চীনের ফুচিয়ান প্রদেশের পাহাড়ঘেরা ছোট্ট জনপদ ‘শাশিয়ান’। নামটি হয়তো অনেকের কাছেই অপরিচিত। কিন্তু এই ছোট্ট শহরের খাবারের গল্প আজ ছড়িয়ে পড়েছে চীনের সীমানা পেরিয়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। যে খাবারের যাত্রা শুরু হয়েছিল রাস্তার পাশের সাধারণ দোকান আর পারিবারিক রান্নাঘর থেকে, সেই খাবারই আজ বিশ্ববাজারে চীনা খাদ্যসংস্কৃতির এক পরিচিত মুখ।
শাশিয়ান স্ন্যাকসের এই বিস্ময়কর গল্পের টানেই আমার পথচলা—পাহাড়, নদী, মানুষ আর খাবারের স্বাদে মিশে থাকা এক প্রাচীন জনপদের জীবনকে কাছ থেকে দেখার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে।
শাশিয়ান চীনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় ফুচিয়ান প্রদেশের সানমিং শহরের অন্তর্গত একটি জেলা। দুই বিশাল পর্বতমালার মাঝখানে এর অবস্থান। শহরের বুক চিরে বয়ে গেছে প্রশস্ত নদী। চারদিকে সবুজ পাহাড়, উর্বর জমি আর শান্ত প্রকৃতির নিবিড় উপস্থিতি। এখানকার উপক্রান্তীয় জলবায়ু তুলনামূলক স্থিতিশীল। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত ও পানির প্রাচুর্য কৃষিকে করেছে সমৃদ্ধ। প্রকৃতি যেন নিজ হাতে সাজিয়েছে মানুষের জীবন ও জীবিকার ভিত্তি।
শহরের পথে হাঁটতে হাঁটতে প্রথমেই চোখে পড়ে রাস্তার দুই পাশে সারি সারি ছোট খাবারের দোকান। কোথাও ধোঁয়া উঠছে বাঁশের তৈরি স্টিমার থেকে, কোথাও ফুটন্ত স্যুপের হাঁড়ি, আবার কোথাও দক্ষ হাতে ময়দার পাতলা আবরণে পুর ভরে তৈরি হচ্ছে ডাম্পলিং। বাতাসে ভেসে আসছে তিল, চিনাবাদাম, সেদ্ধ মাংস আর নানা মশলার মনমাতানো ঘ্রাণ। দোকানের সামনে বসে কেউ সকালের নাশতা করছেন, কেউ গল্পে মেতেছেন, আবার কেউ ব্যস্ত দিনের কাজ শুরুর আগে দ্রুত খাবার সেরে নিচ্ছেন।
একটি ছোট দোকানের সামনে দাঁড়াতেই কৌতূহল বেড়ে গেল। দোকানটি খুব একটা বড় নয়। কয়েকটি সাধারণ টেবিল, ছোট ছোট বসার আসন আর সামনে সাজানো নানা ধরনের খাবার। দোকানের ভেতর এক নারী ব্যস্ত হাতে নুডলস তৈরি করছেন। পাশে আরেকজন স্টিমার থেকে গরম ডাম্পলিং নামাচ্ছেন। তাদের কাজের গতি দেখে মনে হলো, দীর্ঘদিনের অভ্যাসে প্রতিটি কাজ যেন নিখুঁত শিল্পে পরিণত হয়েছে।
কৌতূহল সামলাতে না পেরে দোকানির কাছে জানতে চাইলাম, “এখানকার সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার কোনটি?” তিনি হাসিমুখে কয়েকটি পদের দিকে ইঙ্গিত করলেন—নুডলস, ওয়ানটন, ডাম্পলিং আর স্যুপ। এই চার ধরনের খাবারই শাশিয়ানের পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
প্রথমে এলো এক বাটি গরম নুডলস। স্থানীয় ভাষায় যার নাম ‘পানমিয়ান’। দেখতে সাধারণ মনে হলেও এর স্বাদে রয়েছে বিশেষত্ব। সেদ্ধ নুডলসের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে চিনাবাদাম ও তিলের ঘন সস। প্রথম লোকমাতেই বোঝা গেল, কেন এত সাধারণ একটি খাবার মানুষের মনে এত গভীর জায়গা করে নিয়েছে। নুডলসের কোমলতা আর সসের বাদামি ঘ্রাণ মিলে তৈরি করেছে চমৎকার এক স্বাদ।
