ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ২৯ অক্টোবর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিয়ে বিজয় নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন; তিনি দুর্নীতি ও দলীয়করণের কারণে কৃষকেরা সার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন, আর পৃথক মতবিনিময় সভায় জামায়াত নেতারা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নাগরিক অধিকার নিশ্চিতের কথা তুলে ধরেন।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ১১ দলীয় ঐক্য সমর্থিত জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য দেলাওয়ার হোসেন বলেছেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে ফলাফল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে দাঁড়িপাল্লাকে পরাজিত করা হয়েছে। এবারের উপনির্বাচনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিয়ে জনগণের বিজয় বুঝে নিতে হবে।
তিনি বলেন, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও দলীয়করণের প্রতিবাদে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের জনগণ আগামী ২৯ অক্টোবর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিয়ে বিজয় নিশ্চিত করতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। জনতার ঐক্য দেখে নিজেদের নিশ্চিত পরাজয় বুঝতে পেরে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের লেলিয়ে দিয়ে দাঁড়িপাল্লার প্রচারণা বন্ধের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কিন্তু কোনো বাধা বা হুমকি জনগণকে দমাতে পারবে না। মাদক ও সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত এবং চাঁদাবাজদের গডফাদারদের পরাজয় ঠেকানো যাবে না।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিকেলে ঠাকুরগাঁওয়ের ঢোলার হাট ইউনিয়নের বানিয়াপাড়ায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনী উঠান বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি আরও বলেন, এবারের নির্বাচন মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে।
দেলাওয়ার হোসেন বলেন, দুর্নীতি ও দলীয়করণের কারণেই কৃষকেরা সার পাচ্ছেন না। বিএনপি সরকার গঠনের মাত্র সাত মাসের মাথায় দেশের প্রতিটি খাতে সংকট সৃষ্টি হয়েছে। যেদিকে হাত দেবেন, শুধু ‘নাই আর নাই’—গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই, তেল নেই, সার নেই। বিএনপির শাসনামলে সারের জন্য রাজপথে কৃষকদের জীবন দিতে হয়েছে। এখনো সারের জন্য কৃষকদের আন্দোলন করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদনের জন্য সরকার সার ও কীটনাশক সরবরাহ করতে না পারলে দেশে কী পরিমাণ খাদ্যসংকট তৈরি হবে, তা বিএনপি সরকার চিন্তাও করে না। কৃষিপণ্যের সুষ্ঠু বণ্টন ছাড়া কৃষকের উন্নতি সম্ভব নয়। কিন্তু সরকারের দুর্নীতি ও দলীয়করণের কারণে জনগণকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
দেলাওয়ার হোসেন আরও বলেন, একজন ব্যবসায়ীকে সারের ডিলারশিপ পেতে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হলে ওই ব্যবসায়ী সার নিয়ে সিন্ডিকেট করবেনই। সরকার একদিকে দুর্নীতির মাধ্যমে ডিলারশিপ দিচ্ছে, অন্যদিকে বেছে বেছে নিজেদের দলীয় সংসদ সদস্যদের আত্মীয়স্বজনকে সারের ডিলার হিসেবে নিয়োগ দিচ্ছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে এক সংসদ সদস্যের স্ত্রী, ভাই, ছেলে ও পুত্রবধূকে সারের ডিলার নিয়োগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ে সরকারদলীয় ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে কৃষকেরা সার ও কীটনাশক পাবেন না। দলীয়করণ ও আত্মীয়করণের মাধ্যমে সবকিছু পাচার হয়ে যাবে। তবে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক বিজয়ী হলে ঠাকুরগাঁওয়ে কোনো দুর্নীতি, অনিয়ম, আত্মীয়করণ ও দলীয়করণ চলবে না বলে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন। এ সময় আগামী ২৯ অক্টোবর দলমত, ধর্মবর্ণ ও জাতিগোষ্ঠী নির্বিশেষে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিয়ে বিজয় নিশ্চিত করতে স্থানীয়দের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে জামায়াতের মতবিনিময়
এর আগে দুপুরে ভুল্লী উপজেলার শুখান পুকুরী ইউনিয়ন জামায়াতের উদ্যোগে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন।
তিনি বলেন, সারা দেশে জামায়াতে ইসলামীর ৬৮ জন নির্বাচিত সংসদ সদস্য রয়েছেন। তাঁদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সমান সুযোগ-সুবিধা, নাগরিক অধিকার ও মর্যাদা পাচ্ছেন।
তিনি উপস্থিত ব্যক্তিদের উদ্দেশে প্রশ্ন করেন, কাউকে বোরকা পরতে বাধ্য করা হচ্ছে কিংবা হিন্দুদের বাড়িঘর জামায়াতের নেতাকর্মীরা দখল করেছেন—এমন কোনো সংবাদ তাঁরা শুনেছেন কি না। জবাবে উপস্থিত শত শত হিন্দু ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষ একবাক্যে ‘না’ বলেন।
ড. হেলাল উদ্দিন বলেন, জামায়াতে ইসলামী নয়, বরং যারা হিন্দুদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছিল এবং জামায়াতের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার চালিয়েছে, তারাই হিন্দুদের সম্পদ দখল করেছে, বাড়িঘর ভাঙচুর করেছে এবং তাঁদের ওপর জুলুম করেছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে মূল্যায়ন না করে সংখ্যালঘু হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে, যা জাতির জন্য লজ্জার।
তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী জাতিগত বিভাজন কিংবা ধর্মীয় মূল্যবোধে আঘাত হানায় বিশ্বাসী নয়। দলটি বিশ্বাস করে, সমাজের প্রতিটি মানুষ রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে এক ও অভিন্ন। দলমত, ধর্মবর্ণ ও জাতিগোষ্ঠী নির্বিশেষে আগামী ২৯ অক্টোবর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু ভোট দিলেই নাগরিকের দায়িত্ব শেষ হয় না। নিজের ভোট যাতে লুট হতে না পারে এবং কেউ যেন ইঞ্জিনিয়ারিং করে ফলাফল পাল্টে দিতে না পারে, সে বিষয়েও স্থানীয়দের সতর্ক থাকতে হবে।
শুখান পুকুরী ইউনিয়ন জামায়াতের আমির মাওলানা আব্দুস সামাদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের মধ্যে বক্তব্য দেন ধর্ম নারায়ণ মাস্টার, অতুল চন্দ্র অধিকারী, মানিক রায় ও অখিল রায় প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ে জামায়াতে ইসলামীর কোনো নেতাকর্মী হিন্দুদের ওপর জুলুম করেননি। বরং হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের বিপদ-আপদে জামায়াতের নেতৃবৃন্দ মানবিক সহায়তা করেছেন।
সভায় জামায়াতে ইসলামীর জেলা সেক্রেটারি আলমগীর হোসেনসহ স্থানীয় ১১ দলীয় ঐক্যের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
