চাঁদপুর: ঢাকঢোল, বাদ্যযন্ত্রের তালে আনন্দ-উচ্ছ্বাস আর ভক্তদের অশ্রুসিক্ত বিদায়ের মধ্য দিয়ে চাঁদপুরে সম্পন্ন হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার প্রতিমা বিসর্জন।
বুধবার (২১ অক্টোবর) সন্ধ্যার পর চাঁদপুর শহরের চৌধুরী ঘাট এলাকায় ডাকাতিয়া নদীতে একে একে প্রায় ২৫টি মণ্ডপের প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় ছয় দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।
প্রতিমা বিসর্জন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চাঁদপুর-৩ (সদর-হাইমচর) আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিক।
তিনি বক্তব্যে বলেন, ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার-এই চেতনাকে ধারণ করে আমাদের সবাইকে মিলেমিশে বসবাস করতে হবে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন অটুট রাখতে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। কোনো অপশক্তি যেন ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এ দেশে সব ধর্মের মানুষ নিজ নিজ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান স্বাধীনভাবে পালন করবেন-এটাই আমাদের প্রত্যাশা। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হবে। হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে শান্তিপূর্ণ সমাজ ও সমৃদ্ধ দেশ গড়ে তুলতে হবে।
শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিক বলেন, শারদীয় দুর্গোৎসব শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও মানবিক মূল্যবোধেরও বার্তা বহন করে। উৎসবের আনন্দ সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। চাঁদপুরে সব ধর্মের মানুষের মধ্যে যে সম্প্রীতি রয়েছে, তা ভবিষ্যতেও অটুট রাখতে হবে।
চাঁদপুর জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সুভাষ চন্দ্র রায়ের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিক।
স্বাগত বক্তব্য রাখেন জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তমাল কুমার ঘোষ।
চাঁদপুর পৌর পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি নেপাল সাহা ও সাধারণ সম্পাদক সুমন সরকার জয়ের যৌথ পরিচালনায় বক্তব্য রাখেন জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান, পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান, জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সিনিয়র সহ-সভাপতি নরেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তী, সহ-সভাপতি পরেশ চন্দ্র মালাকার, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোপাল চন্দ্র সাহা, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক কার্তিক চন্দ্র সরকার, কালীবাড়ি মন্দিরের পক্ষে শিবু মজুমদার, কুনবডুবাড়ি মন্দিরের পক্ষে বাদল সাহা, লোকনাথ বহ্মচারী মন্দিরের পক্ষে রঞ্জিত সাহা মুন্না, পুষ্পাঞ্জলি সংঘের পক্ষে সুজিত চন্দ্র বর্মন প্রমুখ।
বিসর্জনস্থলের প্যান্ডেলে উপস্থিত ছিলেন নৌ পুলিশ সুপার মুশফিকুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) একরামুল সিদ্দিক, চাঁদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম এন জামিউল হিকমা, জেলা বিএনপির সহসভাপতি খলিলুর রহমান গাজী এবং সদর উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক লক্ষ্মণ চন্দ্র সূত্রধরসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সনাতন ধর্মাবলম্বী নেতারা।
এর আগে বুধবার সকালে চাঁদপুর শহরের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে মহাদশমীর বিহিত পূজা অনুষ্ঠিত হয়। পূজা-অর্চনা শেষে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানোর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এ সময় নারীরা দেবীর চরণে সিঁদুর অর্পণ করেন এবং সিঁদুর খেলায় অংশ নেন। বিকেলে প্রতিমা নিয়ে বের করা হয় আনন্দ শোভাযাত্রা। শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে প্রতিমাগুলো চৌধুরী ঘাট এলাকায় নিয়ে আসা হয়। সন্ধ্যার পর ডাকাতিয়া নদীতে একে একে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়।
বিসর্জনকে কেন্দ্র করে চৌধুরী ঘাট এলাকায় সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। ঢাকঢোল, ব্যান্ড পার্টি ও ধর্মীয় গানের তালে তালে নেচে-গেয়ে আনন্দ প্রকাশ করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। প্রিয় দেবীকে বিদায় জানাতে ঘাটে ভিড় করেন বিপুলসংখ্যক ভক্ত ও দর্শনার্থী। আনন্দের পাশাপাশি বিদায়ের মুহূর্তে অনেক ভক্তের চোখে ছিল অশ্রু ও বিষাদের ছাপ।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, বিজয়া দশমী শুধু দেবী দুর্গার বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং মানুষের অন্তরের অসুরিক প্রবৃত্তি—কাম, ক্রোধ, হিংসা ও লালসা বিসর্জন দেওয়ারও প্রতীক। সব ধরনের হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার করে পারস্পরিক সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ব ও শান্তি প্রতিষ্ঠাই এ উৎসবের মূল তাৎপর্য।
শাস্ত্রীয় রীতি অনুসারে, দশমীর দিন দেবী দুর্গাকে সিঁদুর, পান ও মিষ্টি নিবেদন করে বিদায় জানান নারীরা। এরপর একে অপরকে সিঁদুর পরিয়ে দেন এবং দেবীর আশীর্বাদ কামনা করেন। এভাবেই পূজা, আরাধনা, সিঁদুর খেলা ও বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব।
ফম/এমএমএ/
