জুলাই বিপ্লবীদের দমন-নিপীড়নে সক্রিয় ভূমিকায় থাকা পুলিশের অন্তত ৪৫ কর্মকর্তা এখনো বিভিন্ন দপ্তরে বহাল তবিয়তে আছেন। এর মধ্যে ৩৯ এসপি এবং ছয়জন অতিরিক্ত ডিআইজি রয়েছেন। এছাড়া ঘাপটি মেরে আছেন অনেক সুযোগসন্ধানী কর্মকর্তা। এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় তথ্য বাইরে পাচারের অভিযোগও রয়েছে।
ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালানোর ঘটনায় যারা সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাদের অনেকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়েছে। কেউ কারাবন্দি আছেন, কেউ বরখাস্ত হয়েছেন। বিপ্লব-পরবর্তীতে পুলিশের অনেক কর্মকর্তা কর্মক্ষেত্রে যোগ দেননি। কেউ দেশে আত্মগোপনে আবার অনেকে বিদেশে পলাতক।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগ রয়েছে, পতিত আওয়ামী সরকারের ঘনিষ্ঠভাজন কিছু পুলিশ কর্মকর্তা সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে মিশে গিয়ে খুব কৌশলে ঘাপটি মেরে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করেছেন। বর্তমান সরকারের সময়ও তারা সক্রিয় রয়েছেন।
সম্প্রতি রাজধানীর গুলশান, মিরপুর, খিলগাঁও, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল বের করার ঘটনা ঘটে। তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়ার পেছনে ওই চক্রের যোগসাজশ আছে কি না, তা তদন্ত করে দেখছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এদিকে, জুলাই বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশে শুদ্ধি অভিযান শুরু করে। বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ অভিযান অব্যাহত রেখেছে। এতে বেশকিছু কর্মকর্তাকে ইতোমধ্যে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো ও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তারা আওয়ামী আমলে বিরোধী দল দমন, গায়েবি রাজনৈতিক মামলায় সক্রিয় ভূমিকা, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন বা রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিযোগে বিতর্কিত ও অতিউৎসাহী ছিলেন।
সূত্র জানায়, জুলাই বিপ্লবের পর পুলিশ ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। পুলিশে পেশাদার কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হচ্ছে। কিছু জেলায় এর ফল পেয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি দেশের ক্রাইম জোনগুলোয় দক্ষ পুলিশ কর্মকর্তাদের পদায়নে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
তবে অপরাধ বিজ্ঞানীরা বলছেন, শুধু জুলাই আন্দোলনের জন্য নয়; পুলিশের মধ্যে যদি কোনো সদস্য অপরাধ করে পার পেয়ে যান, তাহলে বাহিনীতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাদের বিচার হওয়া জুররি।
পুলিশের ঊর্ধ্বতনরা বলছেন, বাহিনীতে যারাই অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হয় না। এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এআইজি (জনসংযোগ ও মাল্টিমিডিয়া) কামারুম মুনিরা আমার দেশকে জানান, পুলিশের কোনো সদস্য ফৌজদারি অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলার পাশাপাশি বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়। আবার কোনো পুলিশ সদস্য শৃঙ্খলাবহির্ভূত কোনো কর্মকাণ্ড করলে তদন্তসাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী যথাযথ আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়ে থাকে।
এ বিষয়ে অপরাধ বিজ্ঞানী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক জানান, অতীতে পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের বিষয়টি সামনে আসছে। এই বাহিনীর মধ্যে যারা অপরাধে জড়িত, তাদের ক্ষেত্রে কোনো দীর্ঘসূত্রতা নয়। আইন অনুযায়ী দ্রুততম সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
এখনো বহাল যারা
জুলাই বিপ্লব চলাকালীন ছাত্র-জনতার ওপর হামলা ও নির্যাতনকারী সুনামগঞ্জের এসপি এমএন মোর্শেদ পিবিআইয়ে, সাতক্ষীরার মতিউর রহমান সিদ্দিকী ঢাকার টেলিকমে, চাঁদপুরের এসপি সাইফুল ইসলাম রাজশাহীর সারদায় পুলিশ একাডেমিতে, মৌলভীবাজারের মনজুর রহমান নোয়াখালী ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে কর্মরত।
চুয়াডাঙ্গার আরএম ফয়জুর রহমান পিবিআইয়ে, নড়াইলের মেহেদী হাসান রেলওয়ে পুলিশে, মেহেরপুরের এসএম নাজমুল হক নৌ পুলিশে, পিরোজপুরের শরীফুল ইসলাম সিলেট রেঞ্জে, পাবনার আকবর আলী মুনসী লালমনিরহাট ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে, জয়পুরহাটের নূরে আলম আরআরএফ বরিশালে, ভোলার মাহিদুজ্জামান হবিগঞ্জের ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে নিযুক্ত।