এরপর এলো শাশিয়ানের বিখ্যাত ‘পিয়ানরৌ’, একধরনের ওয়ানটন। খুব পাতলা আবরণের ভেতর বিশেষভাবে প্রস্তুত করা মাংসের পুর। গরম স্যুপে পরিবেশিত ছোট ছোট ওয়ানটনগুলো দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি এর প্রস্তুতপ্রণালিও অভিনব। মাংস বারবার পিটিয়ে এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে পুরের গঠন হয় নরম অথচ স্থিতিস্থাপক। এর সঙ্গে রয়েছে ভাপে তৈরি ডাম্পলিং, যা কখনো চিনাবাদামের সস, কখনো মরিচের তেল দিয়ে পরিবেশন করা হয়।
খাবারের সঙ্গে এলো আরও এক বাটি স্যুপ। শাশিয়ানের খাবারের তালিকায় ভেষজ উপাদান দিয়ে ধীরে রান্না করা স্যুপের বিশেষ স্থান রয়েছে। কখনো গোজি বেরি দিয়ে কালো মুরগির স্যুপ, কখনো কচু ও মাংসের বল দিয়ে তৈরি ঝোল। দীর্ঘ সময় ধরে রান্নার ফলে উপকরণগুলোর স্বাদ ধীরে ধীরে মিশে যায় ঝোলে। এখানে খাবার কেবল ক্ষুধা মেটানোর উপায় নয়, বরং পরিবারের যত্ন, অভ্যাস ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা রান্নার জ্ঞানের অংশ। খেতে খেতে মনে হলো, পৃথিবীর বড় বড় শহরে আধুনিক রেস্তোরাঁর চাকচিক্য যতই বাড়ুক, সাধারণ মানুষের হাতে তৈরি এমন খাবারের আবেদন কখনো ফুরিয়ে যায় না।
শাশিয়ানে খাবারের ইতিহাস প্রায় ১ হাজার ৬০০ বছরের পুরনো। দীর্ঘ এই সময়ে এখানকার খাদ্যসংস্কৃতি নানা জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, অভিবাসন ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মধ্য দিয়ে সমৃদ্ধ হয়েছে। প্রাচীনকালে চীনের মধ্যাঞ্চল থেকে বহু মানুষ দক্ষিণে এসে বসতি গড়েছিলেন। তাদের সঙ্গে এসেছিল নতুন রান্নার কৌশল, খাদ্য সংরক্ষণ ও গাঁজনের পদ্ধতি। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিজস্ব খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে সেসব ঐতিহ্য মিশে তৈরি হয়েছে আজকের শাশিয়ান খাবারের বৈচিত্র্য।
এই অঞ্চলের খাদ্যসংস্কৃতিতে হাক্কা জনগোষ্ঠীর প্রভাবও গভীর। ফুচিয়ান, গুয়াংতং ও চিয়াংশি অঞ্চলে বিস্তৃত হাক্কাদের কৃষিনির্ভর জীবন, পরিশ্রমী স্বভাব এবং খাবার তৈরির নিজস্ব পদ্ধতি শাশিয়ানের রান্নাকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়। একসময় শাশিয়ান ছিল ব্যবসায়ী ও পথিকদের গুরুত্বপূর্ণ যাতায়াতকেন্দ্র। দূরদূরান্ত থেকে আসা বণিকদের সঙ্গে এখানে পৌঁছাত নতুন স্বাদ, নতুন উপকরণ আর নতুন রান্নার ধারণা। ফলে এই শহরের খাবার হয়ে উঠেছে বহু সংস্কৃতির মিলনস্থল।
এখানকার রান্নায় চাল, গম ও শিমজাতীয় শস্যের ব্যবহার লক্ষণীয়। মূলত এই তিন ধরনের কৃষিপণ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে খাবারের প্রধান তিনটি ধারা। চাল দিয়ে তৈরি হয় নানা পিঠা, কেক ও জেলির মতো পদ। গম থেকে তৈরি হয় নুডলস, ডাম্পলিং ও অন্যান্য ময়দার খাবার। আর শিমজাতীয় শস্য ব্যবহৃত হয় বিভিন্ন পদ ও উপকরণ তৈরিতে। কৃষিজমিতে যে ফসল জন্মায়, তা-ই মানুষের রান্নাঘরে এসে নতুন রূপ পায়।
