যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ১০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার সম্ভাবনা দেখছে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)। এজন্য দেশটির মোট আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ বর্তমানের ০.৪৯ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখে তৈরি পোশাকের বাইরে অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতের রপ্তানি বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তারা বলছেন, যুক্তরাজ্যের বাজারে রপ্তানি বাড়াতে পণ্যের আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা, সনদায়ন ও পরীক্ষার ব্যবস্থা আধুনিক করা, কমপ্লায়েন্স পরিপালন এবং শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর করা জরুরি। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যের ডেভেলপিং কান্ট্রিজ ট্রেডিং স্কিমের (ডিসিটিএস) সুবিধা কাজে লাগাতে রপ্তানিকারকদের এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।
বুধবার (১৪ নভেম্বর) ঢাকায় ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) অডিটোরিয়ামে ‘যুক্তরাজ্যের বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধি: তৈরি পোশাক ব্যতীত অন্যান্য খাতের সম্ভাবনা’ শীর্ষক এক কর্মশালায় এসব কথা বলেন বক্তারা। ডিসিসিআই, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও বাংলাদেশে ব্রিটিশ হাইকমিশন যৌথভাবে এ কর্মশালার আয়োজন করে।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসান আরিফ।
তিনি জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ছিল ৪ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের অবদান ৯৪ শতাংশ। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের মোট আমদানির পরিমাণ ৯৪৮ বিলিয়ন ডলার হলেও বাংলাদেশ থেকে দেশটির আমদানির অংশ মাত্র ০.৪৯ শতাংশ।
মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, যুক্তরাজ্যের মোট আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ ১ শতাংশে উন্নীত করা গেলে দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এ লক্ষ্য অর্জনে রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণের পাশাপাশি শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্যের বাজারে রপ্তানি বাড়াতে ওষুধ, খাদ্য ও হিমায়িত খাদ্য, চিংড়ি, কৃষিপণ্য, বাইসাইকেল, হালকা প্রকৌশল ও প্লাস্টিক পণ্যের মতো খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হবে। শুধু একটি পণ্যের ওপর নির্ভর না করে সামগ্রিক রপ্তানি বাড়ানোর জন্য পণ্যের মূল্যশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরীক্ষা ও সনদায়ন সুবিধা এবং যুক্তরাজ্যের বাজারের নীতিমালা সম্পর্কে রপ্তানিকারকদের ধারণা বাড়ানো জরুরি।
এছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন এবং রপ্তানিকারকদের দক্ষতা উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দেন ইপিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।
কর্মশালায় ডিসিসিআইয়ের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, “যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো প্রধানত তৈরি পোশাকনির্ভর। অন্যান্য পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পণ্যের গুণগত মান, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ, সনদায়ন, পণ্যের উৎস ও সরবরাহ শৃঙ্খলের অনুসরণযোগ্যতা, প্যাকেজিং ও ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে উন্নতি করতে হবে।”
তিনি বলেন, “যুক্তরাজ্যের বাজার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ এবং কমপ্লায়েন্স পরিপালনের সক্ষমতাও বাড়ানো প্রয়োজন। দেশটির ডিসিটিএসের আওতায় বাজারে প্রবেশের যে সুযোগ রয়েছে, তা কাজে লাগাতে উদ্যোক্তাদের প্রস্তুতি নিতে হবে।”
পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে বিদ্যমান শুল্ক ও অশুল্ক প্রতিবন্ধকতা দূর করার ওপর জোর দেন তিনি।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার জেমস গোল্ডম্যান বলেন, “যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক এবং ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ও বিনিয়োগ অংশীদারত্ব রয়েছে। বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের পরও যুক্তরাজ্যের বাজারে প্রবেশাধিকার অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগের জন্য সুযোগ তৈরি হবে।”
এ সুযোগ কাজে লাগাতে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা এগিয়ে আসবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
কর্মশালায় যুক্তরাজ্যের ডিসিটিএস নিয়ে কারিগরি অধিবেশন পরিচালনা করেন ব্রিটিশ হাইকমিশনের দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলের বাণিজ্য উন্নয়নবিষয়ক আঞ্চলিক উপদেষ্টা এলি পার্কার। এতে ডিসিটিএসের আওতায় বর্তমানে এবং এলডিসি থেকে উত্তরণের পর যুক্তরাজ্যের বাজারে প্রবেশের সুযোগ, অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধা গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং বাজার সম্প্রসারণে রপ্তানিকারকদের করণীয় তুলে ধরা হয়।
কর্মশালার আলোচনায় বক্তারা বলেন, অপ্রচলিত বা তৈরি পোশাকবহির্ভূত রপ্তানি বাড়াতে পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থা, বেসরকারি খাত ও উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। বিশেষ করে এলডিসি উত্তরণের পর রপ্তানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে বিদ্যমান অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট-চট্টগ্রামের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম, ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক অমৃতা মাকিন ইসলাম, হরটেক্স ফাউন্ডেশনের পরিচালক খুরশিদ আহমদ ফারহাদ, মেঘনা গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ মুস্তাক আহমেদ তানভীর, কাপকেক এক্সপোর্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়াসির ওবায়েদ, এম ইউ সি ফুডস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শ্যামল দাস এবং বাংলাদেশ ফ্লেক্সিবল প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাফিউস সামি আলমগীর।
কর্মশালায় ডিসিসিআইয়ের সহ-সভাপতি মো. সালিম সোলায়মান, পরিচালনা পর্ষদের সদস্য, ইপিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
