আমার কাছে ভ্রমণ মানে শুধু এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়া নয়। ভ্রমণ মানে অজানাকে আবিষ্কার করা, মানুষের জীবনের কাছাকাছি যাওয়া এবং কখনো কখনো নিজের ভয়কেও সঙ্গে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া।
বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে বিশ্বের ১৬১টি দেশ ভ্রমণের পথে আফ্রিকার একটি অংশ আমার জন্য ছিল বিশেষভাবে কঠিন, আবার একই সঙ্গে সবচেয়ে স্মরণীয়।
নাইজেরিয়া থেকে শুরু করে ক্যামেরুন, চাদ, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, গ্যাবন এবং সাও টোমে অ্যান্ড প্রিন্সিপি- এই পথের প্রতিটি দেশ আমাকে নতুন কোনো না কোনো অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করেছে।
নাইজেরিয়া থেকে শুরু:
আফ্রিকার এই যাত্রা শুরু হয় নাইজেরিয়ার লাগোস থেকে। বাংলাদেশি পাসপোর্টে নাইজেরিয়ার ভিসা পাওয়াই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। ভিসার জন্য আমাকে প্রায় ৭৭২ মার্কিন ডলার দিতে হয়েছিল। এত টাকা ও এত প্রস্তুতির পর যখন শেষ পর্যন্ত নাইজেরিয়ার মাটিতে পা রাখলাম, তখন মনে হচ্ছিল-আসল যাত্রা এবার শুরু।

লাগোসে নেমেই আমার উদ্দেশ্য ছিল শুধু শহর দেখা নয়। আমি আফ্রিকার পশ্চিম থেকে মধ্যাঞ্চলের বাস্তব জীবন দেখতে চেয়েছিলাম। তাই বিমানে এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়ার বদলে যতটা সম্ভব স্থলপথ ও জলপথ ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিই।
আমার কাছে একটি দেশের আসল গল্প অনেক সময় বিমানবন্দরের বাইরে শুরু হয়।
লাগোস থেকে সড়কপথে:
নাইজেরিয়ায় কিছুটা সময় কাটিয়ে আমি সড়কপথে এগিয়ে যাই ক্যামেরুনের দিকে। আমার ভ্রমণের ধরন বরাবরই একটু আলাদা। আমি সাধারণত শুধু পর্যটকদের জন্য তৈরি করা হয়েছে, এমন পরিবহন ব্যবহার করি না। স্থানীয় মানুষ যে পরিবহনে চলাচল করেন, সুযোগ পেলে আমিও সেটাই চড়ি। কখনো বাস, কখনো শেয়ারড ট্যাক্সি, কখনো মোটরসাইকেল, আবার কখনো এমন পুরোনো গাড়ি- যেটা দেখে মনে হয়, গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই গাড়িটিই হয়তো অবসর নিয়ে নেবে!
এই পথের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল পানিপথ। নাইজেরিয়া থেকে ক্যামেরুনের দিকে যাওয়ার পথে আমাকে পানিপথও ব্যবহার করতে হয়েছে। স্থলপথের পাশাপাশি নৌযাত্রা আমাকে আফ্রিকার সীমান্তবর্তী মানুষের জীবনকে অন্যভাবে দেখার সুযোগ দিয়েছে।
ক্যামেরুনে পথ আরও কঠিন হয়ে উঠল:
ক্যামেরুনে পৌঁছানোর পর যাত্রা আরও কঠিন হতে থাকে। ভাষা ছিল বড় একটি সমস্যা। ফরাসিভাষী আফ্রিকার দেশগুলোতে আমি ভালোভাবে ফরাসি বলতে পারতাম না। কোথায় যেতে চাই, কীভাবে যেতে চাই, কোথায় থাকার ব্যবস্থা- এমন সাধারণ বিষয় বোঝাতেও কখনো কখনো অনেক সময় লেগেছে।
কিন্তু ভ্রমণের সময় একটা জিনিস আমি শিখেছি- ভাষা না জানলেও মানুষ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। কখনো হাতের ইশারা, কখনো গুগল ট্রান্সলেটর, কখনো স্থানীয় কারও সাহায্য- কোনো না কোনোভাবে পথ বের হয়ে যায়।