ঝালকাঠির আফরুজুল হক টুটুল রাজশাহী রেঞ্জে, বরগুনার রাফিউল আলম এন্টি টেররিজম ইউনিটে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ছাইদুল হাসান ট্যুরিস্ট পুলিশে, রংপুরের ফেরদৌস আলী চৌধুরী সিএমপিতে, ঠাকুরগাঁওয়ের উত্তম প্রসাদ পাঠক ট্যুরিস্ট পুলিশে, লালমনিরহাটের সাইফুল ইসলাম সিআইডিতে, কুড়িগ্রামের আল আসাদ মাহফুজুল ইসলাম পিবিআইয়ে, পঞ্চগড়ের এসএম সিরাজুল হুদা ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টার গাজীপুরে এবং নীলফামারীর মোকবুল হোসেন ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টার কুষ্টিয়ায় কর্মরত।
সূত্র জানায়, ফরিদপুরের এসপি মোর্শেদ আলম রংপুর মেট্রোপলিটনের ডিসি, খাগড়াছড়ির মুক্তা ধর নৌ পুলিশে, রাজবাড়ীর এসপি জিএম আবুল কালাম আজাদ এপিবিএনে, মাদারীপুরের শফিউর রহমান পিটিসি খুলনায়, শরীয়তপুরের মাহবুবুল আলম ঢাকার পুলিশ স্টাফ কলেজে, নেত্রকোনার ফয়েজ আহমেদ খুলনার আরআরএফে কর্মরত।
শেরপুরের দুই এসপির মধ্যে মোনালিসা বেগম সিআইডিতে এবং আকরামুল হোসেন চট্টগ্রাম রেঞ্জে, বান্দরবানের সৈকত শাহীন শিল্পাঞ্চল পুলিশে ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শাখাওয়াত হোসেন সিআইডিতে কর্মরত আছেন।
এছাড়া টাঙ্গাইলের এসপি সরকার কায়সার পদোন্নতি পেয়ে হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি হয়েছেন। কায়সার ছাড়াও জুলাই আন্দোলন দমনে মাঠে কাজ করা আরো পাঁচ অতিরিক্ত ডিআইজি বিভিন্ন স্থানে কর্মরত।
জানা গেছে, জুলাই বিপ্লবে ছাত্র-জনতাকে দমনে দেশে পুলিশের আটটি মেট্রোপলিটন, আটটি রেঞ্জ ও ৬৪ জেলায় এসপির দায়িত্ব পালন করেন ১১৬ কর্মকর্তা। এদের মধ্যে ৩৯ এসপি ও ছয় অতিরিক্ত ডিআইজি বর্তমানে বিভিন্ন দপ্তরে স্বাভাবিক দায়িত্বে রয়েছেন।
অনেক শীর্ষ কর্মকর্তাকে পুলিশ সদর দপ্তর, এপিবিএন, রেলওয়ে পুলিশ কিংবা পুলিশ একাডেমি সারদায় ‘সংযুক্ত’ রাখা হয়েছে। জুলাই আন্দোলন দমনে সম্পৃক্ত ৩০ শতাংশের বেশি কর্মকর্তা এখনো দায়িত্বে বহাল। এরাই বাহিনীর ভেতরকার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাইরে পাচার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এমনকি বিপ্লবের পর যেসব পুলিশ কর্মকর্তা বিদেশে পালিয়েছেন, তাদের সঙ্গে এই গ্রুপের যোগাযোগ থাকার অভিযোগও রয়েছে।
এদিকে, ঘাপটি মেরে থাকা এই সুযোগসন্ধানী কর্মকর্তাদের নিয়ে পুলিশের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি রয়েছে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর বহুল বিতর্কিত ডিএমপির পলাতক যুগ্ম কমিশনার (ট্রাফিক-দক্ষিণ) এসএম মেহেদী হাসান এবং গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশ-২-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রহমত উল্লাহ চৌধুরীকে বরখাস্ত করা হয়। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর মেহেদী হাসান পলাতক ছিলেন। রহমত উল্লাহ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে কর্মক্ষেত্রে যোগ দেননি।
পুলিশে শুদ্ধি অভিযান
আওয়ামী সরকারের পতনের পরদিন তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে তার পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৩ আগস্ট পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের প্রধান মনিরুল ইসলাম ও ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানকে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।
এরপর থেকে পর্যায়ক্রমে পুলিশে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো ও বরখাস্তের ঘটনা ঘটছে। চলতি বছরের ১২ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করে ছয় পুলিশ কর্মকর্তাকে বরখাস্তের আদেশ দেওয়া হয়। তারা হলেন—ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার ও সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, খুলনা রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ের পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেন, চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত কাজী আশরাফুল আজিম, কক্সবাজার ৮ এপিবিএনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাজন কুমার দাস এবং মতিঝিল জোনের সহকারী কমিশনার গোলাম রুহানি।
এছাড়া গত সেপ্টেম্বরে সাত পুলিশ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়। এদের মধ্যে ঢাকা জেলার সাবেক এসপি মো. আসাদুজ্জামান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাসান আরাফাত, অতিরিক্ত ডিআইজি এসএম মেহেদী হাসান ও এডিসি রহমত উল্লাহ চৌধুরী উল্লেখ্যযোগ্য।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আরো শতাধিক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর চিন্তা আছে সরকারের। ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭০ জনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হতে পারে। বাকি ৩০ জনকে বিভিন্ন অভিযোগে বরখাস্ত করা হতে পারে। শিগগির প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিষয়টি জানানো হবে বলে জানা গেছে।
যাদের বাধ্যতামূলক অবসর অথবা বরখাস্ত করা হবে, তারা আওয়ামী সরকারের আমলে অতিউৎসাহী পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