শাশিয়ানের খাবারের সঙ্গে ঋতুর সম্পর্কও গভীর। বসন্তে পাহাড়ি প্রকৃতি যখন নতুন সবুজে সেজে ওঠে, তখন স্থানীয় মানুষের রান্নায় আসে ফার্নের কচি পাতা ও বুনো পেঁয়াজ। আগাম ধান কাটার সময় তৈরি হয় চালের পিঠা। নতুন তেল উৎপাদনের মৌসুমে বানানো হয় বিশেষ কেক।
গ্রীষ্মে নতুন ধান ঘরে ওঠার আনন্দ যেন ছড়িয়ে পড়ে খাবারের আয়োজনে। সদ্য কাটা চাল ভাপে রান্না করা হয়, কখনো তৈরি হয় চালের জেলি কিংবা উৎসবের পিঠা। ডিম, মাংস, টোফু ও পানীয় নিয়ে পরিবারের সবাই মিলিত হন বিশেষ ভোজে। স্থানীয় সংস্কৃতিতে এই আয়োজন ‘নতুন ফসল খাওয়া’র উৎসব হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের নবান্নের কথা মনে পড়ে গেল। ভৌগোলিক দূরত্ব অনেক হলেও কৃষিনির্ভর সমাজের আনন্দ আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা কতটা কাছাকাছি!
এখানকার মানুষের কাছে অনেক খাবারের রয়েছে প্রতীকী অর্থ। প্রচলিত লোকবিশ্বাসে পেঁয়াজপাতা চুলের জন্য উপকারী, টোফু মেধা বাড়ায়, শামুক চোখ ভালো রাখে, বাঁশকোঁড়ল পায়ে শক্তি জোগায় এবং চালের পিঠা শরীরে শক্তি আনে। এসব বিশ্বাসের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি থাকুক বা না থাকুক, মানুষের জীবনবোধ ও লোকঐতিহ্য বোঝার জন্য এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। জন্মদিন, বিয়ে, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, ধর্মীয় আচার কিংবা পারিবারিক উৎসবেও খাবারের রয়েছে ভূমিকা। প্রতিটি আয়োজন যেন একেকটি সাংস্কৃতিক গল্প।
তবে শাশিয়ানের সবচেয়ে বিস্ময়কর গল্পটি লুকিয়ে আছে এর সাধারণ মানুষের উদ্যোগে। একসময় এখানকার খাবারের দোকানগুলো ছিল খুব ছোট। স্বামী-স্ত্রী কিংবা পরিবারের সদস্যরা মিলে দোকান চালাতেন। ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে বাজার করা, রান্নার প্রস্তুতি, খাবার পরিবেশন থেকে শুরু করে দিনের শেষে হিসাব মেলানো পর্যন্ত সব কাজ নিজেদেরই করতে হতো। তাদের পুঁজি ছিল অল্প, কিন্তু শ্রম আর স্বপ্ন ছিল অনেক বড়।
সেই সময় একটি কথা বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে—“এক ইউয়ানে প্রবেশ, দুই ইউয়ানে পেট ভরে খাওয়া, আর তিন ইউয়ানে ভালোভাবে খাওয়া।” এই সহজ কথার মধ্যেই ছিল ব্যবসার মূল দর্শন—কম দামে সুস্বাদু ও পেটভরা খাবার। ফলে শ্রমজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, পথচারী থেকে শুরু করে নানা শ্রেণির মানুষের কাছে শাশিয়ানের খাবার জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। প্রথম দিকে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনদের সহযোগিতায় ব্যবসা ছড়িয়ে পড়তে থাকে। একজন অন্য শহরে দোকান খুললে তার দেখাদেখি আরও কয়েকজন এগিয়ে আসতেন। কেউ রান্না শেখাতেন, কেউ নতুন দোকান খোলায় সাহায্য করতেন। এভাবে ছোট্ট একটি অঞ্চলের পারিবারিক ব্যবসা ধীরে ধীরে চীনজুড়ে বিশাল খাদ্যশিল্পে রূপ নেয়।
