উচ্চশিক্ষার জন্য একসাথে অনেক শিক্ষক বিদেশে গবেষণার উদ্দেশ্যে শিক্ষাছুটিতে থাকায় নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে তীব্র শিক্ষক সংকট তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো বিভাগে মোট শিক্ষকের একটি বড় অংশ (অর্ধেকের বেশি) দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে অবস্থান করায় সীমিত জনবল নিয়ে নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা ও গবেষণার মতো একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হিমশিম খাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্তৃপক্ষ। এর ওপর প্রশাসনিক দায়িত্ব, জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতি এবং কিছু শিক্ষকের ক্লাসে অনুপস্থিতি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, নোবিপ্রবির মোট ৪২৮ জন শিক্ষক পদের বিপরীতে বর্তমানে ১২৮ জন শিক্ষক বিভিন্ন ছুটিতে দেশের বাইরে বা শিক্ষাছুটিতে রয়েছেন, যা মোট শিক্ষকের ৩০.১৪ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৩ ভাগের ১ ভাগ। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ব্যবসায় প্রশাসন (DBA) বিভাগে ১৫ জনের মধ্যে ৯ জন শিক্ষক ছুটিতে (৬০.০০%), অর্থনীতি বিভাগে ১৮ জনের মধ্যে ১০ জন (৫৫.৫৬%), অণুজীববিজ্ঞান (MBG) বিভাগে ২৩ জনের মধ্যে ১১ জন (৪৭.৮৩%), বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং (BGE) বিভাগে ২০ জনের মধ্যে ৮ জন (৪০.০০%) এবং বায়োকেমিস্ট্রি এন্ড মলিকুলার বায়োলজি (BMB) বিভাগে ১০ জনের মধ্যে ৪ জন শিক্ষক ছুটিতে (৪০.০০%) রয়েছেন।
এছাড়া বাংলা বিভাগে ১৪ জনের মধ্যে ৫ জন (৩৫.৭১%), ফুড টেকনোলজি এন্ড নিউট্রশন সায়েন্স (FTNS) বিভাগে ১৮ জনের মধ্যে ৬ জন (৩৩.৩৩%), কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং (CSTE) বিভাগে ১৫ জনের মধ্যে ৫ জন (৩৩.৩৩%), ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (EEE) বিভাগে ১২ জনের মধ্যে ৪ জন (৩৩.৩৩%), ইন্সটিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি (IIT) তে ১২ জনের মধ্যে ৪ জন (৩৩.৩৩%), ম্যানেজমেন্ট এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেম (MIS) বিভাগে ৯ জনের মধ্যে ৩ জন (৩৩.৩৩%), ফার্মেসিতে ২৩ জনের মধ্যে ৭ জন (৩০.৪৩%), ফলিত গণিতে ১৭ জনের মধ্যে ৫ জন (২৯.৪১%), ফিশারিজ এন্ড মেরিন সাইন্স (FIMS) ও এসিএসই (ACCE) উভয় বিভাগে ২৪ জনের মধ্যে ৭ জন করে (২৯.১৭%), প্রাণিবিদ্যা ও সমাজবিজ্ঞানে ৭ জনের মধ্যে ২ জন করে (২৮.৫৭%), ইন্সটিটিউট অব ইনফরমেশন সায়েন্স (IIS) এ ১১ জনের মধ্যে ৩ জন (২৭.২৭%), পরিসংখ্যান বিভাগে ১২ জনের মধ্যে ৩ জন (২৫%), পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা (ESDM) বিভাগে ১৭ জনের মধ্যে ৪ জন (২৩.৫৩%), ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট (THM) এ ৯ জনের মধ্যে ২ জন (২২.২২%), ইনফরমেশন এন্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং (ICE) ও কৃষিতে ১৪ জনের মধ্যে ৩ জন করে (২১.৪৩%), ইংরেজিতে ১৯ জনের মধ্যে ৪ জন (২১.০৫%), ওশানোগ্রাফিতে ১১ জনের মধ্যে ২ জন (১৮.১৮%), রসায়ন, আইন, শিক্ষা ও শিক্ষা প্রশাসন বিভাগে ৭ জনের মধ্যে ১ জন করে (১৪.২৯%) এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ১২ জনের মধ্যে ১ জন (৮.৩৩%) শিক্ষক ছুটিতে রয়েছেন, যেখানে পদার্থবিজ্ঞান ও সমাজকর্ম বিভাগে বর্তমানে কোনো শিক্ষক ছুটিতে নেই। এছাড়া মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিজ্ঞান (SWES) বিভাগে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে রয়েছেন ১ জন।
শিক্ষাছুটি ও সাধারণ ছুটির বাইরেও শিক্ষক সংকটের পেছনে অন্যান্য কারণের মধ্যে রয়েছে ২০২৪ এর জুলাই অভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়ে অফলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ না নেওয়া FIMS বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আনিসুজ্জামান (রিমন), রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. নেওয়াজ মোহাম্মদ বাহাদুর এবং আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বাদশা মিয়া।
