আজ আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস। প্রতিবছর ১৭ অক্টোবর পালিত হয় এই দিবস। দারিদ্র্য কেবল অর্থের অভাব নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার, মানবিক মর্যাদা ও সম্ভাবনা থেকে বঞ্চিত হওয়ারও নাম। এ বছর দারিদ্র্য বিমোচনের আলোচনায় নিরাপদ আবাসনের গুরুত্ব বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ নিরাপদ বাসস্থান শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়; এটি সুস্থ জীবন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক অংশগ্রহণের অন্যতম ভিত্তি। অনিরাপদ, অস্বাস্থ্যকর ও ব্যয়বহুল আবাসন দরিদ্র মানুষের জীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে। তাই দারিদ্র্য দূর করতে হলে মানুষের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপদ আবাসন ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
১৯৮৭ সালের ১৭ অক্টোবর প্যারিসে দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও সহিংসতার শিকার মানুষের প্রতি সংহতি জানিয়ে একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৯২ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ১৭ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। দিবসটির মূল উদ্দেশ্য দারিদ্র্যের বাস্তবতা তুলে ধরা এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় সম্মিলিত উদ্যোগকে উৎসাহিত করা। দারিদ্র্য বিমোচনে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা একমাত্র সমাধান নয়। প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছানো প্রয়োজন। মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান ও কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়া দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র ভাঙা কঠিন। অনেক পরিবার দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এলেও অসুস্থতা, বেকারত্ব কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আবার দরিদ্র হয়ে পড়ে। তাই মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আকস্মিক সংকট মোকাবিলায় সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য।
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে ভূমিহীনতা, কৃষিতে অনিশ্চয়তা ও কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা দারিদ্র্যের অন্যতম কারণ। অন্যদিকে শহরে বস্তির ঘনবসতি, নিরাপদ পানির অভাব, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও অতিরিক্ত বাসাভাড়া দরিদ্র মানুষের সংকট বাড়াচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপকূলীয় ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষের জীবিকা ও আবাসনকে হুমকির মুখে ফেলছে। ফলে দারিদ্র্য বিমোচনের পরিকল্পনায় গ্রামীণ ও নগর বাস্তবতাকে আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী ভাড়ার বাসস্থান, নিরাপদ পানি, উন্নত স্যানিটেশন ও মৌলিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। দারিদ্র্য মোকাবিলায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার ঘটানোর পাশাপাশি কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি এবং অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে সহজ শর্তে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ, দক্ষতা উন্নয়ন ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দক্ষ জনশক্তির বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো এবং অভিবাসন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি, সহজ ঋণ ও ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রির সুযোগ কৃষকের আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। এর পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক আর্থিক সহায়তা, কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী এবং স্বল্পমূল্যে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় নিরাপদ আবাসন ও জীবিকা পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। সরকারি সহায়তা যেন প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে পৌঁছায়, সেজন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দারিদ্র্য বিমোচনের দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়; বেসরকারি খাত, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সংস্থা ও নাগরিক সমাজকেও সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। দারিদ্র্য দূর করতে মানুষের হাতে শুধু সহায়তা তুলে দিলেই হবে না, তাকে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগও তৈরি করে দিতে হবে। নিরাপদ আবাসন, মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান, মানসম্মত শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার সমন্বয় ঘটাতে পারলেই দারিদ্র্য বিমোচনের অগ্রগতি টেকসই হবে। এজন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন। দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য অর্জনে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের মর্যাদা, অধিকার ও জীবনমানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। সম্মিলিত উদ্যোগের মধ্য দিয়েই বৈষম্য কমিয়ে একটি মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
মো. শাহাদৎ হোসেন : অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক ও লাইন ডাইরেক্টর (এমআইএস), পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর
