ঝাড়গ্রামের বেবি সিংহের প্রতিমাই এখন পাড়ি দিচ্ছে মণ্ডপেEi Samay
Published on
:
2 min read
বুদ্ধদেব বেরা, ঝাড়গ্রাম
হাতে ছিল প্রতিমা গড়ার বেশ কিছু বরাত। সে ভাবেই কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে মৃৎশিল্পীর স্ত্রীর। কী করবেন, কী ভাবে কাজ শেষ হবে কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। কিন্তু স্বামীর মূর্তি গড়া দেখতেন প্রায়ই। তা দেখেই শিখেছিলেন কিছু কাজ। তাতেই ভরসা। নিজের মনের জোরে মহিলা ঠিক করেন এ বার প্রতিমা গড়বেন তিনি নিজে। ঝাড়গ্রামের বেবি সিংহের প্রতিমাই এখন পাড়ি দিচ্ছে মণ্ডপে।
বেবির কথায়, 'মাটির প্রতিমার মধ্যে আজও বেঁচে রয়েছেন আমার স্বামী শিবশঙ্কর সিংহ। ঝাড়গ্রামের নতুনডিহির চার দশকের মৃৎশিল্পী আমার স্বামী। প্রতিমার কাঠামো গড়েই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি। স্বামীর ফেলে যাওয়া কাজ শে করতে পেরে ভালো লাগছে।'
নতুনডিহিতে শিবশঙ্করের মৃৎশিল্পালয়। যেখানে তিনি তিন দশক ধরে নানা প্রতিমা গড়তেন। এ বছর পুজোর প্রতিমা গড়ার বায়না নিয়ে প্রতিমার কাঠামো তৈরির কাজও শুরু করেছিলেন। কিন্তু হঠাৎই থেমে যায় জীবন। ২৫ ফেব্রুয়ারি তিনি মারা যান। এরপরেই বেবি সিদ্ধান্ত নেন প্রতিমা গড়ার। ঘরে রাখা শিবশঙ্করের ডায়েরিতে লেখা ছিল কিছু পুজো কমিটির নাম ও ফোন করে বেবি স্বামীর মৃত্যুর কথা জানান। অনেকে বরাত তুলে নিলেও কিছু উদ্যোক্তা ভরসা করেন বেবিকে।
তার মধ্যে ঝাড়গ্রাম শহরের একটি মহিলা পরিচালিত পুজো কমিটি বেবিকেই তাঁর স্বামীর অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করার কথা বলেন। শিবশঙ্করের সঙ্গে তিরিশ বছরের সংসারে মূর্তি গড়ার কাজে সহযোগিতা করতে করতেই অনেক কিছুই শিখে নিয়েছিলেন একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের কর্মী বেবি। ভেবেছিলেন স্কুল আর স্বামীর কাজে সাহায্য করেই জীবন কেটে যাবে তাঁর। কিন্তু কে জানত পঁয়ষট্টি বছর ব্যস্ত। তাঁকে সাহায্য করছেন মৃৎশিল্পী গোপাল শীট। তিনি বহুদিন ধরেই শিবশঙ্করের কাছে কাজ করেন। স্কুলের কাজ সামলে বেবি প্রতিমা গড়ার কাজে হাত লাগান। মহালয়ার দিন তুলি হাতে প্রতিমার চক্ষুদান করেন বেবি। বেবি বলেন, 'ওঁর সঙ্গে দীর্ঘ তিরিশটা বছর থেকে প্রতিমা গড়ার কাজ অনেকটাই শিখেছিলাম। সকলে সাহস জুগিয়েছে। তাই কাজ শেষ করতে পেরেছি। প্রতিমা এখন মণ্ডপের পথে।'
প্রতি বছর শিবশঙ্কর ২০ থেকে ২৫টি প্রতিমা তৈরি করতেন। বেবি এ বছর ছয়টি প্রতিমা গড়েছেন। জামবনি ব্লকের নুনিয়া এবং ঝাড়গ্রাম গ্রামীণ ব্লকের লোধাশুলি ও ঝাড়গ্রাম শহরের বিভিন্ন পুজো মণ্ডপে যাচ্ছে বেবির তৈরি প্রতিমা। নুনিয়া সর্বজনীন দুর্গোৎসব পুজো কমিটির সদস্য আকাশ পানি বলেন, 'কয়েক বছর ধরে শিবশঙ্কর আমাদের প্রতিমা তৈরি করেন। ওঁর মৃত্যুর পরে চিন্তায় পড়েছিলাম। ওঁর স্ত্রী যখন জানালেন তিনি প্রতিমা গড়বেন। আমরা মনে করেছিলাম ঠিক হবে তো? এ দিন প্রতিমা দেখে আমরা অবাক হয়েছি। দেখে মনে হলো যেন শিবশঙ্করই প্রতিমা গড়েছেন।'
বেবি জানান, শিবশঙ্করের এই মৃৎশিল্পালয়ে সারা বছর প্রতিমা গড়া হবে। শিবশঙ্করের গড়া মৃৎশিল্পালয় বন্ধ হবে না। বেবির কথায়, 'শরীর যতদিন সঙ্গ দেবে এই মৃৎশিল্পালয় চালু থাকবে।