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তবে ভাগ্যক্রমে চরিত্রটি রূপায়নের প্রস্তাব পান শিল্পা শেঠি, যা তা ক্যারিয়ারের গতিপথই বদলে দেয়।
১৯৭৫ সালের ৮ জুন দক্ষিণ ভারতের কর্নাটকের বেঙ্গালুরুতে জন্মগ্রহণ করেন শিল্পা শেঠি। তবে অভিনেত্রী হিসেবে নিজেকে মুম্বাইয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছেন
‘বাজিগর’ সিনেমার শুটিং করতে গিয়ে শিল্পা শেঠির পিঠ পুড়ে গিয়েছিল। ঘটনা বর্ণনা করে শিল্পা শেঠি বলেন, “আমার মনে আছে, একটি শটে এইচএমআই লাইটে আমার পিঠ পুড়ে গিয়েছিল। শটটি ছিল—আমাকে ফ্রেম থেকে বের হতে হবে, আর পেছনে একটি বেবি লাইট ছিল, সেখানে আমার পিঠ লেগে যায়। পুড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপারটি ততটা বোঝা যায়নি; কিছুক্ষণ পর যখন জ্বালা শুরু হয়, তখন বুঝতে পারি।”
পিঠ পুড়ে যাওয়ার পরের দিনও শুটিংয়ে অংশ নেন শিল্পা। তার ভাষায়—“এ ঘটনার পরের দিনও আমি শুটিংয়ে যাই। সেদিন আমার একটি পোশাক পরতে হতো। কিন্তু পোড়া থাকার কারণে তা ঠিকভাবে পরতে পারছিলাম না। তাই পোশাকটি সামনের দিক দিয়ে পরে পেছনটা সুতো দিয়ে সেলাই করে দিতে বলি। যাতে জিপ দিতে না হয়।”
নব্বই দশকের আলোচিত নায়িকা শিল্পা শেঠি হিন্দির পাশাপাশি কন্নড়, তেলেগু, তামিলসহ বিভিন্ন ভাষার সিনেমায় অভিনয় করেছেন
‘বাজিগর’ সিনেমার একটি দৃশ্যে বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে শিল্পা শেঠির চরিত্রকে নিচে ফেলে দেয় শাহরুখ খানের চরিত্র। এটি সিনেমাটির সবচেয়ে আলোচিত দৃশ্য। দৃশ্যটি রূপায়ন করতে গিয়ে শিল্পাকে ঝুলে থাকতে হয়েছিল। শুটিংয়ের ঘটনা বর্ণনা করে এই অভিনেত্রী বলেন, “আকবর ভাই ছিলেন সিনেমাটির অ্যাকশন ডিরেক্টর। আমরা ওই দৃশ্যটি পাঁচবার শুট করেছিলাম। সেই সময়ে আমাদের কোনো ভিএফএক্স ছিল না। তাই দৃশ্যগুলো যথাযথভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য বাস্তবসম্মতভাবে অভিনয় করতে হয়েছিল। তাছাড়া বিল্ডিংটাও নড়ছিল। কিন্তু নির্মাতারা দৃশ্যটি ভালোভাবে চিত্রায়িত করতে চাচ্ছিলেন। দৃশ্যটির জন্য আমাকে একটি হারনেস পরতে হয়েছিল। এতে আমার কোমরে দাগ পড়ে যায়। এই দাগ পরবর্তী ৮-১০ বছর বয়ে বেড়িয়েছি। মজার ব্যাপার হলো—দৃশ্যটির জন্য আমি ১৫ বার মরেছি।”
মাত্র ১৭-১৮ বছর বয়সে অভিনয় শুরু করেন শিল্পা শেঠি। তখনো হিন্দি বা উর্দু ভাষায় খুব একটা পারদর্শী হয়ে ওঠেননি। ‘বাজিগর’ সিনেমার ‘অ্যায় মেরে হামসাফার’ গানের শুটিংয়ের সময় বিপত্তি বাঁধে। কারণ গানের লাইনের সঙ্গে ঠোঁট মেলাতে পারছিলেন না শিল্পা। তখন শাহরুখ খান তাকে সহযোগিতা করেন; সঠিক টেকনিক শিখিয়ে সহজে গানটি গাইতে তাকে সাহায্য করেন।
শিল্পা শেঠি প্রায়ই নানা রকম দাতব্য কাজ করে থাকেন। তার অভিনীত ‘ফির মিলেঙ্গে’ সিনেমার আয় একজন এইচআইভি পজিটিভ রোগীকে অনুদান দিয়েছিলেন
১৯৯৩ সালের ১২ নভেম্বর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ‘বাজিগর’ সিনেমা। ৩ কোটি রুপি বাজেটের এ সিনেমা বক্স অফিসে আয় করেছিল ৩২ কোটি রুপি। ছোট চরিত্র দিয়ে শুরু করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পা অন্যতম নির্ভরযোগ্য অভিনেত্রী হিসেবে নিজেকে ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতিষ্ঠিত করেন। এক সাক্ষাৎকারে শিল্পা জানান—তার এই সাফল্য সহজে ধরা দেয়নি।
*টাইমস অব ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, টমরো অবলম্বনে