অন্যদিকে FIMS বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর সরকার সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সুবিপ্রবি) প্রো-ভিসি এবং ফলিত গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ হানিফ (মুরাদ) লক্ষ্মীপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (লবিপ্রবি) ভিসি পদে প্রেষণে নিযুক্ত রয়েছেন।
একাধিক বিভাগে শিক্ষক ঘাটতি থাকায় বাধ্য হয়ে অস্থায়ী শিক্ষক দিয়ে ক্লাস পরিচালনা করতে হচ্ছে। বর্তমানে অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি এন্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ (ACCE) ২ জন, পরিসংখ্যানে ১ জন, ইন্সটিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি (IIT)-তে ১ জন, ইন্সটিটিউট অব ইনফরমেশন সায়েন্স (IIS)-এ ২ জন, শিক্ষা প্রশাসনে ১ জন, বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি (BMB)-তে ১ জন, সয়েল, ওয়াটার এন্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সে (SWES) ১ জন এবং রসায়নে ১ জন অস্থায়ী শিক্ষক দিয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
শিক্ষকদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও একাডেমিক সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, একই সাথে কোনো বিভাগের বড় অংশের শিক্ষক বাইরে থাকায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান, গবেষণা তত্ত্বাবধান ও একাডেমিক গাইডেন্সে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে একটি বিভাগ থেকে একসাথে কতজন শিক্ষক শিক্ষাছুটিতে বা বাইরে থাকতে পারবেন এবং শূন্যপদগুলোতে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ বা বিকল্প ব্যবস্থার বিষয়ে আরও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যবসায় প্রশাসন (DBA) বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, কিছু বিষয়ে মাত্র একজন শিক্ষক থাকায় তাকে একাধিক ব্যাচে পাঠদান করতে গিয়ে অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে এবং বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর পাঠদান ও সিলেবাস সম্পন্ন করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। তারা শিক্ষকদের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার বিরোধিতা না করে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা যেন ব্যাহত না হয় তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দ্রুত শিক্ষক সংকট নিরসন, প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ এবং বিকল্প শিক্ষক দিয়ে নিয়মিত ক্লাস পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন।
মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, শিক্ষাছুটি দীর্ঘমেয়াদী হওয়ায় এবং সেই শূন্যস্থান তাৎক্ষণিকভাবে পূরণ না হওয়ায় কর্মরত শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। প্রতিটি বিভাগে ছয় থেকে সাতটি ব্যাচ সচল থাকায় এবং ক্লাসরুম সংকটের কারণে সীমিত শিক্ষক দিয়ে নিয়মিত ক্লাসগুলো সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। তাই উচ্চশিক্ষায় যাওয়া শিক্ষকদের বিপরীতে বিকল্প বা খণ্ডকালীন (গেস্ট) শিক্ষক রাখার ব্যবস্থা করার জন্য তারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান, যাতে নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত না হয়।
শিক্ষক সংকট ও শিক্ষাছুটি প্রসঙ্গে ভিসি অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী বলেন, শিক্ষাছুটি শিক্ষকদের একটি পাওনা ও একাডেমিক উৎকর্ষের জন্য জরুরি বিষয় এবং আইনগতভাবেও শিক্ষকদের বিদেশ যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। শিক্ষাছুটির বিকল্প বা শিক্ষক ঘাটতি মেটাতে ইউজিসির সাথে আলোচনা সাপেক্ষে শিক্ষক নিয়োগ কিংবা প্রয়োজনে ইউজিসির অনুমোদনক্রমে গেস্ট শিক্ষক বা বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে শূন্যতা পূরণ করা হবে।