ক্যামেরুন থেকে আমার পরবর্তী গন্তব্য ছিল চাদ। চাদ ছিল এই যাত্রার অন্যতম কঠিন অংশ। দীর্ঘ সড়কপথ পাড়ি দিতে হয়েছে। কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেছি গাড়ির জন্য। কখনো যে গাড়ি এসেছে, তার অবস্থা দেখে মনে হয়েছে- এটি আসলেই গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছাবে তো?
আফ্রিকার অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে পরিবহন কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি মেনে চলে না। কোন গাড়ি কখন ছাড়বে, কখন নষ্ট হবে, কখন আবার অন্য কোনো গাড়িতে উঠতে হবে- সবকিছুই অনেকটা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। কিন্তু এই অনিশ্চয়তাই আমার কাছে অ্যাডভেঞ্চারের অংশ।
চাদে পৌঁছানোর পর আমাকে ইমিগ্রেশন নিয়েও ঝামেলার মুখোমুখি হতে হয়। আমার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, সেখানে আমার কাছে অতিরিক্ত টাকা চাওয়া হয়েছিল। একজন বিদেশি পর্যটক হিসেবে, বিশেষ করে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে এমন পরিস্থিতিতে পড়া সহজ ছিল না।
তবে এসব পরিস্থিতিতে আমি সাধারণত আতঙ্কিত না হয়ে প্রথমে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করি। আমার কাছে বৈধ ভিসা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছিল। তাই শেষ পর্যন্ত কীভাবে সমস্যার সমাধান করা যায়, সেটাই ভাবতে থাকি।

এই যাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল- আমি শুধু পর্যটনকেন্দ্র দেখতে যাচ্ছিলাম না। আমি দেখতে চেয়েছিলাম মানুষ কীভাবে বেঁচে আছে। তারা কী খায়, কীভাবে বাজার করে, কীভাবে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যায়, কীভাবে পরিবারের সঙ্গে থাকে- এসব আমার কাছে কোনো বিখ্যাত স্থাপনার চেয়ে কম আকর্ষণীয় নয়।
কখনো স্থানীয় মানুষের সঙ্গে বসে তাদের খাবার খেয়েছি। সেই খাবারের মধ্যে এমন উপাদানও ছিল, যা আমার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। কখনো শুকনো মাংস, কখনো রোদে শুকানো মাছ, কখনো এমন খাবার, যার সঙ্গে পোকামাকড়ও ছিল। কিন্তু আমি সেগুলো খাওয়ার চেষ্টা করেছি। কারণ আমি বিশ্বাস করি, কোনো দেশকে সত্যিকার অর্থে বুঝতে হলে শুধু তার পাঁচতারকা হোটেলের খাবার খেলে হবে না; সাধারণ মানুষ প্রতিদিন যে খাবার খায়, সেটিও জানতে হবে।

কখনো বোরখা, কখনো মোটরসাইকেল:
আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে নিজের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আমাকে বোরখা পরেও চলাফেরা করতে হয়েছে। এটি কোনো ফ্যাশন বা ধর্মীয় পরিচয় প্রদর্শনের বিষয় ছিল না। পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেকে নিরাপদ রাখার জন্য সেটি ছিল আমার একটি বাস্তব সিদ্ধান্ত।
কখনো মাইলের পর মাইল মোটরসাইকেলে যেতে হয়েছে। কখনো সাইকেলে। কখনো শেয়ারড ট্যাক্সিতে গাদাগাদি করে। কখনো পিকআপের ড্রাইভারের পাশের ছোট্ট সিটে বসে। আর কখনো এমন হয়েছে যে গাড়ি পাওয়ার আশায় দীর্ঘ সময় রাস্তার পাশে অপেক্ষা করতে হয়েছে। একবার কোথাও থাকার ব্যবস্থা না হওয়ায় হাসপাতালের বারান্দায় রাত কাটানোর মতো পরিস্থিতিও এসেছে।

আবার কখনো শেয়ারড ট্যাক্সিতে পরিচিত হওয়া কোনো মানুষের আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে পানি খেয়েছি। এই অভিজ্ঞতাগুলো আমার কাছে কোনো কষ্টের গল্প নয়। বরং এগুলোই আমার ভ্রমণের গল্প।
বিপদের মধ্যেও বাংলাদেশি পরিচয়
আফ্রিকার এই পথ চলতে গিয়ে এমন পরিস্থিতিও এসেছে, যখন নিজের নিরাপত্তা নিয়ে সত্যিই চিন্তা করতে হয়েছে। কখনো ভাষার সমস্যা, কখনো পরিবহনের সমস্যা, কখনো সীমান্তের জটিলতা, আবার কখনো এমন পরিস্থিতি, যেখানে বুঝতে পারছিলাম না পরবর্তী কয়েক ঘণ্টায় কী হবে। এমন একাধিক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশি মানুষের সহায়তাও পেয়েছি। এমনকি একটি পর্যায়ে বাংলাদেশ আর্মির সদস্যরা এসে আমাকে সাহায্য করেছিলেন।
বিদেশের মাটিতে যখন একজন বাংলাদেশি নিজের দেশের মানুষের কাছ থেকে সাহায্য পান, সেই অনুভূতিটা আলাদা। তখন মনে হয়, আমি একা নই।

