ঢাকার পশ্চিম নন্দীপাড়ার মদীনা গলির ছয়তলা বাড়িজুড়ে শোকের মাতম। কান্না আর বিলাপে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। প্রতিবেশী ও স্বজনেরা আসছেন, যাচ্ছেন। সবার অপেক্ষা- কখন ফিরবে পরিবারের সেই ছেলে-মেয়েরা? কিন্তু কক্সবাজারের রিসোর্টে আগুনে পুড়ে যাওয়া স্বজনদের চেহারা শনাক্ত করারও উপায় নেই। তাদের বাবা-মায়েরা দ্রুত লাশ বুঝে পাওয়ার আশায় ডিএনএ পরীক্ষার নমুনা দিতে ছুটছেন।
কক্সবাজারের পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া একই পরিবারের ছয়জনের বাড়ি এটি। নিহতরা সবাই খালাতো-মামাতো ভাইবোন। তাদের মা-বাবারা কয়েক বছর ধরে যৌথভাবে বাড়িটি ভাড়া নিয়ে বসবাস করছেন।
পরিবারের ১০ সদস্য কক্সবাজার বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেখানে আগুন লাগার পর থেকে তাদের ছয়জন নিখোঁজ। পরিবারের সদস্যদের ধারণা, ঘটনাস্থলে যেসব দেহাবশেষ পাওয়া গেছে, সেগুলোর মধ্যে তাদের নিখোঁজ ছয় স্বজন রয়েছেন।
নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন ইসরাত জাহান মালিহা, তার বোন লায়লা জাহান নাবিলা, তাদের খালাতো বোন মিলিতা মেহজাবিন আলভি ও ফারিহা কবির, ফারিহার পাঁচ বছর বয়সী সন্তান ফায়িজান আহমদ এবং তাদের খালাতো ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাফিস তেহামি জেরিফ।
স্বজনেরা জানান, পশ্চিম নন্দীপাড়ার এ পরিবারের ১০ সদস্য গত বৃহস্পতিবার সকালে কক্সবাজার পৌঁছান। তারা ওঠেন কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে।
পরিবারের সদস্য ফারিহা কবিরের স্বামী নূর আলম ইফতি এক দিন আগেই স্ত্রী-সন্তানকে রেখে কর্মস্থল চুয়াডাঙ্গায় চলে যান। স্ত্রী-সন্তানকে হারিয়ে ওষুধ কোম্পানির এই বিক্রয় কর্মকর্তা এখন প্রায় পাগলপ্রায়।
অন্যদিকে, সকালে সাগরপাড়ে হাঁটতে বের হওয়ায় স্ত্রীসহ বেঁচে যান নিহত মালিহা ও নাবিলাদের মামা মো. মাসুদ। আগুন লাগার পর জানালা ভেঙে বের হতে সক্ষম হন মালিহার স্বামী আশিকুল ইসলাম।
রোববার সকালে পশ্চিম নন্দীপাড়ায় মালিহা-নাবিলাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনদের ভিড় লেগেই আছে। অনেকে আগের রাত থেকেই সেখানে অবস্থান করছেন। ছয়তলা ভবনটির বিভিন্ন তলায় পরিবারের সদস্যদের বাসা। স্বজনেরা মূলত তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় জড়ো হয়েছেন।
তৃতীয় তলায় মালিহা-নাবিলাদের বাসায় বসে অন্য স্বজনদের সঙ্গে কথা বলছিলেন তাদের চাচা আবু তালেব। মালিহা-নাবিলাদের মা-বাবা ডিএনএ নমুনা দিতে ঢাকার অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কার্যালয়ে গেছেন।
আবু তালেব বলেন, “কক্সবাজারে নিহতদের দেহাবশেষ থেকে নমুনা সংগ্রহের কাজ করছে সিআইডি। ওখানে আমাদের কয়েকজন প্রতিনিধি রয়েছে। তবে কক্সবাজারে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করতে যথাযথ পাত্র নিয়ে যাননি সিআইডির কর্মকর্তারা। যার কারণে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে।”
তিনি আরো বলেন, “আমরা চাই আমাদের ছেলে-মেয়েদের যেন দ্রুত ফেরানো যায়। সেজন্য ওদের বাবা-মায়েরা ঢাকার সিআইডি অফিসে সকালে উঠেই চলে গেছে ডিএনএ নমুনা দিতে।”
রোববার (১৮ অক্টোবর) সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ছুফি উল্লাহ বলেন, “কক্সবাজারের ঘটনায় নিহত পরিবারের কয়েকজন ডিএনএ নমুনা দিতে এসেছেন। আমাদের ফরেনসিক বিভাগ কাজ করছে।”
থেমে থেমে কান্না, স্বজনদের একটাই অপেক্ষা: মালিহাদের বাসায় ঢুকতেই চোখে পড়ে এক সেট সোফা। সেখানে নীরবে বসে আছেন স্বজনেরা। পাশের ঘরগুলো থেকে থেমে থেমে ভেসে আসছে কান্নার শব্দ। কেউ কেউ স্মরণ করছেন মালিহার কৃতিত্বপূর্ণ শিক্ষাজীবনের কথা। তিনি গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর গবেষণার কাজ করছিলেন। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন।
পাড়া-প্রতিবেশীদের অনেকেই বাড়িতে এসে খোঁজ নিচ্ছেন, লাশ কখন আসবে, দাফন-কাফনের ব্যবস্থা কী হবে। কিন্তু স্বজনদের কাছে এখনো এসব প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর নেই।
আবু তালেব বলেন, “এখনো ডিসিশন হয়নি। আমাদের বলেছে ডিএনএ ছাড়া লাশ দেবে না। এখন এই প্রক্রিয়া শেষ হলেই আমরা লাশ নিয়ে আসব।” এক স্বজন ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, “কেন এরকম হল, ওদের চেহারা নাকি বোঝা যাচ্ছে না।”
সানা/আপ্র/১৮/১০/২০২৬
