সমুদ্র দেখতে এসে আনন্দের স্মৃতি নিয়ে বাড়ি ফেরার কথা ছিল তাদের। কিন্তু কক্সবাজারে বেড়াতে এসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারালেন ১০ পর্যটক। তাদের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন। প্রিয়জনদের হারিয়ে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে হাসপাতাল ও ঘটনাস্থলের পরিবেশ।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটোয়ারটেক সৈকতে টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। আগুনে প্রাণহানির কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন- ঢাকার বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), নাফিসতা মীম (২৭), ফারিহা কবির (৩৩) এবং পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ। তারা সবাই একই পরিবারের সদস্য।
এ ছাড়া নাসরিন আক্তার মুক্তা (২৯) নামে এক স্কুলশিক্ষকের মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে। তিনি ঢাকার আশুলিয়ার স্বপ্নবিলাস নিরিবিলি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। তার স্বামী দেওয়ান ফয়সাল ঢাকা জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি। অপর দুই পর্যটকের নাম জিহাদ হাওলাদার ও আকিবুল ইসলাম বলে জানা গেছে।
স্ত্রী-স্বজনকে হারিয়ে আহাজারি
অগ্নিকাণ্ডে স্ত্রীসহ ছয় স্বজনকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন আশিকুল ইসলাম। ঢাকার বনশ্রী থেকে স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের নিয়ে তিনি কক্সবাজারে বেড়াতে এসেছিলেন। গত বৃহস্পতিবার তারা কক্সবাজারে আসেন এবং শনিবার তাদের ঢাকায় ফেরার কথা ছিল।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আশিকুল জানান, সকালে আগুন দেখে তার স্ত্রী তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দেন। এরপর তিনি পাশের কক্ষে থাকা স্বজনদের সতর্ক করতে যান। একপর্যায়ে জানালা ভেঙে নিচে লাফ দিয়ে বের হতে পারলেও স্ত্রীকে আর উদ্ধার করতে পারেননি।
বান্ধবীরা বেরিয়ে গেলেও রক্ষা হয়নি স্কুলশিক্ষিকার
সাভারের স্কুলশিক্ষিকা নাসরিন তার ছোটবেলার দুই বান্ধবীর সঙ্গে কক্সবাজারে বেড়াতে এসেছিলেন।
বান্ধবীদের বরাত দিয়ে স্বামী ফয়সাল জানান, গত বৃহস্পতিবার তারা রিসোর্টটিতে ওঠেন। শনিবার সকালে দুই বান্ধবী কক্ষ থেকে বের হলেও নাসরিন ভেতরে ছিলেন। আগুন ছড়িয়ে পড়ায় তিনি আর বের হতে পারেননি। তাদের রোববার ফিরে যাওয়ার কথা ছিল।
আহত ছয়জন হাসপাতালে
অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ ছয়জনকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে রয়েছেন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দিন (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)।
যেভাবে সূত্রপাত আগুনের
স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য অনুযায়ী, সকালে রিসোর্টটিতে আগুনের সূত্রপাত হয়। অল্প সময়ের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে কাঠের তৈরি ভবনের বিভিন্ন অংশে। রিসোর্টটির নিচতলায় রেস্তোরাঁ এবং ওপরের দুই তলায় পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা আগুনের সময় কয়েকটি বিকট শব্দ শোনার কথা জানিয়েছেন। রিসোর্টের পাশে থাকা একটি কনফেকশনারি দোকানও অগ্নিকাণ্ডে আংশিক পুড়ে গেছে।
দোকানের মালিক স্থানীয় বাসিন্দা গিয়াসউদ্দিন জানান, ‘ঘুমে ছিলাম, স্ত্রী আগুনের খবর পেয়ে আমাকে ডেকে দিলে দৌড়ে এসে দেখি পাশের রিসোর্ট পুড়ছে। বড় ক্ষতি না হলেও আমার দোকানের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’ রিসোর্টটিতে আগুন কীভাবে লেগেছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান বলেন, প্রাথমিকভাবে রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র ছিল না
অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্টটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ জানিয়েছেন, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র ছিল না। গত জুনে পরিদর্শনের পর স্থাপনাটিকে অনিরাপদ উল্লেখ করে সতর্কতামূলক নোটিশ দেওয়া হয়েছিল।
তিনি জানান, তিনতলা কাঠের ভবনটির নিচতলায় রেস্তোরাঁ এবং ওপরের দুই তলায় পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ও অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের স্থাপনা পরিচালনা ঝুঁকিপূর্ণ।
ছিল না কউকের অনুমোদনও, পলাতক মালিক
নিয়মের তোয়াক্কা না করে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) এর অনুমোদন ছাড়াই দুই বছর ধরে রিসোর্ট পরিচালনা করে আসছিলেন মালিক চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর বাসিন্দা তানভীর আহমেদ। ঘটনার পর থেকেই তিনি পলাতক রয়েছেন এবং তার প্রতিষ্ঠান থেকেও দুর্ঘটনার পর আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি।
কউকের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার জসিম উদ্দিন জানান, প্রতিষ্ঠানটির কোনো বৈধ অনুমোদন ছিল না। এ ব্যাপারে নোটিশ দেওয়া হলেও মালিক কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটি না সরিয়ে অবৈধভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল।
তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি
অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান জানান, তদন্তে আগুনের সূত্রপাত, প্রাণহানির কারণ, রিসোর্টের অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা এবং জরুরি অবস্থায় পর্যটকদের বের হওয়ার সুযোগ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় টুপটুপের ম্যানেজার সুমনকে শনিবার সন্ধ্যায় গ্রেপ্তার করেছে উখিয়া থানা পুলিশ। এ ঘটনায় একটি মামলা প্রক্রিয়াধীন বলে জানিয়েছেন উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান।
The post ছিল না অনুমোদন, অনিরাপদ ঘোষণার পরও চালু ছিল টুপটুপ appeared first on আমাদের রামু.