গ্যাবন ও সাও টোমের পথে
চাদ ও মধ্য আফ্রিকার কঠিন অভিজ্ঞতার পর যাত্রা আমাকে নিয়ে যায় গ্যাবনের দিকে। আফ্রিকার এই অংশে দেশগুলোর মধ্যে দূরত্ব যেমন বড়, তেমনি পরিবহনব্যবস্থাও অনেক সময় অনিশ্চিত। কোথাও সড়কপথ, কোথাও নৌপথ, কোথাও ছোট যানবাহন- যে পথ পাওয়া গেছে, সেই পথেই এগিয়েছি।
এরপর আমার যাত্রা পৌঁছায় সাও টোমে অ্যান্ড প্রিন্সিপিতে।
নাইজেরিয়ার লাগোস থেকে শুরু করে একের পর এক সীমান্ত, সড়ক, জলপথ, পুরোনো গাড়ি, মোটরসাইকেল, স্থানীয় পরিবহন এবং অচেনা মানুষের সাহায্য পেরিয়ে সাও টোমে পৌঁছানো আমার কাছে শুধু একটি দেশের তালিকায় আরেকটি নাম যোগ করা ছিল না। এটি ছিল একটি দীর্ঘ গল্পের আরেকটি অধ্যায়।
অনেকে হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন- এত কষ্ট করে কেন? আমি চাইলে বিমান ধরতে পারি, পাঁচতারা হোটেলে থাকতে পারি, ব্যক্তিগত গাড়ি নিতে পারি, একজন গাইড রাখতে পারি। আমি এগুলো কখনো করি না- তা নয়। টানা ভ্রমণে ক্লান্ত হয়ে গেলে আমিও ভালো হোটেলে থাকি। একটু বিশ্রাম নিই। নিজের জন্য আরাম নিই।
কিন্তু সবসময় সেই জীবনযাপন করতে আমার ভালো লাগে না। কারণ আমি আমার স্বাভাবিক আরামদায়ক জীবনে মাঝে মাঝে একঘেয়ে হয়ে যাই। অচেনা রাস্তায় বেরিয়ে পড়লে, সাধারণ মানুষের সঙ্গে বসলে, নতুন খাবার খেলে, ভাষা না জেনেও কারও সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলে, কখনো ভয় পেলেও সামনে এগিয়ে গেলে-আমার মনে হয় আমি সত্যিই বেঁচে আছি। আমি যেন নতুন করে অক্সিজেন নিতে পারি।

একটি দেশের ভেতরের গল্প
আমার কাছে ভ্রমণ মানে শুধু বলা নয়, ‘আমি এই দেশে গিয়েছি’। আমি বরং বলতে চাই, ‘আমি এই দেশটাকে অনুভব করার চেষ্টা করেছি’। আমি সেই দেশের মানুষের সঙ্গে হেঁটেছি। তাদের পরিবহনে চলেছি। তাদের খাবার খেয়েছি। তাদের বাড়িতে বসেছি। তাদের সমস্যার কথা শুনেছি। তাদের হাসি দেখেছি। তাদের দৈনন্দিন জীবনকে কাছ থেকে দেখেছি। আর বুঝতে চেষ্টা করেছি, একটি দেশের মানুষ কীভাবে তাদের দেশকে দেখে।
এই কারণেই আমার কাছে ভ্রমণ কোনো লাক্সারি লাইফস্টাইল নয়। ভ্রমণ আমার কাছে অ্যাডভাঞ্চার, ডিসকভারি এবং মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন।
নাইজেরিয়া থেকে ক্যামেরুন, চাদ, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, গ্যাবন হয়ে সাও টোমে- এই পথ আমাকে আবারও শিখিয়েছে, পৃথিবীকে শুধু মানচিত্রে দেখলে তাকে চেনা যায় না। একটি দেশকে জানতে হলে তার রাস্তায় হাঁটতে হয়। তার মানুষের পাশে বসতে হয়। কখনো তাদের সঙ্গে একই খাবার খেতে হয়। কখনো তাদের মতো করে পথ চলতে হয়। আর কখনো কখনো নিজের ভয়কে সঙ্গে নিয়েই অজানার দিকে এগিয়ে যেতে হয়। বাংলাদেশি পাসপোর্ট হাতে আমার কাছে সেটাই ভ্রমণ।
আর সেই কারণেই আমি শুধু পৃথিবীর দেশগুলো গুনতে চাই না- আমি পৃথিবীর মানুষগুলোকে জানতে চাই।
-1792238400.jpg&w=1440&q=75)