আজ চীনজুড়ে শাশিয়ান খাবারের দোকানের সংখ্যা ৮০ হাজারের বেশি। রাজধানী বেইজিং থেকে শুরু করে সাংহাই কিংবা অন্যান্য শহরে এই খাবার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের পরিচিত অংশ। শুধু চীনেই নয়, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ফ্রান্স, সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাজ্যসহ পৃথিবীর নানা দেশে পৌঁছে গেছে শাশিয়ানের স্বাদ। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৭৫টি দেশ ও অঞ্চলে এর ট্রেডমার্ক নিবন্ধিত হয়েছে এবং বিদেশে চালু হয়েছে ২৩৮টি বিক্রয়কেন্দ্র। এসব সংখ্যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু এর বিস্তারের গল্পটি নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর।
এই অগ্রযাত্রায় সরকারি স্বীকৃতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০২১ সালের ২৩ মার্চ চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং ফুচিয়ান সফরের সময় শাশিয়ানের একটি খাবারের সড়ক পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি স্থানীয় বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং গ্রামীণ অর্থনীতি ও মানুষের জীবিকা উন্নয়নে এ ধরনের শিল্পের গুরুত্ব তুলে ধরেন। একই সঙ্গে নতুনত্ব আনা ও ব্যবসার মান উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেন। সেই বছরই শাশিয়ানের ঐতিহ্যবাহী খাবার তৈরির শিল্প চীনের জাতীয় পর্যায়ের অবৈষয়িক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পঞ্চম তালিকায় স্থান পায়। দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে সংরক্ষিত একটি ঐতিহ্যের জন্য এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।
শাশিয়ানে দুই শতাধিক ধরনের খাবার প্রচলিত। প্রতিটির পেছনে রয়েছে স্থানীয় উপকরণ, মানুষের অভ্যাস এবং সময়ের সঙ্গে গড়ে ওঠা নিজস্ব গল্প। অথচ এই খাদ্যসম্ভারের মূল আকর্ষণ এখনো এর সরলতা। খাবারগুলো আড়ম্বরপূর্ণ নয়, অতিরিক্ত ব্যয়বহুলও নয়। এগুলোর আবেদন স্বাদ, সহজলভ্যতা এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের মধ্যে।
শহরের ব্যস্ত রাস্তার খাবারের দোকান থেকে কিছুটা দূরে তাকালেই চোখে পড়ে সবুজ পাহাড়। নদীর জলে আলো পড়ে ঝিলমিল করছে। দূরের কৃষিজমি আর শহরের দোকানগুলোর মধ্যে যেন এক অদৃশ্য সম্পর্ক। মাঠে উৎপাদিত শস্য রূপ নিচ্ছে রান্নাঘরের খাবারে, আর সেই খাবার পৌঁছে যাচ্ছে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে।
দিনের শেষে দোকানের সামনে বসে এক কাপ গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে মনে হলো, শাশিয়ানের প্রকৃত পরিচয় শুধু তার খাবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই শহরের গল্প আসলে মানুষের অধ্যবসায়, পারস্পরিক সহযোগিতা, সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সাহসের গল্প।
