অধিকৃত পশ্চিম তীরে দুই ইসরাইলি সেনা নিহত হওয়ার পর সামরিক অভিযান জোরদার করেছে ইসরাইল। এর অংশ হিসেবে হেবরন শহরে লকডাউন জারি করে হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে তাদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করেছে ইসরাইলি বাহিনী।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ হেবরনের বাসিন্দাদের সুরক্ষায় ইসরাইলের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, গভীর রাতে মাইকিং করে তাদের বাড়িঘর ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয় ইসরাইলি সেনারা। প্রস্তুতি নেওয়ার সময় না থাকায় এবং অন্যত্র যাওয়ার জায়গা সীমিত হওয়ায় তারা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
শনিবার হেবরনের মেয়র ইউসুফ আল-জাবারি বলেন, ইসরাইলি সেনাদের অভিযান ও তল্লাশির কারণে প্রায় ২ হাজার ২০০ মানুষ বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।
পরে শনিবার ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজও প্রায় ২ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম কানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘হেবরনে হামাস-সংক্রান্ত সব বিষয় মোকাবিলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের নিজ নিজ এলাকায় ফিরতে দেওয়া হবে না।’
শুক্রবার ইসরাইলি সেনাবাহিনীর একটি রিজার্ভ ঘাঁটিতে দুই ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীর হামলায় দুই ইসরাইলি সেনা নিহত হন। ওই দুই ফিলিস্তিনিও নিহত হন। এ ঘটনার পর থেকে অধিকৃত পশ্চিম তীরে শত শত অভিযান চালিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী।
হামলার পর অধিকৃত পশ্চিম তীরে ‘পূর্ণাঙ্গ লকডাউন’ জারির নির্দেশ দেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
মেয়র আল-জাবারি বলেন, হেবরনের বাসিন্দারা শহরে প্রবেশ করতে কিংবা শহর থেকে বের হতে পারছেন না।
এদিকে হেবরনের ফার্শ আল-হাওয়া চেকপোস্টের কাছে আলজাজিরার সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে স্টান গ্রেনেড ছুড়েছে ইসরাইলি সেনারা। ওই এলাকায় বাড়িঘর ও যানবাহন বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ইসরাইলি অভিযান নথিবদ্ধ করার সময় এ ঘটনা ঘটে।
আল জাজিরার মাঠপর্যায়ের সংবাদদাতারা জানিয়েছেন, শনিবার অধিকৃত পশ্চিম তীরের অন্তত ১৫টি এলাকায় অভিযান চালিয়েছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। এসব এলাকার মধ্যে উত্তরে জেনিন ও নাবলুস, মধ্যাঞ্চলে রামাল্লা, আল-বিরেহ, বিরজেইত ও অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেম এবং দক্ষিণে বেথলেহেম রয়েছে।
ফিলিস্তিনি প্রিজনার্স সোসাইটি জানিয়েছে, এসব অভিযানে প্রায় ৭০ জন ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করেছে ইসরাইলি বাহিনী।
ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, শনিবার সন্ধ্যায় জেনিন গভর্নরেটের কয়েকটি শহরে ইসরাইলি অভিযানে দুই ব্যক্তি আহত হয়েছেন। সংস্থাটির সূত্র আরও জানিয়েছে, জেনিনের দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্বাঞ্চলে পৃথক ঘটনায় আরও দুজন আহত হয়েছেন।
রোববার ভোরে ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, হেবরনের উত্তরে হালহুল এলাকায় ইসরাইলি সেনাদের ছোড়া কাঁদানে গ্যাসে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত ছয় শিশুসহ ৯ জনকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
রোববার ভোরে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানায়, রোববার থেকে সোমবার পর্যন্ত পশ্চিম তীরের অধিকাংশ এলাকায় ফিলিস্তিনি শ্রমিকদের প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। এ ছাড়া ইসরাইলের নির্বাচনের দিন মঙ্গলবার পশ্চিম তীরের প্রবেশ ও বের হওয়ার সব সীমান্তপথ পুরোপুরি বন্ধ রাখা হবে।
ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ইসরাইলের এসব পদক্ষেপকে ‘সম্মিলিত শাস্তি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া, পুরো আবাসিক এলাকা থেকে বাসিন্দাদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ এবং ফিলিস্তিনি শহরগুলোতে অবরোধ আরোপের কথা উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এদিকে হামাস এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘দখলদার বাহিনী ও তাদের অপরাধী বসতি স্থাপনকারীদের চালানো অভিযান এবং উত্তেজনা বৃদ্ধি আমাদের জনগণের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে তুলবে।’
অবরুদ্ধ কয়েক লাখ ফিলিস্তিনি
হেবরন শহরে প্রায় ২ লাখ ফিলিস্তিনি বসবাস করেন। আর হেবরন গভর্নরেটে বসবাস করেন আরও প্রায় ৬ লাখ মানুষ। জনসংখ্যার হিসাবে এটি পশ্চিম তীরের সবচেয়ে বড় গভর্নরেট।
হেবরনভিত্তিক ফিলিস্তিনি অধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইসা আমরো বলেন, হেবরন গভর্নরেটের ৮ লাখ ফিলিস্তিনি এখন অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছেন। সকাল থেকে প্রবেশ ও বের হওয়ার সব পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘শহরের ভেতরে কারও লুকিয়ে থাকার মতো নিরাপদ জায়গা নেই। শহরজুড়ে মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।’
আল জাজিরার পশ্চিম তীর প্রতিনিধি নূর ওদেহ বলেন, ২৭ অক্টোবরের ইসরাইলি পার্লামেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে দেশটির রাজনীতিকেরা এই হামলাকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন।
তিনি বলেন, ‘নেতানিয়াহু, তার লিকুদ পার্টি এবং ডানপন্থি জোটের মিত্ররা জনমত জরিপে পিছিয়ে রয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে তারা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন, এমন শক্ত অবস্থান দেখানোর চেষ্টা করছেন।’
ইসরাইলিরা ভোট দেওয়ার কয়েক দিন আগে নেতানিয়াহুকে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে বিলুপ্ত করার পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি সরাসরি উত্তর এড়িয়ে যান। তবে ওই কর্তৃপক্ষের জন্য একটি ‘বড় চমক’ অপেক্ষা করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। সূত্র: আল জাজিরা